কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | বাঁশি |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | পুনশ্চ |
| প্রকাশের বছর | ১৯৩২ (১৩৩৯ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | আধুনিক গদ্যছন্দের বাস্তববাদী ও মনস্তাত্ত্বিক লিরিক কবিতা (Modern Prose Poem / Realistic Lyric) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৯৩২ সালে প্রকাশিত ‘পুনশ্চ’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গদ্যছন্দে লেখা কবিতার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহ। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতে কবি প্রাত্যহিক জীবনের রূঢ় বাস্তবতা, মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস এবং তার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা সুক্ষ্ম রোমান্টিক অনুভূতিকে অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় রূপ দিয়েছেন। ‘বাঁশি’ কবিতায় কলকাতার কিনু গোয়ালার গলির এক লোনা-ধরা একতলা ঘরের নিম্নবিত্ত কেরানি হরিপদের জীবনের চিত্র আঁকা হয়েছে। পঁচিশ টাকা বেতনের কেরানি হরিপদ পিসিদের গ্রামের সেই মেয়েটির ভয়ে পালিয়ে এসেছে যার সাথে তার বিয়ের ঠিকঠাক হয়েছিল। গলির নোংরা আবর্জনা, স্যাঁতসেঁতে ঘর, ছাতার ফুটো দশা এবং আপিসের জ্যান্ত লাশের মতো দিন কাটানোর মাঝেই মোড়ের কান্তবাবুর কর্নেট বা বাঁশির সুর সব ওলটপালট করে দেয়। সিন্ধু-বারোয়াঁ রাগের সেই করুণ সুরে মুহূর্তের জন্য গলিটার মিথ্যাত্ব দূর হয়ে যায় এবং আকবর বাদশার সাথে হরিপদ কেরানির কোনো তফাত থাকে না। বাঁশির সুর বেয়ে ছেঁড়া ছাতা আর রাজছত্র এক হয়ে ধলেশ্বরী নদীর তীরে ঢাকাই শাড়ি ও সিঁদুরপরা অপেক্ষরতা সেই নারীর কাছে গিয়ে পৌঁছায়।
বাঁশি কবিতা (সম্পূর্ণ)
কিনু গোয়ালার গলি।
দোতলা বাড়ির
লোহার-গরাদে-দেওয়া একতলা ঘর
পথের ধারেই।
লোনা-ধরা দেওয়ালেতে মাঝে মাঝে ধসে গেছে বালি,
মাঝে মাঝে স্যাঁতা-পড়া দাগ।
মার্কিন থানের মার্কা একখানা ছবি
সিদ্ধিদাতা গণেশের
দরজার ‘পরে আঁটা।
আমি ছাড়া ঘরে থাকে আরেকটা জীব
এক ভাড়াতেই,
সেটা টিকটিকি।
তফাত আমার সঙ্গে এই শুধু,
নেই তার অন্নের অভাব।
বেতন পঁচিশ টাকা,
সদাগরি আপিসের কনিষ্ঠ কেরানি।
খেতে পাই দত্তদের বাড়ি
ছেলেকে পড়িয়ে।
শেয়ালদা ইস্টিশনে যাই,
সন্ধেটা কাটিয়ে আসি,
আলো জ্বালাবার দায় বাঁচে।
এঞ্জিনের ধস্ ধস্,
বাঁশির আওয়াজ,
যাত্রীর ব্যস্ততা,
কুলি-হাঁকাহাঁকি।
সাড়ে দশ বেজে যায়,
তার পরে ঘরে এসে নিরালা নিঃঝুম অন্ধকার।
ধলেশ্বরীনদীতীরে পিসিদের গ্রাম।
তাঁর দেওরের মেয়ে,
অভাগার সাথে তার বিবাহের ছিল ঠিকঠাক।
লগ্ন শুভ, নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেল–
সেই লগ্নে এসেছি পালিয়ে।
মেয়েটা তো রক্ষে পেলে,
আমি তথৈবচ।
ঘরেতে এল না সে তো, মনে তার নিত্য আসাযাওয়া–
পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।
বর্ষা ঘন ঘোর।
ট্রামের খরচা বাড়ে,
মাঝে মাঝে মাইনেও কাটা যায়।
গলিটার কোণে কোণে
জমে ওঠে পচে ওঠে
আমের খোসা ও আঁঠি, কাঁঠালের ভূতি,
মাছের কান্কা,
মরা বেড়ালের ছানা,
ছাইপাঁশ আরো কত কী যে!
ছাতার অবস্থাখানা জরিমানা-দেওয়া
মাইনের মতো,
বহু ছিদ্র তার।
আপিসের সাজ
গোপীকান্ত গোঁসাইয়ের মনটা যেমন,
সর্বদাই রসসিক্ত থাকে।
বাদলের কালো ছায়া
স্যাঁৎসেঁতে ঘরটাতে ঢুকে
কলে-পড়া জন্তুর মতন
মূর্ছায় অসাড়।
দিন রাত মনে হয়, কোন্ আধমরা
জগতের সঙ্গে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে আছি।
গলির মোড়েই থাকে কান্তবাবু,
যত্নে-পাট-করা লম্বা চুল,
বড়ো বড়ো চোখ,
শৌখিন মেজাজ।
কর্নেট বাজানো তার শখ।
মাঝে মাঝে সুর জেগে ওঠে
এ গলির বীভৎস বাতাসে–
কখনো গভীর রাতে,
ভোরবেলা আধো অন্ধকারে,
কখনো বৈকালে
ঝিকিমিকি আলোয় ছায়ায়।
হঠাৎ সন্ধ্যায়
সিন্ধু-বারোয়াঁয় লাগে তান,
সমস্ত আকাশে বাজে
অনাদি কালের বিরহবেদনা।
তখনি মুহূর্তে ধরা পড়ে
এ গলিটা ঘোর মিছে,
দুর্বিষহ, মাতালের প্রলাপের মতো।
হঠাৎ খবর পাই মনে
আকবর বাদশার সঙ্গে
হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই।
বাঁশির করুণ ডাক বেয়ে
ছেঁড়াছাতা রাজছত্র মিলে চলে গেছে
এক বৈকুণ্ঠের দিকে।
এ গান যেখানে সত্য
অনন্ত গোধূলিলগ্নে
সেইখানে
বহি চলে ধলেশ্বরী;
তীরে তমালের ঘন ছায়া;
আঙিনাতে
যে আছে অপেক্ষা ক’রে, তার
পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।
বাঁশির Romanized Version:
Goler morei thake kantababu,
Jotne-pat-kora lomba chul,
Boro boro chokh,
Shoukhin mejaj.
Kornet bajano tar shokh.
Majhe majhe shur jege othe
E golir bibhotso batashe--
Kokhono gobhir rate,
Vhorbela adho andhokare,
Kokhono boikale
Jhikimiki aloy chhayay.
Hothat shondhyay
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- নিম্নবিত্তের যান্ত্রিক জীবন: কলকাতার নোংরা গলি ও পঁচিশ টাকা বেতনের কেরানির রূঢ়, ক্লান্তিকর ও অভিশপ্ত বাস্তব জীবনের এক নির্মম চিত্র।
- বাঁশির সুরের জাদুকরী মুক্তি: কর্নেটের করুণ বাঁশির সুর কীভাবে একজন সাধারণ কেরানিকে তার যান্ত্রিক বন্দীদশা থেকে মুক্ত করে কল্পনার ধলেশ্বরী নদীর তীরে তার চিরচেনা ভালোবাসার পৃথিবীতে নিয়ে যায়, সেটাই এই কবিতার মূল প্রতিপাদ্য।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

![কত দিবা কত বিভাবরী koto diba koto bibhabori [ কবিতা ] – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সংশয়ের আবেগ কবিতা । sangsayer abeg kobita | মানসী কাব্যগ্রন্থ | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/images-7-2-e1649150434648.jpg)
![ছবি ও গান কাব্যগ্রন্থের ‘বিদায়’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিদায় bidaay [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/বিদায়-bidaay-কবিতা--1024x536.gif)

![পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থের 'বাঁশি' কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1 বাঁশি bashi [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/বাঁশি-bashi-কবিতা--1024x536.gif)

![পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থের পয়লা আশ্বিন কবিতা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 2 পয়লা আশ্বিন poyla ashwin [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/পয়লা-আশ্বিন-poyla-ashwin-কবিতা--1024x536.gif)
![বনস্পতি bonospoti [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বনস্পতি bonospoti [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/বনস্পতি-bonospoti-কবিতা--1024x536.gif)
![তখন আমার বয়স tokhon amar boyos [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন আমার বয়স tokhon amar boyos [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/তখন-আমার-বয়স-tokhon-amar-boyos-কবিতা--1024x536.gif)