বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মানসী’ (১৮৯০) কাব্যগ্রন্থের অন্যতম একটি রোমান্টিক, মরমিয়া ও সুগভীর বিষাদমগ্ন সৃষ্টি হলো ‘ক্ষণিক মিলন’। এই কবিতায় হঠাৎ জীবনে আসা এক ক্ষণস্থায়ী অতিথি বা প্রিয়ার আগমন, তার চলে যাওয়ার পর সমগ্র বিশ্বের আলো ও প্রাণ কেড়ে নেওয়ার বেদনা এবং একা পড়ে থাকা এক কবির নিঃসঙ্গ স্মৃতিরচারণের এক অপূর্ব কাব্যিক রূপ অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | ক্ষণিক মিলন |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | মানসী |
| প্রকাশের বছর | ১৮৯০ (১২৯৭ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | রোমান্টিক ও বিষাদমূলক লিরিক কবিতা (Romantic Elegiac Lyric) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৮৯০ সালে প্রকাশিত ‘মানসী’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিজীবনের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পরিণত সৃষ্টির পর্যায়। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতে গভীর প্রেম, সৌন্দর্যপীতি এবং মানবমনের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন অত্যন্ত সুচারুভাবে প্রকাশিত হয়েছে। ‘ক্ষণিক মিলন’ কবিতায় কবি এমন এক ক্ষণিকের ভালোবাসার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন, যা হঠাৎ এসে কবির ভাঙা দুয়ার খুলে দেয় এবং জ্যোৎস্নাস্নাত রাতে মনকে দুলিয়ে তোলে। কিন্তু সেই মিলন স্থায়ী হয় না; সে ফিরে যাওয়ার সময় কবির জীবনের সমস্ত আলো ও সম্বল যেন নিজের সাথে নিয়ে চলে যায়। তার চলে যাওয়ার পর চারপাশ ছায়াবৎ ও প্রাণহীন হয়ে পড়ে, আর একা বসে থাকা মানুষটির বুকে কেবল সেই চরণের ধ্বনি ও স্মরণের অবশেষুকিড় টুকু বেঁচে থাকে—এই গভীর বিয়োগান্তক সুরই কবিতার মূল প্রাণ।
ক্ষণিক মিলন কবিতা (সম্পূর্ণ)
একদা এলোচুলে কোন্ ভুলে ভুলিয়া
আসিল সে আমার ভাঙা দ্বার খুলিয়া।
জ্যোৎস্না অনিমিখ, চারি দিক সুবিজন,
চাহিল একবার আঁখি তার তুলিয়া।
দখিনবায়ুভরে থরথরে কাঁপে বন,
উঠিল প্রাণ মম তারি সম দুলিয়া।
আবার ধীরে ধীরে গেল ফিরে আলসে,
আমার সব হিয়া মাড়াইয়া গেল সে।
আমার যাহা ছিল সব নিল আপনায়,
হরিল আমাদের আকাশের আলো সে।
সহসা এ জগৎ ছায়াবৎ হয়ে যায়,
তাহারি চরণের শরণের লালসে।
যে জন চলিয়াছে তারি পাছে সবে ধায়,
নিখিলে যত প্রাণ যত গান ঘিরে তায়।
সকল রূপহার উপহার চরণে,
ধায় গো উদাসিয়া যত হিয়া পায় পায়।
যে জন পড়ে থাকে একা ডাকে মরণে,
সুদূর হতে হাসি আর বাঁশি শোনা যায়।
শবদ নাহি আর, চারি ধার প্রাণহীন,
কেবল ধুক্ ধুক্ করে বুক নিশিদিন।
যেন গো ধ্বনি এই তারি সেই চরণের,
কেবলি বাজে শুনি, তাই গুনি দুই তিন।
কুড়ায়ে সব-শেষ অবশেষ স্মরণের
বসিয়া একজন আনমন উদাসীন।
ক্ষণিক মিলন কবিতার Romanized Version:
Shokol ruphor upohar chorone,
Dhay go udashiya joto hiya pay pay।
Je jon pore thake eka dake morone,
Shudur hote hashi ar bashi shona jay।
Shobdo nahi ar, chari dhar pranhin,
Kebol dhuk dhuk kore buk nishidin।
Jeno go dhoni ei tari shei choroner,
Keboli baje shuni, tai guni dui tin।
Kuraye sob-shesh oboshesh smoroner
Bosiya ekjon anmon udashin।
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- ক্ষণিক সংযোগ ও দীর্ঘ বিচ্ছেদ: জীবনের কোনো এক ক্ষণিকের মধুর মিলন কীভাবে সমগ্র অস্তিত্বকে আলোড়িত করে এবং তার প্রস্থানে জীবন কীভাবে শূন্য ও আলোহীন হয়ে পড়ে, তা এই কবিতায় গভীরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
- স্মৃতির অবশেষ: বাহ্যিক জগৎ যখন সেই প্রিয়ার পিছু নেয়, তখন একা পড়ে থাকা কবির অন্তরে কেবল স্মৃতির নুড়ি কুড়ানোর বেদনা ও প্রতীক্ষার নিঃসঙ্গতাটুকুই সার সম্বল হয়ে থাকে।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (মানসী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।








![নূতন কল্পে nuton kolpe [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নূতন কল্পে nuton kolpe [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/নূতন-কল্পে-nuton-kolpe-কবিতা--1024x536.gif)
![কাহিনী কাব্যগ্রন্থের দেবতার গ্রাস কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেবতার গ্রাস debataar graas | কাহিনী [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/দেবতার-গ্রাস-debataar-graas-কাহিনী-কবিতা--1024x536.gif)