বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রভাত সংগীত’ (১৮৮৩) কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত গভীর, দার্শনিক ও মহাজাগতিক চেতনার কবিতা হলো ‘মহাস্বপ্ন’। এই কবিতায় সমগ্র সৃষ্টিজগতকে ধ্যানমগ্ন মহাদেবের একটি বিশাল স্বপ্ন হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে এবং সেই মহাস্বপ্ন ভেঙে কবে পরম সত্যের জাগরণ ঘটবে, সেই মহাজাগতিক প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | মহাস্বপ্ন |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | প্রভাত সংগীত |
| প্রকাশের বছর | ১৮৮৩ (১২৯০ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | দার্শনিক ও মহাজাগতিক কবিতা (Philosophical and Cosmic Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
মহাস্বপ্ন – সম্পূর্ণ কবিতা
পূর্ণ করি মহাকাল পূর্ণ করি অনন্ত গগন,
নিদ্রামগ্ন মহাদেব দেখিছেন মহান্ স্বপন্।
বিশাল জগৎ এই
প্রকাণ্ড স্বপন সেই,
হৃদয়সমুদ্রে তাঁর উঠিতেছে বিম্বের মতন।
উঠিতেছে চন্দ্র সূর্য, উঠিতেছে আলোক আঁধার,
উঠিতেছে লক্ষ লক্ষ নক্ষত্রের জ্যোতি-পরিবার।
উঠিতেছে, ছুটিতেছে গ্রহ উপগ্রহ দলে দলে,
উঠিতেছে ডুবিতেছে রাত্রি দিন, আকাশের তলে ।
একা বসি মহাসিন্ধু চিরদিন গাইতেছে গান,
ছুটিয়া সহস্র নদী পদতলে মিলাইছে প্রাণ।
তটিনীর কলরব, লক্ষ নির্ঝরের ঝর ঝর,
সিন্ধুর গম্ভীর গীত, মেঘের গম্ভীর কণ্ঠস্বর,
ঝটিকা করিছে হা হা আশ্রয়-আলয় তার ছাড়ি
বাজায়ে অরণ্যবীণা ভীমবল শত বাহু নাড়ি,
রুদ্র রাগ আলাপিয়া গড়ায়ে পড়িছে হিমরাশ
পর্বতদৈত্যের যেন ঘনীভূত ঘোর অট্টহাস,
ধীরে ধীরে মহারণ্য নাড়িতেছে জটাময় মাথা–
ঝর ঝর মর মর উঠিতেছে সুগম্ভীর গাথা।
চেতনার কোলাহলে দিবস পুরিছে দশ দিশি,
ঝিল্লিরবে একমন্ত্র জপিতেছে তাপসিনী নিশি,
সমস্ত একত্রে মিলি ধ্বনিয়া ধ্বনিয়া চারি ভিত
উঠাইছে মহা-হৃদে মহা এক স্বপনসংগীত।
স্বপনের রাজ্য এই স্বপন-রাজ্যের জীবগণ
দেহ ধরিতেছে কত মুহুর্মুহু নূতন নূতন।
ফুল হয়ে যায় ফল, ফুল ফল বীজ হয় শেষে,
নব নব বৃক্ষ হয়ে বেঁচে থাকে কানন-প্রদেশে।
বাষ্প হয়, মেঘ হয়, বিন্দু বিন্দু বৃষ্টিবারিধারা
নির্ঝর তটিনী হয়, ভাঙি ফেলে শিলাময় কারা।
নিদাঘ মরিয়া যায়, বরষা শ্মশানে আসি তার
নিবায় জলন্ত চিতা বরষিয়া অশ্রুবারিধার।
বরষা হইয়া বৃদ্ধ শ্বেতকেশ শীত হয়ে যায়,
যযাতির মতো পুন বসন্তযৌবন ফিরে পায়।
এক শুধু পুরাতন, আর সব নূতন নূতন
এক পুরাতন হৃদে উঠতেছে নূতন স্বপন।
অপূর্ণ স্বপনসৃষ্ট মানুষেরা অভাবের দাস,
জাগ্রত পূর্ণতা-তরে পাইতেছে কত না প্রয়াস।
চেতনা ছিঁড়িতে চাহে আধো-অচেতন আবরণ–
দিনরাত্রি এই আশা, এই তার একমাত্র পণ।
পূর্ণ আত্মা জাগিবেন, কভু কি আসিবে হেন দিন?
অপূর্ণ জগৎ-স্বপ্ন ধীরে ধীরে হইবে বিলীন?
চন্দ্র-সূর্য-তারকার অন্ধকার স্বপ্নময়ী ছায়া
জ্যোতির্ময় সে হৃদয়ে ধীরে ধীরে মিলাইবে কায়া।
পৃথিবী ভাঙিয়া যাবে, একে একে গ্রহতারাগণ
ভেঙে ভেঙে মিলে যাবে একেকটি বিস্বের মতন।
চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ চেয়ে জ্যোতির্ময় মহান্ বৃহৎ
জীব-আত্মা মিলাইবে একেকটি জলবিম্ববৎ।
কভু কি আসিবে, দেব, সেই মহাস্বপ্ন-ভাঙা দিন
সত্যের সমুদ্র-মাঝে আধো সত্য হয়ে যাবে লীন?
আধেক প্রলয়জলে ডুবে আছে তোমার হৃদয়–
বলো, দেব, কবে হেন প্রলয়ের হইবে প্রলয়।
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- সৃষ্টিতত্ত্ব ও মহাজাগতিক স্বপ্ন:“পূর্ণ করি মহাকাল পূর্ণ করি অনন্ত গগন, / নিদ্রামগ্ন মহাদেব দেখিছেন মহান্ স্বপন্।”— অনন্ত আকাশ ও কাল জুড়ে এই যে বিশাল পৃথিবী ও মহাবিশ্ব, তা আর কিছুই নয়—নিদ্রামগ্ন মহাদেবের (বা ঈশ্বরের) এক প্রকাণ্ড স্বপ্ন। সেই পরম সত্তার হৃদয়সমুদ্রে চন্দ্র, সূর্য, লক্ষ লক্ষ নক্ষত্র, গ্রহ-উপগ্রহ এবং দিন-রাত্রি যেন বুদবুদ বা জলবিম্বের মতো উঠছে আর মিলিয়ে যাচ্ছে।
- প্রকৃতির চিরন্তন রূপান্তর:“ফুল হয়ে যায় ফল… নিদাঘ মরিয়া যায়, বরষা শ্মশানে আসি তার / নিবায় জলন্ত চিতা… যযাতির মতো পুন বসন্তযৌবন ফিরে পায়।”— মহাদেবের এই স্বপ্নের জগতে প্রাণের রূপান্তর প্রতিনিয়ত ঘটছে। ফুল ফল হচ্ছে, মেঘ বৃষ্টি হচ্ছে, গ্রীষ্মের দাবদাহকে বর্ষা এসে শান্ত করছে। আবার শীতের বার্ধক্য যেন পৌরাণিক চরিত্র যযাতির মতো বসন্তের আগমনে পুনরায় তার যৌবন ফিরে পাচ্ছে। এই সবকিছুই এক আদি ও অকৃত্রিম পরম সত্তার বুকে জেগে ওঠা নিত্যনতুন স্বপ্ন।
- অপূর্ণতা থেকে পরম সত্যের আকাঙ্ক্ষা:“অপূর্ণ স্বপনসৃষ্ট মানুষেরা অভাবের দাস… পূর্ণ আত্মা জাগিবেন, কভু কি আসিবে হেন দিন?”— মানুষের জাগতিক জীবন এই স্বপ্নেরই অংশ, তাই তা অপূর্ণ এবং সর্বদা অভাবের তাড়নায় ধাবমান। মানুষ তার চেতনার আবরণ ছিন্ন করে পূর্ণতার কাছে পৌঁছাতে চায়। কবিতার শেষে কবি মহাদেবের কাছে প্রশ্ন রেখেছেন, কবে এই বিশাল জগত-স্বপ্ন বিলীন হয়ে যাবে? কবে মানুষের আধো-সত্য বা মায়া পরম সত্যের জ্যোতির্ময় সমুদ্রে লীন হবে এবং এই মহাপ্রলয়েরও চূড়ান্ত প্রলয় ঘটবে?

![প্রভাত সংগীত কাব্যগ্রন্থের অনন্ত মরণ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনন্ত মরণ ananta maran [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/অনন্ত-মরণ-ananta-maran-কবিতা--1024x536.gif)


![প্রভাত সংগীত কাব্যগ্রন্থের ‘মহাস্বপ্ন’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1 মহাস্বপ্ন mahaaswapna [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/মহাস্বপ্ন-mahaaswapna-কবিতা--1024x536.gif)

![প্রতিধ্বনি pratidwani [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 2 প্রতিধ্বনি pratidwani [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/প্রতিধ্বনি-pratidwani-কবিতা--1024x536.gif)
![সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় srishhti sthiti pralay [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 3 সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় srishhti sthiti pralay [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়-srishhti-sthiti-pralay-কবিতা--1024x536.gif)

![আকন্দ akondo [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আকন্দ akondo [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/আকন্দ-akondo-কবিতা--1024x536.gif)
![অসম্ভব কথা osombhob kotha [ ছোটগল্প,গল্পগুচ্ছ ] – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অসম্ভব কথা osombhob kotha [ ছোটগল্প,গল্পগুচ্ছ ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/অসম্ভব-কথা-1024x536.gif)
![বিচ্ছেদ bichchhed [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিচ্ছেদ bichchhed [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/বিচ্ছেদ-bichchhed-কবিতা--1024x536.gif)