বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘উৎসর্গ’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম গভীর দার্শনিক, অস্তিত্ববাদী ও আত্মমগ্ন লিরিক কবিতা হলো ‘আছি আমি বিন্দু-রূপে, হে অন্তরযামী’। এই কবিতায় নিজের ক্ষুদ্র অস্তিত্বের বিস্ময়, বিশ্বের রহস্য এবং তত্ত্ববিদদের একেশ্বরবাদের ধারণার বিপরীতে কবির সবিম্র ও মুগ্ধ বিশ্ববোধ অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | আছি আমি বিন্দু-রূপে, হে অন্তরযামী |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | উৎসর্গ |
| প্রকাশের বছর | ১৯১৪ (১৩২১ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | দার্শনিক ও অস্তিত্ববাদী লিরিক কবিতা (Philosophical and Existential Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘উৎসর্গ’ কাব্যগ্রন্থটি তাঁর কাব্যজীবনের একটি বিশেষ মননশীল ও আত্মজিজ্ঞাসামূলক সৃষ্টি। এসময়ের কবিতায় বিশ্বপ্রকৃতির পরিবর্তনশীলতা, পরম সত্তার সন্ধান এবং মানবজীবনের অন্তিম রহস্য নিয়ে গভীর ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে। ‘আছি আমি বিন্দু-রূপে, হে অন্তরযামী’ কবিতায় কবি নিজের অস্তিত্বের অনুভূতি (‘আছি আমি’) থেকে শুরু করে বিশ্বসংসারের প্রকাণ্ড রহস্য এবং তত্ত্ববিদদের একাকার করে দেখার প্রবণতার বাইরে দাঁড়িয়ে জীবনের আদি গোপন তত্ত্বকে অপার বিস্ময়ে মেনে নেওয়ার আকুলতা প্রকাশ করেছেন।
আছি আমি বিন্দু-রূপে, হে অন্তরযামী – সম্পূর্ণ কবিতা
আছি আমি বিন্দু-রূপে, হে অন্তরযামী
আছি আমি বিশ্বকেন্দ্রস্থলে। “আছি আমি’
এ কথা স্মরিলে মনে মহান্ বিস্ময়
আকুল করিয়া দেয়,স্তব্ধ এ হৃদয়
প্রকাণ্ড রহস্যভারে। “আছি আর আছে’
অন্তহীন আদি প্রহেলিকা, কার কাছে
শুধাইব অর্থ এর! তত্ত্ববিদ্ তাই
কহিতেছে,”এ নিখিলে আর কিছু নাই,
শুধু এক আছে।’ করে তারা একাকার
অস্তিত্বরহস্যরাশি করি অস্বীকার।
একমাত্র তুমি জান এ ভবসংসারে
যে আদি গোপন তত্ত্ব, আমি কবি তারে
চিরকাল সবিনয়ে স্বীকার করিয়া
অপার বিস্ময়ে চিত্ত রাখিব ভরিয়া।
Romanized Version
Aachhi ami bindu-rupe, he ontorjyami
Aachhi ami bishwo-kendro-sthole. “Achi ami”
E kotha shmorile mone mohan bishmoy
Akul koriya dey, sthobho e hridoy
Prokando rohosyo-bhare. “Achi ar ache”
Ontehin adi prohelika, kar kachhe
Shudhaibo ortho er! Tottobid tai
Kohiteche, “e nikhile ar kichhu nai,
Shudhu ek ache.’ Kore tara ekakar
Ostitwo-rohosyo-rashi kori oshikar.
Ekmatro tumi jane e bhobshongshare
Je adi gopon totto, ami kobi tare
Chirokal shobinoye shikar koriya
Opar bishmoye chitto rakhibo bhoriya.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- অস্তিত্বের মহান বিস্ময়:
“আছি আমি বিন্দু-রূপে, হে অন্তরযামী / আছি আমি বিশ্বকেন্দ্রস্থলে। ‘আছি আমি’ / এ কথা স্মরিলে মনে মহান্ বিস্ময়…”— মহাবিশ্বের কেন্দ্রস্থলে নিজের ক্ষুদ্র ‘বিন্দু-রূপ’ অস্তিত্ব উপলব্ধি করা এবং এই ‘আমি আছি’ বোধের প্রকাণ্ড রহস্যে হৃদয় স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার অনুভূতি কবিতার মূল প্রারম্ভিক সুর।
- তত্ত্ববিদদের দর্শন ও কবির বিনম্র বিস্ময়:
“একমাত্র তুমি জান এ ভবসংসারে / যে আদি গোপন তত্ত্ব, আমি কবি তারে / চিরকাল সবিনয়ে স্বীকার করিয়া / অপার বিস্ময়ে চিত্ত রাখিব ভরিয়া।”— তত্ত্ববিদরা যখন সব অস্তিত্বকে অস্বীকার করে কেবল ‘এক আছে’ বলে সবকিছু একাকার করে দেন, তখন কবি তা অস্বীকার না করে জীবনের আদি গোপন তত্ত্বকে চিরকাল সবিম্র ও সশ্রদ্ধ বিস্ময়ে হৃদয়ে ধারণ করতে চেয়েছেন।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।