গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের ‘আমি হেথায়-থাকি শুধু’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘গীতাঞ্জলি’র একটি অন্যতম বিনীত, সুরময় ও আত্মনিবেদিত ভক্তিমূলক লিরিক কবিতা হলো ‘আমি হেথায়-থাকি শুধু’। ১৯১০ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় কবি নিজেকে কোনো বড় কাজের যোগ্য না মনে করে কেবল ঈশ্বরের জগৎসভায় গান গেয়ে যাওয়ার এবং তাঁর আরাধনায় জীবনকে সঁপে দেওয়ার এক বিনম্র আকুলতা ফুটিয়ে তুলেছেন।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামআমি হেথায়-থাকি শুধু
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থগীতাঞ্জলি
প্রকাশের বছর১৯১০ (১৩১৭ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনভক্তি ও সংগীতমূলক লিরিক কবিতা (Devotional Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯১০ সালে প্রকাশিত ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রসাহিত্যের তথা বিশ্বসাহিত্যের এক অমূল্য রত্ন। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতা ও গানগুলোতে মানবাত্মার সাথে পরমাত্মার মিলনের ব্যাকুলতা, অহংকার বিসর্জন এবং প্রভুর চরণে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের সুর বেজে উঠেছে। ‘আমি হেথায়-থাকি শুধু’ কবিতায় কবি স্বীকার করেছেন যে তিনি হয়তো প্রথাগত কোনো বড় কাজে লাগেন না, কিন্তু তাঁর এই ‘অকাজের প্রাণ’ কেবল সুর ও গানে প্রভুর আরাধনা করতে চায়। রাতের নীরব দেবালয় থেকে শুরু করে ভোরের সোনার আলোর সুর—সবখানেই যেন তাঁর একটি ছোট্ট স্থান ও সম্মান প্রার্থনা করা হয়েছে।

আমি হেথায়-থাকি শুধু – সম্পূর্ণ কবিতা

আমি হেথায়-থাকি শুধু
গাইতে তোমার গান,
দিয়ো তোমার জগৎসভায়
এইটুকু মোর স্থান।
আমি তোমার ভুবন-মাঝে
লাগি নি নাথ, কোনো কাজে–
শুধু কেবল সুরে বাজে
অকাজের এই প্রাণ।
নিশায় নীরব দেবালয়ে
তোমার আরাধন,
তখন মোরে আদেশ কোরো
গাইতে হে রাজন্‌।
ভোরে যখন আকাশ জুড়ে
বাজবে বীণা সোনার সুরে
আমি যেন না রই দূরে
এই দিয়ো মোর মান।

Romanized Version

Ami hethay-thaki shudhu
Gaite tomar gan,
Diyo tomar jogot-shobay
Ei tuku mor sthan.
Ami tomar vubon-majhe
Lagi ni nath, kono kaje–
Shudhu kebol shure baje
Okajer ei pran.
Nishay nirobo debaloye
Tomar aradhon,
Tokhon more adesh koro
Gaite he rajon.
Vhore jokhon akash jure
Bajbe bina shonar shure
Ami jeno na roi dure
Ei diyo mor man.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • অকাজের প্রাণের সার্থকতা গানে:
“আমি তোমার ভুবন-মাঝে / লাগি নি নাথ, কোনো কাজে– / শুধু কেবল সুরে বাজে / অকাজের এই প্রাণ।”
— পার্থিব কাজের ব্যস্ততা বা অহংকার থেকে দূরে থেকে কবির একমাত্র পরিচয় ও সার্থকতা হলো ঈশ্বরের বিশ্বসভায় কেবল গান গাওয়া ও সুর সৃষ্টি করা।
  • নিশা ও ভোরের আরাধনা:
“নিশায় নীরব দেবালয়ে / তোমার আরাধন, / তখন মোরে আদেশ কোরো / গাইতে হে রাজন্‌।”
— রাতের নীরব দেবালয়ের নির্জন আরাধনা হোক কিংবা ভোরের সোনার সুরের বাসনা—কবি সবসময় প্রভুর সান্নিধ্যে ও তাঁর আজ্ঞাবহ হয়ে থাকতে চান, এটাই তাঁর জীবনের পরম সম্মান।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন