ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থের দুই তীরে কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত মিষ্টি, চিত্রধর্মী ও রূপকধর্মী রচনা হলো ‘দুই তীরে’। একটি নদীর দুই তীরের সম্পূর্ণ ভিন্ন জীবনপ্রবাহ—একদিকের শান্ত-নির্জন বালুচর এবং অন্যদিকের মুখরিত ছায়াঘেরা বন ও গ্রামীণ জীবন—এই বৈপরীত্যের মাঝেও তাদের সংযোগকারী নদীটির নিরবধি প্রবাহের এক অপূর্ব চিত্র ফুটে উঠেছে এই কবিতায়।

 

ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থের দুই তীরে কবিতা

দুই তীরে কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামদুই তীরে
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থক্ষণিকা
প্রকাশের বছর১৯০০ (১৩০৭ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনরোমান্টিক ও চিত্রধর্মী লিরিক কবিতা

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯০০ সালে প্রকাশিত ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ গুরুগম্ভীর ছন্দ ও রূপ পরিহার করে অত্যন্ত সাবলীল, চটুল ও সহজ ভাষার আশ্রয় নিয়েছেন। ‘দুই তীরে’ কবিতায় দুটি ভিন্ন মানসিকতা বা ভিন্ন জীবনের রূপ তুলে ধরা হয়েছে নদীর দুই পাড়ের মাধ্যমে। এক পাড়ে প্রকৃতির নির্জনতা ও বন্য সৌন্দর্য, আর অন্য পাড়ে সামাজিক কোলাহল ও লোকালয়। মাঝখানে নদীটি যেন এই দুই ভিন্ন সত্তাকে একই সুরে বেঁধে রাখার এক চিরন্তন সেতু।

দুই তীরে (সম্পূর্ণ কবিতা):

আমি ভালোবাসি আমার

     নদীর বালুচর,

শরৎকালে যে নির্জনে

     চকাচকীর ঘর।

            যেথায় ফুটে কাশ

            তটের চারি পাশ,

                 শীতের দিনে বিদেশী সব

                        হাঁসের বসবাস।

                             কচ্ছপেরা ধীরে

                             রৌদ্র পোহায় তীরে,

                        দু-একখানি জেলের ডিঙি

                             সন্ধেবেলায় ভিড়ে।

                                    আমি ভালোবাসি আমার

                                            নদীর বালুচর,

                                    শরৎকালে যে নির্জনে

                                            চকাচকীর ঘর।

তুমি ভালোবাস তোমার

     ওই ও পারের বন,

যেথায় গাঁথা ঘনচ্ছায়া

     পাতার আচ্ছাদন।

            যেথায় বাঁকা গলি

            নদীতে যায় চলি,

      দুই ধারে তার বেণুবনের

            শাখায় গলাগলি।

                 সকাল-সন্ধেবেলা

                 ঘাটে বধূর মেলা,

             ছেলের দলে ঘাটের জলে

                ভাসে ভাসায় ভেলা।

                        তুমি ভালোবাস তোমার

                             ওই ও পারের বন,

                        যেথায় গাঁথা ঘনচ্ছায়া

                             পাতার আচ্ছাদন।

তোমার আমার মাঝখানেতে

     একটি বহে নদী,

দুই তটেরে একই গান সে

     শোনায় নিরবধি।

            আমি শুনি শুয়ে

            বিজন বালু-ভুঁয়ে,

     তুমি শোন কাঁখের কলস

            ঘাটের ‘পরে থুয়ে।

                 তুমি তাহার গানে

                 বোঝ একটা মানে,

            আমার কূলে আরেক অর্থ

                 ঠেকে আমার কানে।

                        তোমার আমার মাঝখানেতে

                             একটি বহে নদী,

                        দুই তটেরে একই গান সে

                             শোনায় নিরবধি।

Amar Rabindranath Logo

দুই তীরে সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Ami bhalobashi amar
Nodir baluchor,
Shorotkale je nirjone
Chokachokir ghor.
Jethay phute kash
Toter chari pash,
Shiter dine bideshi shob
Hanser boshobash.
Kocchhopera dhire
Roudro pohay tire,
Du-ekkhani jeler dingi
Shondhebelay bhire.
Ami bhalobashi amar
Nodir baluchor,
Shorotkale je nirjone
Chokachokir ghor.
Tumi bhalobasho tomar
Oi o parer bon,
Jethay gatha ghonochhaya
Patar achchhadon.
Jethay baka goli
Nodite jay choli,
Dui dhare tar benuboner
Shakhay golagoli.
Shokal-shondhebela
Ghate bodhur mela,
Chheler dole ghater jole
Bhashe bhashay bhela.
Tumi bhalobasho tomar
Oi o parer bon,
Jethay gatha ghonochhaya
Patar achchhadon.
Tomar amar majhkhanete
Ekti bohe nodi,
Dui totere eki gan she
Shonay nirobodhi.
Ami shuni shuye
Bijon balu-bhuye,
Tumi shono kankher kolosh
Ghater ‘pore thuye.
Tumi tahar gane
Bojho ekta mane,
Amar kule arek ortho
Theke amar kane.
Tomar amar majhkhanete
Ekti bohe nodi,
Dui totere eki gan she
Shonay nirobodhi.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • নির্জন নিসর্গের সৌন্দর্য:
    “আমি ভালোবাসি আমার / নদীর বালুচর, / শরৎকালে যে নির্জনে / চকাচকীর ঘর।”
    — এক তীরের প্রেমিক নির্জনতাপ্রিয়। কাশফুল, শীতের অতিথি পাখি, কচ্ছপের রোদ পোহানো আর নিঃশব্দ বালুচরের শান্ত নিসর্গই তার প্রিয় আশ্রয়।
  • মুখরিত সামাজিক জীবন:
    “তুমি ভালোবাস তোমার / ওই ও পারের বন, … ঘাটে বধূর মেলা, / ছেলের দলে ঘাটের জলে / ভাসে ভাসায় ভেলা।”
    — অপর তীরের মানুষটি ভালোবাসে ছায়াঘেরা বন, বেণুবনের শ্যামলতা এবং ঘাটের চঞ্চল কোলাহল—যেখানে নারীরা জল নিতে আসে আর শিশুরা খেলায় মেতে থাকে।
  • অভিন্ন সুরে ভিন্ন উপলব্ধি:
    “তোমার আমার মাঝখানেতে / একটি বহে নদী, / দুই তটেরে একই গান সে / শোনায় নিরবধি। … তুমি তাহার গানে / বোঝ একটা মানে, / আমার কূলে আরেক অর্থ / ঠেকে আমার কানে।”
    — দুজনের অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ আলাদা হলেও তাদের সংযুক্ত করেছে একটিমাত্র নদী। নদীর একটানা জলতরঙ্গ উভয়ের কাছে পৌঁছালেও নিজ নিজ জীবন ও অনুভূতির নিরিখে দুজনে তার ভিন্ন অর্থ খুঁজে পায়। এটি মানবজীবনের দৃষ্টিভঙ্গির বৈচিত্র্য ও ঐক্যের এক গভীর রূপক।

 

দুই তীরে dui tire [ কবিতা ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন