আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থের ‘উজ্জ্বলে ভয় তার’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কৌতুকরসাত্মক, হালকা মেজাজের এবং মনস্তাত্ত্বিক ব্যঙ্গধর্মী সৃষ্টিসংকলন ‘খাপছাড়া’র একটি অন্যতম তীক্ষ্ণ ও লয়ভিত্তিক লিরিক কবিতা হলো ‘উজ্জ্বলে ভয় তার’। এই কবিতায় মানুষের মনে লুকিয়ে থাকা বহুমুখী ভয়, অমূলক আশঙ্কা এবং সর্বব্যাপী ত্রাসের এক চমৎকার ও লঘু প্রকাশ ঘটানো হয়েছে, যা ছড়ায় ছড়ায় জীবনের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্যকে ফুটিয়ে তোলে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামউজ্জ্বলে ভয় তার
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থখাপছাড়া
প্রকাশের বছর১৯৩৬ (১৩৪৩ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনব্যঙ্গাত্মক ও মনস্তাত্ত্বিক লিরিক কবিতা (Satirical and Psychological Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯৩৬ সালে প্রকাশিত ‘খাপছাড়া’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথের খেয়ালী ও লঘু মেজাজের কবিতার এক অনন্য ভাণ্ডার। এই গ্রন্থের কবিতাগুলোতে জীবনের নানা অসঙ্গতি, ছোটখাটো ঘটনা এবং মানবস্বভাবের অদ্ভুত সব দিককে অত্যন্ত রম্যভঙ্গিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। ‘উজ্জ্বলে ভয় তার’ কবিতায় কবি দেখিয়েছেন যে ভয় কেবল অন্ধকার বা নির্দিষ্ট কোনো কোণেই সীমাবদ্ধ নয়—আলো, আঁধার, স্বাদ, দিক, ঘর বা বাহির—সর্বত্রই যেন ভয়ের এক অদৃশ্য উপস্থিতি মানুষের মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে।

উজ্জ্বলে ভয় তার – সম্পূর্ণ কবিতা

উজ্জ্বলে-ভয় তার,
ভয় মিট্‌মিটেতে,
ঝালে তার যত ভয়
ত তত ভয় মিঠেতে।
ভয় তার পশ্চিমে,
ভয় তার পূর্বে,
যে দিকে তাকায় ভয়
সাথে সাথে ঘুরবে।
ভয় তার আপনার
বাড়িটার ইঁটেতে,
ভয় তার অকারণে
অপরের ভিটেতে।
ভয় তার বাহিরেতে,
ভয় তার অন্তরে,
ভয় তার ভূত-প্রেতে,
ভয় তার মন্তরে।
দিনের আলোতে ভয়
সামনের দিঠেতে,
রাতের আঁধারে ভয়
আপনারি পিঠেতে।

Romanized Version

Ujjwole-bhoy tar,
bhoy mitmitete,
jhale tar joto bhoy
toto bhoy mithete.
Bhoy tar poshchime,
bhoy tar purbe,
je dike takay bhoy
sathe sathe ghurbe.
Bhoy tar apnar
baritar itete,
bhoy tar okarone
aporer vitete.
Bhoy tar bahirete,
bhoy tar ontore,
bhoy tar bhut-prete,
bhoy tar montore.
Diner alote bhoy
samner dithete,
rater andhare bhoy
apanari pithete.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • ভয়ের সর্বব্যাপী উপস্থিতি:
“উজ্জ্বলে-ভয় তার, / ভয় মিট্‌মিটেতে, / ঝালে তার যত ভয় / তত ভয় মিঠেতে।”
— মানুষের অবচেতন মনে ভয়ের ব্যাপ্তি যে কতটা সর্বগ্রাসী ও অদ্ভুত, তা বোঝাতে কবি আলো-আঁধার, ঝাল ও মিষ্টির মতো পরস্পরবিরোধী উপাদানেও ভয়ের অস্তিত্ব খুঁজেছেন।
  • দিক ও পরিমণ্ডলে ভয়ের বিস্তার:
“ভয় তার পশ্চিমে, / ভয় তার পূর্বে, / যে দিকে তাকায় ভয় / সাথে সাথে ঘুরবে।”

— মানুষ যেদিকেই তাকাক বা যেখানেই যাক না কেন, তার ভয় তার ছায়ার মতো চারপাশ ঘিরে থাকে—তা নিজের বাড়ির ইঁটে হোক কিংবা অন্যের ভিটেতে।

  • বাহির ও অন্তরের মনস্তত্ত্ব:

“দিনের আলোতে ভয় / সামনের দিঠেতে, / রাতের আঁধারে ভয় / আপনারি পিঠেতে।”

— দিনের আলো কিংবা রাতের অন্ধকার, কিংবা নিজের মন ও ভূতের ভয়—সব মিলিয়ে এটি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ভয়ের এক সুনিপুণ ও লঘু শৈল্পিক রূপায়ণ।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

Share

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ মে ১৮৬১ – ৭ আগস্ট ১৯৪১; ২৫ বৈশাখ ১২৬৮ – ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) ছিলেন বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার, সংগীতস্রষ্টা, প্রাবন্ধিক, চিত্রকর, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি ‘গুরুদেব’, ‘কবিগুরু’ ও ‘বিশ্বকবি’ অভিধায় পরিচিত।রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের পরিধি ছিল ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময়। তাঁর জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর অব্যবহিত পরে ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৪টি উপন্যাস এবং ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন প্রকাশিত হয়। তাঁর ৯৫টি ছোটগল্প *গল্পগুচ্ছ* এবং ১,৯১৫টি গান *গীতবিতান* সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাঁর প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনাবলি ৩২ খণ্ডে *রবীন্দ্র রচনাবলী* নামে সংকলিত হয়েছে। তাঁর পত্রসাহিত্যও *চিঠিপত্র* নামে ১৯ খণ্ডে এবং চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। সাহিত্য ও সংগীতের পাশাপাশি চিত্রকলাতেও তিনি বিশেষ অবদান রাখেন; তাঁর আঁকা ছবির সংখ্যা প্রায় দুই হাজার বলে উল্লেখ করা হয়।রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯১৩ সালে *গীতাঞ্জলি* কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি প্রথম অ-ইউরোপীয় এবং প্রথম এশীয় নোবেলজয়ী সাহিত্যিক হিসেবে বিশ্বসাহিত্যে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।

https://amarrabindranath.com/

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত