আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

প্রভাত সংগীত কাব্যগ্রন্থের ‘মহাস্বপ্ন’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রভাত সংগীত’ (১৮৮৩) কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত গভীর, দার্শনিক ও মহাজাগতিক চেতনার কবিতা হলো ‘মহাস্বপ্ন’। এই কবিতায় সমগ্র সৃষ্টিজগতকে ধ্যানমগ্ন মহাদেবের একটি বিশাল স্বপ্ন হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে এবং সেই মহাস্বপ্ন ভেঙে কবে পরম সত্যের জাগরণ ঘটবে, সেই মহাজাগতিক প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামমহাস্বপ্ন
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থপ্রভাত সংগীত
প্রকাশের বছর১৮৮৩ (১২৯০ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনদার্শনিক ও মহাজাগতিক কবিতা (Philosophical and Cosmic Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৮৮৩ সালে প্রকাশিত ‘প্রভাত সংগীত’ কাব্যগ্রন্থে তরুণ রবীন্দ্রনাথের বিশ্বপ্রকৃতি ও অসীমের সাথে নিজের আত্মিক মিলনের এক বিপুল আনন্দ ও দার্শনিক চেতনা প্রকাশ পেয়েছে। ‘মহাস্বপ্ন’ কবিতাটি মূলত হিন্দু দর্শনের মায়াবাদ এবং সৃষ্টির মহাজাগতিক রূপের ওপর ভিত্তি করে রচিত। কবি এখানে সমগ্র মহাবিশ্বকে—তার গ্রহ-নক্ষত্র, জন্ম-মৃত্যু, ঋতুচক্র এবং অগণিত প্রাণের স্পন্দনকে—ধ্যানমগ্ন মহাদেব বা পরম সত্তার এক বিশাল স্বপ্ন হিসেবে দেখেছেন। এই জগত যেন এক দীর্ঘ মায়া বা অর্ধসত্য, যা অনন্তকাল ধরে আবর্তিত হচ্ছে এবং যা শেষ পর্যন্ত মহাপ্রলয়ের মাধ্যমে সেই পরম সত্যের মাঝেই বিলীন হয়ে যাবে।

মহাস্বপ্ন – সম্পূর্ণ কবিতা

পূর্ণ করি মহাকাল পূর্ণ করি অনন্ত গগন,

নিদ্রামগ্ন মহাদেব দেখিছেন মহান্‌ স্বপন্‌।

          বিশাল জগৎ এই

          প্রকাণ্ড স্বপন সেই,

হৃদয়সমুদ্রে তাঁর উঠিতেছে বিম্বের মতন।

উঠিতেছে চন্দ্র সূর্য, উঠিতেছে আলোক আঁধার,

উঠিতেছে লক্ষ লক্ষ নক্ষত্রের জ্যোতি-পরিবার।

উঠিতেছে, ছুটিতেছে গ্রহ উপগ্রহ দলে দলে,

উঠিতেছে ডুবিতেছে রাত্রি দিন, আকাশের তলে ।

একা বসি মহাসিন্ধু চিরদিন গাইতেছে গান,

ছুটিয়া সহস্র নদী পদতলে মিলাইছে প্রাণ।

তটিনীর কলরব, লক্ষ নির্ঝরের ঝর ঝর,

সিন্ধুর গম্ভীর গীত, মেঘের গম্ভীর কণ্ঠস্বর,

ঝটিকা করিছে হা হা আশ্রয়-আলয় তার ছাড়ি

বাজায়ে অরণ্যবীণা ভীমবল শত বাহু নাড়ি,

রুদ্র রাগ আলাপিয়া গড়ায়ে পড়িছে হিমরাশ

পর্বতদৈত্যের যেন ঘনীভূত ঘোর অট্টহাস,

ধীরে ধীরে মহারণ্য নাড়িতেছে জটাময় মাথা–

ঝর ঝর মর মর উঠিতেছে সুগম্ভীর গাথা।

চেতনার কোলাহলে দিবস পুরিছে দশ দিশি,

ঝিল্লিরবে একমন্ত্র জপিতেছে তাপসিনী নিশি,

সমস্ত একত্রে মিলি ধ্বনিয়া ধ্বনিয়া চারি ভিত

উঠাইছে মহা-হৃদে মহা এক স্বপনসংগীত।

স্বপনের রাজ্য এই স্বপন-রাজ্যের জীবগণ

দেহ ধরিতেছে কত মুহুর্মুহু নূতন নূতন।

ফুল হয়ে যায় ফল, ফুল ফল বীজ হয় শেষে,

নব নব বৃক্ষ হয়ে বেঁচে থাকে কানন-প্রদেশে।

বাষ্প হয়, মেঘ হয়, বিন্দু বিন্দু বৃষ্টিবারিধারা

নির্ঝর তটিনী হয়, ভাঙি ফেলে শিলাময় কারা।

নিদাঘ মরিয়া যায়, বরষা শ্মশানে আসি তার

নিবায় জলন্ত চিতা বরষিয়া অশ্রুবারিধার।

বরষা হইয়া বৃদ্ধ শ্বেতকেশ শীত হয়ে যায়,

যযাতির মতো পুন বসন্তযৌবন ফিরে পায়।

এক শুধু পুরাতন, আর সব নূতন নূতন

এক পুরাতন হৃদে উঠতেছে নূতন স্বপন।

অপূর্ণ স্বপনসৃষ্ট মানুষেরা অভাবের দাস,

জাগ্রত পূর্ণতা-তরে পাইতেছে কত না প্রয়াস।

চেতনা ছিঁড়িতে চাহে আধো-অচেতন আবরণ–

দিনরাত্রি এই আশা, এই তার একমাত্র পণ।

পূর্ণ আত্মা জাগিবেন, কভু কি আসিবে হেন দিন?

অপূর্ণ জগৎ-স্বপ্ন ধীরে ধীরে হইবে বিলীন?

চন্দ্র-সূর্য-তারকার অন্ধকার স্বপ্নময়ী ছায়া

জ্যোতির্ময় সে হৃদয়ে ধীরে ধীরে মিলাইবে কায়া।

পৃথিবী ভাঙিয়া যাবে, একে একে গ্রহতারাগণ

ভেঙে ভেঙে মিলে যাবে একেকটি বিস্বের মতন।

চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ চেয়ে জ্যোতির্ময় মহান্‌ বৃহৎ

জীব-আত্মা মিলাইবে একেকটি জলবিম্ববৎ।

কভু কি আসিবে, দেব, সেই মহাস্বপ্ন-ভাঙা দিন

সত্যের সমুদ্র-মাঝে আধো সত্য হয়ে যাবে লীন?

আধেক প্রলয়জলে ডুবে আছে তোমার হৃদয়–

বলো, দেব, কবে হেন প্রলয়ের হইবে প্রলয়।

 

Romanized Version
Purno kori mohakal purno kori ononto gogon,
Nidramogno mohadeb dekhichhen mohan swopon.
Bishal jogot ei
Prokando swopon shei,
Hridoyshomudre tnnar uthitechhe bimber moton.
Uthitechhe chondro shurjo, uthitechhe alok nnadhar,
Uthitechhe lokkho lokkho nokkhotrer jyoti-poribar.
Uthitechhe, chhutitechhe groho upogroho dole dole,
Uthitechhe dubitechhe ratri din, akasher tole .
Eka boshi mohashindhu chirodin gaitechhe gan,
Chhutiya shohoshro nodi podotole milaichhe pran.
Totinir kolorob, lokkho nirjhorer jhor jhor,
Shindhur gombhir git, megher gombhir konthoshwor,
Jhotika korichhe ha ha ashroy-aloy tar chhari
Bajaye oronyobina bhimobol shoto bahu nari,
Rudro rag alapiya goraye porichhe himorash
Porbotodoityer jeno ghonibhuto ghor ottohash,
Dhire dhire moharonnyo naritechhe jotamoy matha–
Jhor jhor mor mor uthitechhe shugombhir gatha.
Chetonar kolahole dibosh purichhe dosh dishi,
Jhillirobe ekmontro jopitechhe taposhini nishi,
Shomosto ekotre mili dhwoniya dhwoniya chari bhit
Uthaichhe moha-hride moha ek swoponshonggit.
Swoponer rajyo ei swopon-rajyer jibogon
Deho dhoritechhe koto muhurmuhu nuton nuton.
Phul hoye jay phol, phul phol bij hoy sheshe,
Nobo nobo brikkho hoye bneche thake kanon-prodeshe.
Bashpo hoy, megh hoy, bindu bindu brishtibaridhara
Nirjhor totini hoy, bhamngi phele shilamoy kara.
Nidagho moriya jay, borosha shmoshane ashi tar
Nibay jwolonto chita boroshiya oshrubaridhar.
Borosha hoiya briddho shwetokesh shit hoye jay,
Jojatir moto puno boshontojoubon phire pay.
Ek shudhu puraton, ar shob nuton nuton
Ek puraton hride uthitechhe nuton swopon.
Opurno swoponoshrishto manushera obhaber dash,
Jagroto purnota-tore paitechhe koto na proyash.
Chetona chhnirite chahe adho-ocheton aboron–
Dinoratri ei asha, ei tar ekmatro pon.
Purno atma jagiben, kobhu ki ashibe heno din?
Opurno jogot-swopno dhire dhire hoibe bilin?
Chondro-shurjo-tarokar ondhokar swopnomoyi chhaya
Jyotirmoy she hridoye dhire dhire milaibe kaya.
Prithibi bhangiya jabe, eke eke grohotaragon
Bhenge bhenge mile jabe ekekti bimber moton.
Chondro-shurjo-groho cheye jyotirmoy mohan brihot
Jib-atma milaibe ekekti jolobimbobot.
Kobhu ki ashibe, deb, shei mohaswopno-bhanga din
Shotyer shomudro-majhe adho shotyo hoye jabe lin?
Adhek proloyojole dube achhe tomar hridoy–
Bolo, deb, kobe heno proloyer hoibe proloy.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • সৃষ্টিতত্ত্ব ও মহাজাগতিক স্বপ্ন:
    “পূর্ণ করি মহাকাল পূর্ণ করি অনন্ত গগন, / নিদ্রামগ্ন মহাদেব দেখিছেন মহান্‌ স্বপন্‌‌।”
    — অনন্ত আকাশ ও কাল জুড়ে এই যে বিশাল পৃথিবী ও মহাবিশ্ব, তা আর কিছুই নয়—নিদ্রামগ্ন মহাদেবের (বা ঈশ্বরের) এক প্রকাণ্ড স্বপ্ন। সেই পরম সত্তার হৃদয়সমুদ্রে চন্দ্র, সূর্য, লক্ষ লক্ষ নক্ষত্র, গ্রহ-উপগ্রহ এবং দিন-রাত্রি যেন বুদবুদ বা জলবিম্বের মতো উঠছে আর মিলিয়ে যাচ্ছে।
  • প্রকৃতির চিরন্তন রূপান্তর:
    “ফুল হয়ে যায় ফল… নিদাঘ মরিয়া যায়, বরষা শ্মশানে আসি তার / নিবায় জলন্ত চিতা… যযাতির মতো পুন বসন্তযৌবন ফিরে পায়।”
    — মহাদেবের এই স্বপ্নের জগতে প্রাণের রূপান্তর প্রতিনিয়ত ঘটছে। ফুল ফল হচ্ছে, মেঘ বৃষ্টি হচ্ছে, গ্রীষ্মের দাবদাহকে বর্ষা এসে শান্ত করছে। আবার শীতের বার্ধক্য যেন পৌরাণিক চরিত্র যযাতির মতো বসন্তের আগমনে পুনরায় তার যৌবন ফিরে পাচ্ছে। এই সবকিছুই এক আদি ও অকৃত্রিম পরম সত্তার বুকে জেগে ওঠা নিত্যনতুন স্বপ্ন।
  • অপূর্ণতা থেকে পরম সত্যের আকাঙ্ক্ষা:
    “অপূর্ণ স্বপনসৃষ্ট মানুষেরা অভাবের দাস… পূর্ণ আত্মা জাগিবেন, কভু কি আসিবে হেন দিন?”
    — মানুষের জাগতিক জীবন এই স্বপ্নেরই অংশ, তাই তা অপূর্ণ এবং সর্বদা অভাবের তাড়নায় ধাবমান। মানুষ তার চেতনার আবরণ ছিন্ন করে পূর্ণতার কাছে পৌঁছাতে চায়। কবিতার শেষে কবি মহাদেবের কাছে প্রশ্ন রেখেছেন, কবে এই বিশাল জগত-স্বপ্ন বিলীন হয়ে যাবে? কবে মানুষের আধো-সত্য বা মায়া পরম সত্যের জ্যোতির্ময় সমুদ্রে লীন হবে এবং এই মহাপ্রলয়েরও চূড়ান্ত প্রলয় ঘটবে?
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (প্রভাত সংগীত কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও আপনার দেওয়া পূর্বনির্ধারিত বিন্যাস অনুযায়ী উপস্থাপিত হয়েছে। (বি.দ্র. পাঠের সাবলীলতা ও প্রামাণ্য রূপ বজায় রাখতে আপনার প্রদত্ত শিরোনাম ও টেক্সটের ভেতরের ইংরেজি অংশ এবং ‘বিস্বের’ বানানটি সংশোধন করে প্রামাণ্য ‘বিম্বের’ রূপটি তুলে ধরা হয়েছে)।

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত