খেয়া কাব্যগ্রন্থের ‘প্রার্থনা’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘খেয়া’ (১৯০৬) কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর আত্মোপলব্ধি ও আধ্যাত্মিক চেতনার কবিতা হলো ‘প্রার্থনা’। ১৯০৬ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় জাগতিক প্রলোভন ও অহংকার থেকে মুক্ত হয়ে বিশ্বপ্রকৃতি ও সাধারণ মানুষের সাথে একাত্ম হওয়ার এক পরম আকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত সাবলীল সুরে ব্যক্ত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামপ্রার্থনা
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থখেয়া
প্রকাশের বছর১৯০৬ (১৩১৩ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনআত্মনিবেদন, প্রকৃতি-প্রেম ও প্রার্থনামূলক লিরিক কবিতা (Devotional, Nature and Prayer Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯০৬ সালে প্রকাশিত ‘খেয়া’ কাব্যগ্রন্থে কবি পূর্বের কোলাহলময় জগত থেকে সরে এসে অনেকটা অন্তর্মুখী হয়ে পড়েছেন। ‘প্রার্থনা’ কবিতায় কবি জগতের কোনো প্রলোভন বা স্বার্থের কাছে নিজেকে বিক্রি না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেছেন। তিনি চান সমস্ত অহংকার ও বিশেষত্ব ত্যাগ করে সাধারণ মানুষের কাতারে বা ‘সবার সাথে এক সারে’ নেমে আসতে। প্রকৃতির সহজ-স্বাভাবিক নিয়মের সাথে নিজেকে মিলিয়ে দেওয়া এবং চিত্তকে সব ধরনের কলুষতা থেকে মুক্ত রাখার এই বিনম্র প্রার্থনাই কবিতাটির মূল সুর।

প্রার্থনা – সম্পূর্ণ কবিতা

আমি    বিকাব না কিছুতে আর

                             আপনারে।

          আমি    দাঁড়াতে চাই সভার তলে

                             সবার সাথে এক সারে।

                   সকালবেলার আলোর মাঝে

                   মলিন যেন না হই লাজে,

                   আলো যেন পশিতে পায়

                             মনের মধ্যে একবারে।

                   বিকাব না, বিকাব না

                             আপনারে।

          আমি    বিশ্ব-সাথে রব সহজ

                             বিশ্বাসে।

          আমি    আকাশ হতে বাতাস নেব

                             প্রাণের মধ্যে নিশ্বাসে।

                   পেয়ে ধরার মাটির স্নেহ

                   পুণ্য হবে সর্ব দেহ,

                   গাছের শাখা উঠবে দুলে

                             আমার মনের উল্লাসে।

                   বিশ্বে রব সহজ সুখে

                             বিশ্বাসে।

          আমি    সবায় দেখে খুশি হব

                             অন্তরে।

          কিছু     বেসুর যেন বাজে না আর

                             আমার বীণা-যন্তরে।

                   যাহাই আছে নয়ন ভরি

                   সবই যেন গ্রহণ করি,

                   চিত্তে নামে আকাশ-গলা

                             আনন্দিত মন্ত্র রে।

                   সবায় দেখে তৃপ্ত রব

                             অন্তরে।

Amar Rabindranath Logo

Romanized Version

Ami bikabo na kichhute ar
Aponare.
Ami darate chai shobhar tole
Shobar shathe ek share.
Shokalbelar alor majhe
Molin jeno na hoi laje,
Alo jeno poshite pay
Moner modhye ekbare.
Bikabo na, bikabo na
Aponare.
Ami bishwa-shathe robo shohoj
Bishwashe.
Ami akash hote batash nebo
Praner modhye nishwashe.
Peye dhorar matir sneho
Punno hobe shorbo deho,
Gachher shakha uthbe dule
Amar moner ullashe.
Bishwe robo shohoj shukhe
Bishwashe.
Ami shobay dekhe khushi hobo
Ontore.
Kichhu beshur jeno baje na ar
Amar bina-jontore.
Jahai achhe noyon bhori
Shob-i jeno grohon kori,
Chitte name akash-gola
Anondito montro re.
Shobay dekhe tripto robo
Ontore.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • আত্মমর্যাদা ও সমতা:
“আমি বিকাব না কিছুতে আর / আপনারে। / আমি দাঁড়াতে চাই সভার তলে / সবার সাথে এক সারে।”
— জাগতিক লাভ, মোহ বা প্রলোভনের কাছে নিজের সত্তাকে কোনোভাবেই বিক্রি না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেছেন কবি। তিনি চান নিজের বিশেষত্বের অহংকার ত্যাগ করে সমাজের সাধারণ মানুষের সাথে এক কাতারে সমান হয়ে দাঁড়াতে।
  • প্রকৃতির সাথে একাত্মতা:
“আমি বিশ্ব-সাথে রব সহজ / বিশ্বাসে। … পেয়ে ধরার মাটির স্নেহ / পুণ্য হবে সর্ব দেহ,”
— বিশ্বপ্রকৃতির সহজ নিয়মের মাঝে কবি নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিতে চান। পৃথিবীর মাটির স্নেহ ও আকাশের বাতাসে তিনি নিজের প্রাণকে পুণ্য করতে চান, যেন তাঁর নিজের অন্তরের উল্লাসেই বাইরের গাছের শাখা দুলে ওঠে। এটি মূলত প্রকৃতির সাথে মানবাত্মার নিবিড় ঐক্যের প্রকাশ।
  • অন্তরের তৃপ্তি ও প্রশান্তি:
“সবায় দেখে খুশি হব / অন্তরে। / কিছু বেসুর যেন বাজে না আর / আমার বীণা-যন্তরে।”
— পৃথিবীর সব কিছুকে সহজভাবে গ্রহণ করে অন্তরে তৃপ্তি পাওয়ার প্রার্থনা। জীবনের বীণায় যেন কোনো স্বার্থপরতা বা অহংকারের বেসুর না বাজে, বরং চারপাশের সবকিছুকে ভালোবেসে হৃদয় যেন আকাশ-গলা আনন্দের মন্ত্রে পূর্ণ হয়ে ওঠে।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (খেয়া কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও আপনার দেওয়া বিন্যাস অনুযায়ী উপস্থাপিত হয়েছে। (বি.দ্র. পাঠের সাবলীলতা ও প্রামাণ্য রূপ বজায় রাখতে আপনার প্রদত্ত কবিতার টেক্সটের ভেতরের অপ্রয়োজনীয় ব্র্যাকেট ও ইংরেজি অংশগুলো পরিহার করে মূল প্রামাণ্য রূপটি তুলে ধরা হয়েছে)।

মন্তব্য করুন