বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূজা পর্বের এক অনন্য আত্মোৎসর্গমূলক, গভীর আধ্যাত্মিক ও আত্মশুদ্ধির গান “তোমার প্রেমে ধন্য কর যারে”। উপনিষদিক দর্শনে জারিত এই গানটিতে ঈশ্বরের নিখাদ ভালোবাসাকে মানুষের আত্মোপলব্ধির মূল চাবিকাঠি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। পরমাত্মার প্রেমের সান্নিধ্য লাভ করলে মানুষ কীভাবে পার্থিব দুঃখ-শোক, নিন্দা ও সংসারের যাবতীয় প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে এক নির্ভীক, অবিচল ও দিব্য চেতনায় উত্তীর্ণ হতে পারে—গানটি তারই এক অবিস্মরণীয় সুরময় প্রার্থনা।
Table of Contents
গানের বিস্তারিত তথ্য
| তথ্যবিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| শিরোনাম | তোমার প্রেমে ধন্য কর যারে |
| পর্যায় | পূজা পর্যায় (গান সংখ্যা: ৮৯) |
| উপ-পর্যায় | প্রার্থনা |
| রাগ | বৃন্দাবনী সারং |
| তাল | তেওরা (সাত মাত্রা: ৩+২+২) |
| রচনাকাল (বঙ্গাব্দ) | ১ মাঘ, ১৩৩৪ বঙ্গাব্দ |
| রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ) | ১৫ জানুয়ারি, ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দ |
| রচনাস্থান | শান্তিনিকেতন |
| স্বরলিপিকার | দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল উপজীব্য | আত্মোপলব্ধি, অপার্থিব নির্ভরতা, দুঃখজয়ের শক্তি ও পারলৌকিক দৃষ্টি |
তোমার প্রেমে:
তোমার প্রেমে ধন্য কর যারে সত্য ক’রে পায় সে আপনারে ॥
দুঃখে শোকে নিন্দা-পরিবাদে
চিত্ত তার ডোবে না অবসাদে,
টুটে না বল সংসারের ভারে ॥
পথে যে তার গৃহের বাণী বাজে, বিরাম জাগে কঠিন তার কাজে।
নিজেরে সে যে তোমারি মাঝে দেখে,
জীবন তার বাধায় নাহি ঠেকে,
দৃষ্টি তার আঁধার-পরপারে ॥
তোমার প্রেমে — Romanized Version
Tomar preme dhonno kor jare satya k’re pay se apnare॥
Dukhe shoke ninda-poribade
chitto tar dobe na obsade,
tute na bol songsarer bhare॥
Pothe je tar griher bani baje, biram jage kothin tar kaje।
Nijere se je tomari majhe dekhe,
jibon tar badhay nahi theke,
drishti tar andhar-paropare॥
গানের মূল ভাব
“তোমার প্রেমে ধন্য কর যারে” গানটির মূল ভিত্তি হলো প্রেম ও আত্মজ্ঞানের অবিচ্ছেদ্য যোগসূত্র। সাধারণ অবস্থায় মানুষ অহংকার ও পার্থিব মোহে নিজের প্রকৃত সত্তাকে চিনতে ভুল করে। কিন্তু যখন সে পরমেশ্বরের অহৈতুকী প্রেমের স্পর্শ পায়, তখনই সে নিজেকে ‘সত্য’ রূপে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়।
এই প্রেম কোনো পলায়নপর বৈরাগ্য শেখায় না, বরং কর্মময় সংসারের ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করার অসীম মানসিক শক্তি জোগায়। শোক, দুঃখ কিংবা সমাজের নিন্দা যাকে স্পর্শ করতে পারে না, তার কাছে চলার কঠিন পথও ঘরের স্নিগ্ধ বাণীর মতো মনে হয়। পার্থিব আঁধারের সীমানা পেরিয়ে সে এক অনন্ত আলোকবর্তিকার সন্ধান পায়, যেখানে সমস্ত পার্থিব বন্ধন অর্থহীন হয়ে যায়।

চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ
১. আত্মোপলব্ধি ও পরম আশীর্বাদ
- “তোমার প্রেমে ধন্য কর যারে সত্য ক’রে পায় সে আপনারে…”রবীন্দ্র-দর্শনের মূল কথা—আত্মাকে জানা। পরমেশ্বরের প্রেমের আলোতেই কেবল মানুষ নিজের ভেতরের শ্রেষ্ঠ মানবীয় সত্যকে আবিষ্কার করতে পারে। প্রেম এখানে মুক্তির একমাত্র অনুঘটক।
২. অবিচল চিত্ত ও সংসারের ভারমুক্তি
- “দুঃখে শোকে নিন্দা-পরিবাদে চিত্ত তার ডোবে না অবসাদে / টুটে না বল সংসারের ভারে…”বাস্তব জীবনের চরম সত্য হলো প্রতিকূলতা। তবে যে সাধক অন্তরে ঈশ্বরকে আশ্রয় করেছে, বাইরের কোনো নিন্দা বা লাঞ্ছনা তার মনকে অবসাদগ্রস্ত করতে পারে না। সংসারের জটিল দায়িত্বও তার আত্মিক শক্তিকে ভেঙে ফেলতে ব্যর্থ হয়।
৩. পথের মাঝে গৃহের সুর ও কর্মে প্রশান্তি
- “পথে যে তার গৃহের বাণী বাজে, বিরাম জাগে কঠিন তার কাজে…”এক অপূর্ব আত্মিক রূপান্তর। ভবঘুরে পথও তার কাছে নিরাপদ গৃহের মতো শান্তির বার্তা বহন করে। কঠোরতম কাজের মাঝেও সে খুঁজে পায় অন্তরের এক নির্মল বিশ্রাম বা পরম প্রশান্তি।
৪. আঁধার পেরোনো অতীন্দ্রিয় দৃষ্টি
- “নিজেরে সে যে তোমারি মাঝে দেখে, জীবন তার বাধায় নাহি ঠেকে / দৃষ্টি তার আঁধার-পরপারে…”ঈশ্বর ও আত্মার অদ্বৈত রূপ। যখন মানুষ নিজের ক্ষুদ্র অস্তিত্বকে অনন্তের সাথে মিলিয়ে দেখে, তখন জীবনের কোনো পার্থিব বাধাই তাকে আটকে রাখতে পারে না। পার্থিব অন্ধকারের ওপারে পরম সত্যের জ্যোতিতে তার চোখ সর্বদা উন্মীলিত থাকে।
বিদায়ের আঘাত ও আশাহীন নয়ন
পার্থিব জগতের ক্ষণভঙ্গুর সম্পর্ক এবং মানুষের ক্ষুদ্র সীমাবদ্ধতার প্রতি মোহভঙ্গের চরম রূপ এই চরণে অনুভূত হয়। জাগতিক কোনো সান্ত্বনার দিকে যখন আশাহীন নয়ন আর ফিরে তাকায় না, তখনই আত্মা সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে নিজেকে পরম করুণাময়ের চরণে সঁপে দেয়। সংসারের আঘাত ও নশ্বর সম্পর্কের বিচ্ছেদ-যন্ত্রণা তখন মানুষের দৃষ্টিকে অন্তর্মুখী করে তোলে। চোখ থেকে জাগতিক মোহের পর্দা খসে পড়লে আশাহীন দৃষ্টি রূপ নেয় ‘আঁধার-পরপারে’ দৃষ্টির এক অনন্ত উত্তরণে—যেখানে সব হারানোর পরেও অন্তরের আলো কখনো নিভে যায় না।
সাহিত্যিক ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য
- উপনিষদের ব্রহ্মানুভূতির প্রকাশ: প্রাচীন ভারতীয় ঋষিদের “আত্মানং বিদ্ধি” (নিজেকে জানো) দর্শনের প্রতিফলন ঘটেছে সহজ অথচ গভীর বাংলা কাব্যে।
- দ্বান্দ্বিক রূপকের মেলবন্ধন (Oxymoron): ‘পথ’ এবং ‘গৃহ’, ‘কঠিন কাজ’ এবং ‘বিরাম’—এই বিপরীতধর্মী অনুষঙ্গগুলোকে একত্রিত করে আধ্যাত্মিক সামঞ্জস্যের অনন্য সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
- সংহত ও ঋজু বাচনভঙ্গি: কোনো প্রকার অলংকারের আতিশয্য নেই; প্রতিটি শব্দ গভীর বিশ্বাস ও আত্মপ্রত্যয়ে উজ্জ্বল।
সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সুরের নান্দনিকতা
- বৃন্দাবনী সারং রাগের গাম্ভীর্য: মধ্যাহ্নকালের রাগ বৃন্দাবনী সারং-এর ওপর গানটি আশ্রিত। এই রাগের উদার, উদাসীন অথচ দীপ্ত চলন গানের প্রার্থনাভাবকে এক প্রশান্ত মহিমা দান করে।
- তেওরা তালের গতিশীল চলন: সাত মাত্রার (৩+২+২) তেওরা তালের দৃঢ় ছন্দ গানটিকে বলিষ্ঠ পদচারণার রূপ দেয়। এটি কেবল দুর্বল আর্তনাদ নয়, বরং অন্তরের বিজয়যাত্রার দ্যোতক।
- দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বরলিপি: রবীন্দ্রনাথের গানের স্বরভাণ্ডারী দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিখুঁত সুরবিন্যাসে রাগের বিশুদ্ধতা ও বাণীর ভাবগাম্ভীর্য সুরক্ষিত হয়েছে।
শিল্পী ও স্রষ্টা পরিচিতি
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১): ১৯২৮ সালের মাঘোৎসব উপলক্ষে শান্তিনিকেতনের মন্দিরে উপাসনার উদ্দেশ্যে কবি এই গানটি রচনা করেন। জীবনের পরিণত বয়সে রচিত এই পূজা পর্যায়ের গানটিতে কবির ব্যক্তিগত শোক ও বেদনার রূপান্তর ঘটেছিল সর্বজনীন আধ্যাত্মিক প্রত্যয়ে।
- গীতবিতানের পূজা পর্যায়: গীতবিতানের গানগুলোর মধ্যে পূজা পর্ব মানুষের আত্মশুদ্ধি ও অসীম নির্ভরতার এক চিরন্তন আশ্রয়।
সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
“তোমার প্রেমে ধন্য কর যারে” গানটি শান্তিনিকেতনের আশ্রমের উপাসনা এবং ব্রাহ্ম সমাজের প্রার্থনায় নিয়মিত পরিবেশিত হয়। এটি কেবল আনুষ্ঠানিক কোনো উপাসনাগীতি নয়, বরং হতাশাগ্রস্ত মানুষের জীবনে মানসিক প্রশান্তি ও আত্মবিশ্বাস অর্জনের এক অমূল্য পাথেয়। মানবজীবনের সংকটে অবিচল থাকার এই প্রার্থনা যেকোনো যুগের সংগীতপিপাসুর অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে।

উৎস ও তথ্যসূত্র
- গীতবিতান (অখণ্ড সংস্করণ), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ।
- স্বরবিতান (পঞ্চবিংশ খণ্ড – ২৫), বিশ্বভারতী প্রকাশনা।
- রবীন্দ্রসংগীত পরিক্রমা ও রাগ-বিশ্লেষণ, শান্তিদেব ঘোষ।


![বিরহীর পত্র birohir potro [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিরহীর পত্র birohir potro [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/বিরহীর-পত্র-birohir-potro-কবিতা--1024x536.gif)




![ভগ্নহৃদয় ষোড়শ সর্গ bhagno hriday soros sorgo [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভগ্নহৃদয় ষোড়শ সর্গ bhagno hriday soros sorgo [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/ভগ্নহৃদয়-ষোড়শ-সর্গ-bhagno-hriday-soros-sorgo-কবিতা--1024x536.gif)


