বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পূরবী’ (১৯২৫) কাব্যগ্রন্থের অন্যতম একটি দার্শনিক, গভীর ভাবরসময় ও আধ্যাত্মিক সৃষ্টি হলো ‘ভাঙা-মন্দির’। এই কবিতায় মানুষের গড়া জীর্ণ ও পরিত্যক্ত দেবালয়ের বাহ্যিক শূন্যতা এবং প্রকৃতির অকৃত্রিম পূজার মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের চিরন্তন উপস্থিতির এক অপূর্ব ও রূপকধর্মী প্রকাশ অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | ভাঙা-মন্দির |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | পূরবী |
| প্রকাশের বছর | ১৯২৫ (১৩৩২ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | দার্শনিক লিরিক ও প্রকৃতি-আধ্যাত্মিক কবিতা (Philosophical Lyric) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৯২৫ সালে প্রকাশিত ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের এক পরিপক্ব ও রোমান্টিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ। এই কাব্যগ্রন্থের ‘ভাঙা-মন্দির’ কবিতায় কবি দেখিয়েছেন যে, মানুষের তৈরি কোনো উপাসনালয় বা মন্দির জীর্ণ হয়ে গেলে, সেখানে পুণ্যলোভী মানুষের ভিড় বা অর্ঘ্যের আলো না থাকলেও প্রকৃতি ঠিকই তার আপন মহিমায় সেই শূন্যতা পূর্ণ করে দেয়। ভক্তরা বা সন্ন্যাসীরা মন্দিরে দেবতা নেই ভেবে দূরে সরে গেলেও, সেই ফাঁকা প্রাঙ্গণে ফাগুনের বনফুল, পাখির কূজন এবং বসন্তের হাওয়ায় নিখিল প্রকৃতির দেবতা এসে আসন পাতেন। বাহ্যিক আড়ম্বর বা আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে প্রাকৃতজীবন ও অন্তরের ভক্তিই যে স্রষ্টার প্রকৃত আরাধনা, এই গভীর দার্শনিক সত্যটিই এই কবিতায় মূর্ত হয়ে উঠেছে।
Table of Contents
ভাঙা-মন্দির কবিতা (সম্পূর্ণ)
১
পুণ্যলোভীর নাই হল ভিড়
শূন্য তোমার অঙ্গনে,
জীর্ণ হে তুমি দীর্ণ দেবতালয়।
অর্ঘ্যের আলো নাই বা সাজালো
পুষ্পে প্রদীপে চন্দনে
যাত্রীরা তব বিস্মৃতপরিচয়।
সম্মুখপানে দেখো দেখি চেয়ে,
ফাল্গুনে তব প্রাঙ্গণ ছেয়ে
বনফুলদল ওই এল ধেয়ে
উল্লাসে চারি ধারে।
দক্ষিণ বায়ে কোন্ আহ্বান
শূন্যে জাগায় বন্দনাগান,
কী খেয়াতরীর পায় সন্ধান
আসে পৃথ্বী পারে?
গন্ধের থালি বর্ণের ডালি
আনে নির্জন অঙ্গনে,
জীর্ণ হে তুমি দীর্ণ দেবতালয়,
বকুল শিমূল আকন্দ ফুল
কাঞ্চন জবা রঙ্গনে
পূজাতরঙ্গ দুলে অম্বরময়।
২
প্রতিমা নাহয় হয়েছে চূর্ণ,
বেদীতে নাহয় শূন্যতা,
জীর্ণ হে তুমি দীর্ণ দেবতালয়,
নাহয় ধুলায় হল লুণ্ঠিত
আছিল যে চূড়া উন্নত,
সজ্জা না থাকে কিসের লজ্জা ভয়?
বাহিরে তোমার ওই দেখো ছবি,
ভগ্নভিত্তিলগ্ন মাধবী,
নীলাম্বরের প্রাঙ্গণে রবি
হেরিয়া হাসিছে স্নেহে।
বাতাসে পুলকি আলোকে আকুলি
আন্দোলি উঠে মঞ্জরীগুলি,
নবীন প্রাণের হিল্লোল তুলি
প্রাচীন তোমার গেহে।
সুন্দর এসে ওই হেসে হেসে
ভরি দিল তব শূন্যতা,
জীর্ণ হে তুমি দীর্ণ দেবতালয়।
ভিত্তিরন্ধ্রে বাজে আনন্দে
ঢাকি দিয়া তব ক্ষুণ্নতা
রূপের শঙ্খে অসংখ্য “জয় জয়’।
৩
সেবার প্রহরে নাই আসিল রে
যত সন্ন্যাসী-সজ্জনে,
জীর্ণ হে তুমি দীর্ণ দেবতালয়।
নাই মুখরিল পার্বণ-ক্ষণ
ঘন জনতার গর্জনে,
অতিথি-ভোগের না রহিল সঞ্চয়।
পূজার মঞ্চে বিহঙ্গদল
কুলায় বাঁধিয়া করে কোলাহল,
তাই তো হেথায় জীববৎসল
আসিছেন ফিরে ফিরে।
নিত্য সেবার পেয়ে আয়োজন
তৃপ্ত পরানে করিছে কূজন,
উৎসবরসে সেই তো পূজন
জীবন-উৎসতীরে।
নাইকো দেবতা ভেবে সেই কথা
গেল সন্ন্যাসী-সজ্জনে,
জীর্ণ হে তুমি দীর্ণ দেবতালয়।
সেই অবকাশে দেবতা যে আসে–
প্রসাদ-অমৃত-মজ্জনে
স্খলিত ভিত্তি হল যে পুণ্যময়।
ভাঙা-মন্দির কবিতার Romanized Version:
2
3
- আনুষ্ঠানিকতার ঊর্ধ্বে প্রাণের পূজা: মানুষের গড়া মন্দির জীর্ণ হতে পারে, দেবমূর্তি ভেঙে যেতে পারে এবং উপাসকদের ভিড় হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু তাতে ঈশ্বরের আরাধনা থেমে থাকে না।
- প্রকৃতির সান্নিধ্যে দিব্য উপস্থিতি: বনফুল, পাখির কলকাকলি এবং ফাগুনের বাতাস দিয়ে প্রকৃতি নিজেই ভাঙা মন্দিরের শূন্যতা ও পবিত্রতা রক্ষা করে—এই আধ্যাত্মিক ও প্রকৃতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গিই কবিতার মূল বার্তা।


![পূরবী কাব্যগ্রন্থের 'ভাঙা-মন্দির' কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1 ভাঙা-মন্দির bhanga mondir [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/ভাঙা-মন্দির-bhanga-mondir-কবিতা--1024x536.gif)



![কেন গান গাই kena gaan gaai [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেন গান গাই kena gaan gaai [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/কেন-গান-গাই-kena-gaan-gaai-কবিতা--1024x536.gif)