চৈতালী কাব্যগ্রন্থের প্রভাত কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চৈতালী’ কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত স্নিগ্ধ, নির্মল নিসর্গচিত্রণ ও বিশ্বপ্রেমের চতুর্দশপদী (সনেটধর্মী) কবিতা হলো ‘প্রভাত’। পল্লীপ্রকৃতির সদ্যজাগ্রত ভোরের অনাবিল রূপ, মানুষের কর্মব্যস্ততা শুরুর পূর্বমুহূর্তের নিস্তব্ধতা এবং উন্মুক্ত বাতায়নে বসে প্রকৃতির আলো-হাওয়াকে আত্মস্থ করে বেঁচে থাকার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতাবোধ এ কবিতায় চমৎকারভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামপ্রভাত
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থচৈতালী (চিত্রা-চৈতালি পর্ব)
রচনাকাল/প্রকাশের বছরআশ্বিন, ১৩০৩ বঙ্গাব্দ (১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দ)
কবিতার আঙ্গিক ও ধরনচতুর্দশপদী বা সনেটধর্মী নিসর্গ-লিরিক ও আত্মতৃপ্তির কবিতা (Nature Sonnet)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৮৯৬ সালে শিলাইদহে পদ্মা বোটের ওপর অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথ ‘চৈতালী’ কাব্যের স্তব্ধ ও ধীরলয়ের সনেটগুলো রচনা করেন। নগরজীবনের কৃত্রিমতা ছেড়ে পল্লীপ্রকৃতির সহজ সারল্য তখন তাঁর দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। এই কবিতায় তিনি এমন এক ভোরের ছবি এঁকেছেন, যখন প্রকৃতি ঘুম ভেঙে জেগে উঠছে কিন্তু মানুষের প্রাত্যহিক কোলাহল তখনও শুরু হয়নি। রাজহাঁস এখনও জলে নামেনি, ঘাটে বধূদের পদচারণা পড়েনি, চাষি বা গরু মাঠে নামেনি। এমন এক পবিত্র মুহূর্তে কবি ঘরের মুক্ত জানালায় দাঁড়িয়ে আকাশের আলো ও বাতাসকে নিজের ক্লান্ত কপালে বরণ করে নেন। পাখির কলকাকলিতে আকাশ যখন অমৃতস্রোতে দোলে, তখন কবি কোনো জাগতিক চাওয়া-পাওয়ার হিসাবে না গিয়ে কেবল এই আলো দেখতে পাওয়া এবং সমগ্র জগতকে ভালোবাসতে পারার অনুভূতিতেই নিজের মানবজীবনকে ‘ধন্য’ বলে ঘোষণা করেন।

সম্পূর্ণ কবিতা:

নির্মল তরুণ উষা, শীতল সমীর,

শিহরি শিহরি উঠে শান্ত নদীনীর।

এখনো নামে নি জলে রাজহাঁসগুলি,

এখনো ছাড়ে নি নৌকা সাদা পাল তুলি।

এখনো গ্রামের বধূ আসে নাই ঘাটে,

চাষি নাহি চলে পথে, গোরু নাই মাঠে।

আমি শুধু একা বসি মুক্ত বাতায়নে

তপ্ত ভাল পাতিয়াছি উদার গগনে।

বাতাস সোহাগস্পর্শ বুলাইছে কেশে,

প্রসন্ন কিরণখানি মুখে পড়ে এসে।

পাখির আনন্দগান দশ দিক হতে

দুলাইছে নীলাকাশ অমৃতের স্রোতে।

ধন্য আমি হেরিতেছি আকাশের আলো,

ধন্য আমি জগতেরে বাসিয়াছি ভালো।

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Nirmol torun usha, shitol shomir,
Shihori shihori uthe shanto nodinir.
Ekhono name ni jole rajhanshguli,
Ekhono chhare ni nouka shada pal tuli.
Ekhono gramer bodhu ashe nai ghate,
Chashi nahi chole pothe, goru nai mathe.
Ami shudhu eka bosi mukto batayone
Topto bhal patiyachhi udar gogone.
Batash shohagsporsho bulaichhe keshe,
Proshonno kironkhani mukhe pore eshe.
Pakhir anondogan dosh dik hote
Dulaichhe nilakash omriter srote.
Dhonno ami heritechhi akasher alo,
Dhonno ami jogotere bashiyachhi bhalo.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • কর্মহীন ভোরের শান্ত প্রতিচ্ছবি:
    “নির্মল তরুণ উষা, শীতল সমীর, / শিহরি শিহরি উঠে শান্ত নদীনীর। / এখনো নামে নি জলে রাজহাঁসগুলি, / এখনো ছাড়ে নি নৌকা সাদা পাল তুলি।”
    — দিনের আলো সবে ফুটছে; শীতল হাওয়ায় নদীর জল শিহরিত হলেও চারিদিকে কোনো তাড়া নেই। নৌকা, রাজহাঁস বা গ্রামের মেহনতি মানুষের কোলাহলহীন এই নিথর রূপটি প্রকৃতির এক আদি ও অকৃত্রিম পবিত্রতাকে ফুটিয়ে তোলে।
  • প্রকৃতির সোহাগে আত্মসমর্পণ:
    “আমি শুধু একা বসি মুক্ত বাতায়নে / তপ্ত ভাল পাতিয়াছি উদার গগনে। / বাতাস সোহাগস্পর্শ বুলাইছে কেশে, / প্রসন্ন কিরণখানি মুখে পড়ে এসে।”
    — জীবনের সমস্ত ক্লান্তি ও উত্তাপ মুছে নিতে কবি নিজের ‘তপ্ত ভাল’ (কপাল) পেতে দিয়েছেন উদার আকাশের পানে। ভোরের বাতাস যেন মাতৃস্নেহে চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, আর সূর্যের প্রথম কোমল কিরণ অন্তরে এক গভীর প্রসন্নতা এনে দিচ্ছে।
  • বিশ্বপ্রেম ও জীবনের সার্থকতা:
    “পাখির আনন্দগান দশ দিক হতে / দুলাইছে নীলাকাশ অমৃতের স্রোতে। / ধন্য আমি হেরিতেছি আকাশের আলো, / ধন্য আমি জগতেরে বাসিয়াছি ভালো।”
    — কবিতার অন্তিম দুই চরণে রবীন্দ্রনাথের সামগ্রিক জীবনদর্শনের মূল সুরটি উচ্চারিত হয়েছে। মানুষের পরম সৌভাগ্য কোনো পার্থিব ধনদৌলত বা খ্যাতিতে নয়; একটি সুন্দর সকালের আলো দেখতে পাওয়া এবং হৃদয় উজাড় করে এই সুন্দর বিশ্বসংসারকে ভালোবাসতে পারাটাই জীবনের শ্রেষ্ঠ সার্থকতা।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, ছন্দবিন্যাস ও সংকলন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (চৈতালী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংকলন ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন