পূরবী কাব্যগ্রন্থের কঙ্কাল কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিণত বয়সের দার্শনিক ও অধ্যাত্মচেতনার এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ কবিতা হলো ‘কঙ্কাল’। মাঠের প্রান্তে পড়ে থাকা এক পশুর শুষ্ক অস্থিরাশিকে দেখে মৃত্যুচেতনার যে ক্ষণিক উপহাস জেগে উঠেছিল, তাকে অগ্রাহ্য করে মানবসত্তার অবিনশ্বরতা, আধ্যাত্মিক সম্পদ ও চেতনার চিরন্তন মুক্তির জয়গান এ কবিতায় এক পরম প্রত্যয়ে ঘোষিত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামকঙ্কাল
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থপূরবী
প্রকাশের বছর১৯২৫ (১৩৩২ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনদার্শনিক লিরিক ও মৃত্যুঞ্জয়ী অধ্যাত্ম-কবিতা (Philosophical Spiritual Lyric)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯২৫ সালে প্রকাশিত ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ বার্ধক্যের সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে জীবন, মৃত্যু ও অনন্তের সম্পর্ক নিয়ে গভীর আত্মজিজ্ঞাসায় নিমগ্ন হয়েছেন। পথপ্রান্তে পড়ে থাকা একটি পশুর কঙ্কাল যেন মানুষের জৈবিক পরিণতির চরম প্রতীক—যা ইঙ্গিত করে, প্রাণবায়ু ফুরিয়ে গেলে মানুষও পশুর মতোই ধূলির ভাঙা পাত্রে পরিণত হবে। কিন্তু কবি এই জৈবিক বস্তুবাদকে অস্বীকার করেন। মানুষ কেবল আহার-নিদ্রার জীব নয়; তার চিন্তা, শিল্পবোধ, অরূপের সাধনা ও আত্মদানের ক্ষমতা জড়দেহের সীমারেখা পেরিয়ে যায়। মানুষ ঈশ্বরের এক ক্ষণিক পরিহাস বা মহৎ সর্বনাশ নয়—তার চেতনা অবিনাশী। এই মৃত্যুঞ্জয়ী প্রত্যয়ই কবিতাটির মর্মমূল।

সম্পূর্ণ কবিতা:

পশুর কঙ্কাল ওই মাঠের পথের এক পাশে

                             পড়ে আছে ঘাসে–

যে ঘাস একদা তারে দিয়েছিল বল,

                             দিয়েছিল বিশ্রাম কোমল।

পড়ে আছে পাণ্ডু অস্থিরাশি

                             কালের নীরস অট্টহাসি।

             সে যেন রে মরণের অঙ্গুলিনির্দেশ–

ইঙ্গিতে কহিছে মোরে, “একদা পশুর যেথা শেষ,

   সেথায় তোমারও অন্ত, ভেদ নাহি লেশ।

             তোমারও প্রাণের সুরা ফুরাইলে পরে

ভাঙা পাত্র পড়ে রবে অমনি ধুলায় অনাদরে।’

আমি বলিলাম, “মৃত্যু, করি না বিশ্বাস

          তব শূন্যতার উপহাস।

                     মোর নহে শুধুমাত্র প্রাণ

সর্ব বিত্ত রিক্ত করি যার হয় যাত্রা অবসান;

                     যাহা ফুরাইলে দিন

শূন্য অস্থি দিয়ে শোধে আহারনিদ্রার শেষ ঋণ।’

ভেবেছি জেনেছি যাহা, বলেছি শুনেছি যাহা কানে,

             সহসা গেয়েছি যাহা গানে,

ধরে নি তা মরণের বেড়া-ঘেরা প্রাণে।

             যা পেয়েছি, যা করেছি দান

                             মর্তে তার কোথা পরিমাণ।

 

আমার মনের নৃত্য, কতবার জীবন-মৃত্যুরে

লঙ্ঘিয়া চলিয়া গেছে চিরসুন্দরের সুরপুরে।

          চিরকাল-তরে সে কি থেমে যাবে শেষে

                                                কঙ্কালের সীমানায় এসে।

                                যে আমার সত্য পরিচয়

                             মাংসে তার পরিমাপ নয়;

            পদাঘাতে জীর্ণ তারে নাহি করে দণ্ডপলগুলি–

                      সর্বস্বান্ত নাহি করে পথপ্রান্তে ধূলি।

আমি যে রূপের পদ্মে করেছি অরূপমধু পান,

দুঃখের বক্ষের মাঝে আনন্দের পেয়েছি সন্ধান,

            অনন্ত মৌনের বাণী শুনেছি অন্তরে,

দেখেছি জ্যোতির পথ শূন্যময় আঁধারপ্রান্তরে।

            নহি আমি বিধির বৃহৎ পরিহাস,

                             অসীম ঐশ্বর্য দিয়ে রচিত মহৎ সর্বনাশ।

 

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Poshur kongkal oi mather pother ek pashe
Pore achhe ghashe–
Je ghash ekoda tare diyechhilo bol,
Diyechhilo bishram komol.
Pore achhe pandu osthirashi
Kaler nirosh otthohashi.
She jeno re moroner ongulinirdesh–
Inggite kohichhe more, “Ekoda poshur jetha shesh,
Shethay tomaro onto, bhed nahi lesh.
Tomaro praner shura phuraile pore
Bhanga patro pore robe omni dhulay onadore.’
Ami bolilam, “Mrityu, kori na bisshash
Tobo shunnyotar upohash.
Mor nohe shudhumatro pran
Shorbo bit-to rikto kori jar hoy jatra oboshan;
Jaha phuraile din
Shunno osthi diye shodhe aharnidrar shesh rin.’
Bhebechhi jenechhi jaha, bolechhi shunechhi jaha kane,
Shohosa geyechhi jaha gane,
Dhore ni ta moroner bera-ghera prane.
Ja peyechhi, ja korechhi dan
Morte tar kotha poriman.
Amar moner nritto, kotobar jibon-mrityure
Longghiya choliya gechhe chiroshundorer shurupure.
Chirokal-tore she ki theme jabe sheshe
Kongkaler shimanay eshe.
Je amar shotto porichoy
Mangkse tar porimap noy;
Podaghate jirno tare nahi kore dondopolguli–
Shorboswanto nahi kore pothprante dhuli.
Ami je ruper podme korechhi orupmodhu pan,
Dukhkher bokkher majhe anonder peyechhi shondhan,
Ononto mouner bani shunechhi ontore,
Dekhechhi jyotir poth shunnomoy andharprantore.
Nohi ami bidhir brihot porihash,
Oshim oishworjo diye rochito mohot shorbonash.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • জৈবিক সমাপ্তি ও মৃত্যুর উপহাস:
    “পশুর কঙ্কাল ওই মাঠের পথের এক পাশে / পড়ে আছে ঘাসে– / … সে যেন রে মরণের অঙ্গুলিনির্দেশ– / ইঙ্গিতে কহিছে মোরে, ‘একদা পশুর যেথা শেষ, / সেথায় তোমারও অন্ত, ভেদ নাহি লেশ।'”
    — মৃত্যুর চোখে মানুষ ও পশুর জৈবিক গঠনে কোনো তফাত নেই। জীবনপাত্র শূন্য হলে উভয়েই ধূসর অস্থিরাশিতে পরিণত হয়। মরণের এই চরম নীরব শ্লেষ মানব অস্তিত্বের ক্ষণভঙ্গুরতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
  • আত্মিক ঐশ্বর্য ও মর্ত্যোত্তীর্ণ মানবচেতনা:
    “আমি বলিলাম, ‘মৃত্যু, করি না বিশ্বাস / তব শূন্যতার উপহাস। / মোর নহে শুধুমাত্র প্রাণ / সর্ব বিত্ত রিক্ত করি যার হয় যাত্রা অবসান;’ / … যে আমার সত্য পরিচয় / মাংসে তার পরিমাপ নয়;”
    — কবি মৃত্যুর এই শূন্যতাকে সতেজে অস্বীকার করেন। মানুষের পরিচয় কেবল রক্ত-মাংসের খাঁচায় আবদ্ধ নয়। তার চিন্তা, জ্ঞান, গান ও নিঃস্বার্থ আত্মদান কোনো জৈবিক সীমায় নিঃশেষিত হয় না। মহাকালের ক্ষুদ্র পল-অনুপল বা পথের ধূলি মানুষের এই আত্মিক সত্যকে ধ্বংস করতে পারে না।
  • অনন্তের উপলব্ধি ও অবিনশ্বর সত্তা:
    “আমি যে রূপের পদ্মে করেছি অরূপমধু পান, / দুঃখের বক্ষের মাঝে আনন্দের পেয়েছি সন্ধান, / … নহি আমি বিধির বৃহৎ পরিহাস, / অসীম ঐশ্বর্য দিয়ে রচিত মহৎ সর্বনাশ।”
    — মানুষ দৃশ্যমান রূপের মাঝে অরূপের রসাস্বাদন করেছে, দুঃখের ভেতর থেকে পরম আনন্দকে চিনেছে এবং শূন্য অন্ধকারেও আলোর পথ প্রত্যক্ষ করেছে। ঈশ্বর মানুষকে এত আধ্যাত্মিক ও সৃষ্টিশীল ঐশ্বর্য দিয়ে সাজিয়েছেন কেবল তাকে ধুলায় মিশিয়ে ধ্বংস করার জন্য নয়। মানবচেতনা চিরসুন্দরের অংশ—তাই কঙ্কালের সীমানায় তার সমাপ্তি অসম্ভব।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, ছন্দবিন্যাস ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পূরবী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন