বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কড়ি ও কোমল’ (১৮৮৬) কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও মনস্তাত্ত্বিক কবিতা হলো ‘পাখীর পালক’। এই কবিতায় একটি শিশুর সহজ-সরল কল্পনাপ্রবণ মন এবং তার বিপরীতে একজন বয়স্ক মানুষের নীরস বাস্তববোধের যে দ্বন্দ্ব, তা অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে।
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | পাখির পালক (পাখীর পালক) |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | কড়ি ও কোমল |
| প্রকাশের বছর | ১৮৮৬ (১২৯৩ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | শিশুমনস্তত্ত্ব ও গার্হস্থ্য বিষয়ক কবিতা (Child Psychology and Domestic Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৮৮৬ সালে প্রকাশিত ‘কড়ি ও কোমল’ কাব্যগ্রন্থে কবি জীবনের নানা রূপ, প্রেম ও গৃহকোণের ছোটখাটো ছবিকে নিপুণভাবে এঁকেছেন। ‘পাখীর পালক’ কবিতাটি শিশুমনস্তত্ত্বের এক অসামান্য দলিল। ছোট শিশুদের কাছে পৃথিবীর তুচ্ছ জিনিসও পরম বিস্ময়ের ও আনন্দের। একটি সামান্য পাখির পালকের মধ্যে ছোট্ট মেয়েটি আকাশ, মেঘ ও পাখির কলকাকলির যে ঐশ্বর্য খুঁজে পেয়েছিল, তার মা বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তার বিন্দুমাত্র মূল্য বুঝতে পারেননি। প্রাপ্তবয়স্কদের এই বাস্তববোধ ও অবহেলা কীভাবে অজান্তেই একটি শিশুর কোমল মনকে ভেঙে দেয় এবং তাকে নিজের গুটিয়ে নেওয়া জগতে একা করে দেয়, তারই এক করুণ চিত্র এই কবিতায় ফুটে উঠেছে।
পাখীর পালক – সম্পূর্ণ কবিতা
খেলাধুলো সব রহিল পড়িয়া
ছুটে চলে আসে মেয়ে—
বলে তাড়াতাড়ি—“ওমা দেখ্ দেখ্,
কি এনেছি দেখ্ চেয়ে!”
আঁখির পাতায় হাসি চমকায়,
ঠোঁটে নেচে ওঠে হাসি,
হয়ে যায় ভুল বাঁধেনাকো চুল,
খুলে পড়ে কেশ রাশি!
দুটি হাত তার ঘিরিয়া ঘিরিয়া
রাঙা চুড়ি কয়-গাছি,
করতালি পেয়ে বেজে ওঠে তারা
কেঁপে ওঠে তারা নাচি।
মায়ের গলায় বাহু দুটি বেঁধে
কোলে এসে বসে মেয়ে।
বলে তাড়াতাড়ি-“ওমা দেখ্ দেখ্
কি এনেছি দেখ্ চেয়ে!
সোনালি রঙের পাখীর পালক
ধোয়া সে সোনার স্রোতে,
খসে এল যেন তরুণ আলোক
অরুণের পাখা হতে;
নয়ন-ঢুলানো কোমল পরশ
ঘুমের পরশ যথা,
মাখা যেন তায় মেঘের কাহিনী
নীল আকাশের কথা!
ছোট খাট নীড়, শাবকের ভীড়
কতমত কলরব,
প্রভাতের সুখ, উড়িবার আশা
মনে পড়ে যেন সব।
লয়ে সে পালক কপোল বুলায়,
আঁখিতে বুলায় মেয়ে,
বলে হেসে হেসে “ওমা দেখ্ দেখ্
কি এনেছি দেখ্ চেয়ে।”
মা দেখিল চেয়ে, কহিল হাসিয়ে
“কিবা জিনিষের ছিরি?”
ভূমিতে ফেলিয়া যাইল চলিয়া
আর না চাহিল ফিরি?
মেয়েটির মুখে কথা না ফুটিল
মাটিতে রহিল বসি।
শূন্য হতে যেন পাখীর পালক
ভূতলে পড়িল খসি!
খেলাধূলো তার হলো নাকো আর,
হাসি মিলাইল মুখে,
ধীরে ধীরে শেষে দুটি ফোঁটা জল
দেখা দিল দুটি চোখে।
পালকটি লয়ে রাখিল লুকায়ে
গোপনের ধন তার,
আপনি খেলিত আপনি তুলিত
দেখাত না ক’রে আর!
Romanized Version
Ki enechhi dekh cheye!
Dekhato na ko’re ar!
- শিশুমনের কল্পনা ও আনন্দ:“সোনালি রঙের পাখীর পালক… মাখা যেন তায় মেঘের কাহিনী / নীল আকাশের কথা!”— ছোট্ট মেয়েটি একটি সোনারঙা পাখির পালক কুড়িয়ে পেয়ে উত্তেজনায় খেলাধুলো ফেলে মায়ের কাছে ছুটে আসে। তার কাছে এই সামান্য পালকটি কোনো তুচ্ছ জিনিস নয়; এর গায়ে যেন নীল আকাশ, মেঘের গল্প, পাখির নীড় আর উড়ে বেড়ানোর স্বাধীনতা মাখা রয়েছে।
- বয়স্কদের নিস্পৃহ বাস্তববোধ:“মা দেখিল চেয়ে, কহিল হাসিয়ে / “কিবা জিনিষের ছিরি?” / ভূমিতে ফেলিয়া যাইল চলিয়া”— শিশুটি যখন তার এই পরম মূল্যবান ধনটিকে পরম মমতায় মায়ের কাছে মেলে ধরে, তখন মা তার বিন্দুমাত্র মূল্য বুঝতে পারেন না। প্রাপ্তবয়স্কদের বাস্তববাদী চোখে পালকটি একটি তুচ্ছ ও ফেলনা জিনিস ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই তিনি তা তাচ্ছিল্যভরে মাটিতে ফেলে দিয়ে চলে যান।
- নীরব অভিমান ও নিজস্ব জগত তৈরি:“মেয়েটির মুখে কথা না ফুটিল… আপনি খেলিত আপনি তুলিত / দেখাত না ক’রে আর!”— মায়ের এই আচরণে মেয়েটির মুখের হাসি নিভে যায় এবং চোখ দিয়ে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। মায়ের এই প্রত্যাখ্যান তাকে শিখিয়ে দেয় যে, তার স্বপ্নের জগতের কোনো কদর বড়দের কাছে নেই। তাই সে তার সেই মহামূল্যবান পালকটি লুকিয়ে রাখে এবং এরপর থেকে নিজের কল্পনা ও খেলার জগতটিকে সে একান্ত নিজের করেই রাখে, আর কাউকে দেখায় না।




![কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থের ‘পাখীর পালক’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1 পাখীর পালক pakhir palok [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/পাখীর-পালক-pakhir-palok-কবিতা--1024x536.gif)

![ভগ্নহৃদয় বিংশ সর্গ bhagno hriday bingso sorgo [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 2 ভগ্নহৃদয় বিংশ সর্গ bhagno hriday bingso sorgo [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/ভগ্নহৃদয়-বিংশ-সর্গ-bhagno-hriday-bingso-sorgo-কবিতা--1024x536.gif)
![বসন্ত-অবসান basanta abosan [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 3 বসন্ত-অবসান basanta abosan [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/বসন্ত-অবসান-basanta-abosan-কবিতা--1024x536.gif)

![অপর পক্ষ opor pokkho [ কবিতা ] – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অপর পক্ষ opor pokkho [ কবিতা ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/অপর-পক্ষ-opor-pokkho-কবিতা--1024x576.gif)
![শেষের কবিতা [ Shesher Kobita ] – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শেষের কবিতা [ Shesher Kobita ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/02/শেষের-কবিতা-1024x536.gif)