বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গীতালি’ (১৯১৪) কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর আধ্যাত্মিক ও প্রেমমূলক গান বা কবিতা হলো ‘প্রেমের প্রাণে সইবে কেমন’। এই কবিতায় পরম প্রেমময় ঈশ্বরের কাছে মানুষের আত্মা বা ভক্তের ফিরে যাওয়ার ব্যাকুলতা এবং ঈশ্বরের দিক থেকে ভক্তকে আপন করে নেওয়ার যে কঠিন কিন্তু মধুর টান, তা ব্যক্ত হয়েছে।
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | প্রেমের প্রাণে সইবে কেমন |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | গীতালি |
| প্রকাশের বছর | ১৯১৪ (১৩২১ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | আধ্যাত্মিক ও প্রেমমূলক গীতি-কবিতা (Spiritual and Romantic Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৯১৪ সালে প্রকাশিত ‘গীতালি’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ ঈশ্বরপ্রেম এবং মানবজীবনের আধ্যাত্মিক উপলব্ধিকে নানা সুরে ও ছন্দে তুলে ধরেছেন। ‘প্রেমের প্রাণে সইবে কেমন’ কবিতায় ঈশ্বর ও ভক্তের মধ্যকার নিবিড় সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে। যে ভক্ত একসময় পথভ্রষ্ট হয়ে জাগতিক মোহে দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে, ঈশ্বর তাকে কাঁদিয়ে হলেও নিজের কাছে ফিরিয়ে আনেন। ঈশ্বরের এই প্রেমের দান সহজ নয়; এর মধ্যে রয়েছে মোহমুক্তির বেদনা ও এক গভীর আকর্ষণ। পরিশেষে জীবনের সব কালিমা ও অহংকার ধুয়ে ফেলে ঈশ্বর তাঁর ভক্তকে মিলনের সাজে আপন করে নেন।
প্রেমে-র প্রাণে সইবে কেমন করে–
তোমার যেজন সে যদি গো
দ্বারে দ্বারে ঘোরে।
কাঁদিয়ে তারে ফিরিয়ে আন,
কিছুতেই তো হার না মান,
তার বেদনায় তোমার অশ্রু
রইল যে গো ভরে।
সামান্য নয় তব প্রেমের দান–
বড়ো কঠিন ব্যথা এ যে,
বড়ো কঠিন টান।
মরণ-স্নানে ডুবিয়ে শেষে
সাজাও তবে মিলনবেশে,
সকল বাধা ঘুচিয়ে ফেলে
বাঁধ বাহুর ডোরে।

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- ভক্তের প্রতি ঈশ্বরের অধিকারবোধ:“প্রেমের প্রাণে সইবে কেমন করে– / তোমার যেজন সে যদি গো / দ্বারে দ্বারে ঘোরে।”— ঈশ্বর পরম প্রেমময়। তাঁর নিজস্ব জন বা ভক্ত যখন পথ ভুলে জাগতিক আশ্রয়ের খোঁজে দ্বারে দ্বারে ঘোরে, তখন ঈশ্বরের প্রেমের প্রাণে তা সয় না। তিনি অধিকারবোধ নিয়ে তাকে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনতে চান।
- বেদনার মাধ্যমে পরিশুদ্ধি:“কাঁদিয়ে তারে ফিরিয়ে আন, / কিছুতেই তো হার না মান… বড়ো কঠিন ব্যথা এ যে, / বড়ো কঠিন টান।”— ঈশ্বরের এই ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া খুব সহজ নয়। তিনি ভক্তকে জাগতিক দুঃখ ও বেদনার মধ্য দিয়ে কাঁদিয়ে পরিশুদ্ধ করেন। তাঁর প্রেমের দান অত্যন্ত কঠিন, কারণ এতে জাগতিক মোহমুক্তির এক তীব্র ব্যথা ও দুর্নিবার আকর্ষণ লুকিয়ে থাকে।
- মৃত্যু ও চিরন্তন মিলন:“মরণ-স্নানে ডুবিয়ে শেষে / সাজাও তবে মিলনবেশে, / সকল বাধা ঘুচিয়ে ফেলে / বাঁধ বাহুর ডোরে।”— সবশেষে ঈশ্বর তাঁর ভক্তকে ‘মরণ-স্নান’ বা জাগতিক মৃত্যু ও অহংবোধের অবসানের মাধ্যমে পবিত্র করেন। সমস্ত জাগতিক মোহ ও বাধা দূর করে তিনি ভক্তকে মিলনের পোশাকে সাজিয়ে চিরকালের জন্য আপন বাহুডোরে বেঁধে নেন। এটি মূলত ঈশ্বরের সাথে আত্মার চিরন্তন মিলনের রূপক।
