ফুল বলে গান । পূজা পর্ব ১৬ | Ful bole

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গীতবিতান’-এর পূজা পর্যায়ের (গান নং ১৬) এক অপূর্ব ভক্তিগীতি ও আত্মনিবেদনের গান “ফুল বলে ধন্য আমি”। ১৩৪০ বঙ্গাব্দে (১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দ) রচিত এই গানটি রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত নৃত্যনাট্য ‘চণ্ডালিকা’-রও অন্যতম কেন্দ্রীয় সংগীত। পার্থিব ধূলির মধ্য থেকে জন্ম নিয়েও কীভাবে আত্মশুদ্ধি, বিনম্র সেবা ও সমর্পণের মাধ্যমে একটি ক্ষুদ্র সত্তা পরমেশ্বরের স্পর্শে স্বর্গীয় রূপ পরিগ্রহ করতে পারে—গানটিতে সেই চিরন্তন মানবীয় ও আধ্যাত্মিক সত্যটি একটি ফুটন্ত ফুলের রূপকে প্রকাশ পেয়েছে।

গানের বিস্তারিত তথ্য

তথ্যবিবরণবিস্তারিত তথ্য
গানের নামফুল বলে (ফুল বলে, ধন্য আমি)
গীতিকার ও সুরকাররবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পর্যায় / নৃত্যনাট্যপূজা (গান নং ১৬) / চণ্ডালিকা
মূল উপজীব্যধূলির সন্তানের আত্মোৎসর্গ, অন্তরের পবিত্রতা ও সমর্পণ
রাগইমনকল্যাণ
তালকাহারবা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ)১৩৪০
রচনাকাল (খ্রিস্টাব্দ)১৯৩৩
গ্রন্থ / সংকলনগীতবিতান, চণ্ডালিকা, স্বরবিতান

ফুল বলে (বাংলা লিরিক):

ফুল বলে, ধন্য আমি

ধন্য আমি মাটির ‘পরে।

দেবতা ওগো, তোমার সেবা

আমার ঘরে।

জন্ম নিয়েছি ধূলিতে,

দয়া করে দাও ভুলিতে,

নাই ধূলি মোর অন্তরে।

নয়ন তোমার নত করো,

দলগুলি কাঁপে থরোথরো।

চরণপরশ দিয়ো দিয়ো,

ধূলির ধনকে করো স্বর্গীয়,

ধরার প্রণাম আমি তোমার তরে॥

Ful Bole (Romanized Lyric)

Phul bole, dhonno ami

Dhonno ami matir ‘pore.

Debota ogo, tomar sheba

Amar ghore.

Jonmo niyechhi dhulite,

Doya kore dao bhulite,

Nai dhuli mor ontore.

Noyon tomar noto koro,

Dolguli kampe thorothoro.

Choronporosh diyo diyo,

Dhulir dhonke koro sworgiyo,

Dhorar pronam ami tomar tore॥

গানের মূল ভাব

“ফুল বলে” গানটির মূল নির্যাস হলো বিনম্র আত্মনিবেদন এবং হীনম্মন্যতা অতিক্রম করে আত্মিক শুচিতার সন্ধান। ধূলিধূসর মাটিতে জন্ম নেওয়া সত্ত্বেও ফুল নিজেকে ধন্য মনে করে, কারণ তার কুটিরেই স্বয়ং দেবতার সেবার সুযোগ এসেছে। ফুলটি স্বীকার করে যে তার বাহ্যিক অস্তিত্ব মাটির সঙ্গে জড়িত, কিন্তু তার হৃদয়ে কোনো মলিনতা বা ধূলি নেই।
গানটিতে বাহ্যিক জন্মপরিচয়ের চেয়ে অন্তরের ভালোবাসার মর্যাদাকে বড় করে দেখানো হয়েছে। দেবতার একটিমাত্র কৃপাদৃষ্টি ও চরণস্পর্শে পার্থিব ক্ষুদ্রতা কীভাবে পরম পবিত্রতায় রূপান্তরিত হয়, গানটির প্রতিটি পঙ্ক্তিতে সেই আকুল ভক্তির রূপ ফুটে উঠেছে। এটি কেবল একটি ফুলের প্রার্থনা নয়, বরং সমগ্র পৃথিবীর পক্ষ থেকে চিরন্তন পরমাত্মার চরণে এক অনুপম শ্রদ্ধার্ঘ্য।

চরণ ও স্তবক বিশ্লেষণ

১. ধূলির মাঝে সেবার সৌভাগ্য

  • “ফুল বলে, ধন্য আমি / ধন্য আমি মাটির ‘পরে। / দেবতা ওগো, তোমার সেবা / আমার ঘরে॥”
    ফুল মাটির বুকে ফুটে নিজেকে তুচ্ছ না ভেবে ধন্য মনে করছে। কারণ দেবতাকে নিজের ঘরে সেবা করার দুর্লভ সৌভাগ্য সে পেয়েছে। ঈশ্বরের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার এই আনন্দ পার্থিব সমস্ত সীমাবদ্ধতাকে ম্লান করে দেয়।

২. বাহ্যিক পরিচয় বনাম অন্তরের শুদ্ধতা

  • “জন্ম নিয়েছি ধূলিতে, / দয়া করে দাও ভুলিতে, / নাই ধূলি মোর অন্তরে॥”
    উৎস বা জন্মপরিচয় যাই হোক না কেন, অন্তরের শুদ্ধতাই মানুষের আসল পরিচয়। ফুল দেবতার কাছে করজোড়ে মিনতি করছে তার বাহ্যিক ধূলির পরিচয়টি ভুলে যাওয়ার জন্য, কেননা তার অন্তরের সুবাস ও পাপড়িতে কোনো অপবিত্রতা বা অহংকার নেই।

৩. কৃপাপ্রাপ্তি ও স্বর্গীয় রূপান্তর

  • “চরণপরশ দিয়ো দিয়ো, / ধূলির ধনকে করো স্বর্গীয়, / ধরার প্রণাম আমি তোমার তরে॥”
    ঈশ্বরের চরণের মধুর স্পর্শে মাটির ফুলও স্বর্গীয় সম্পদে পরিণত হতে পারে। ফুলটি নিজেকে সমগ্র ধরণীর প্রতিনিধি বা ‘প্রণাম’ হিসেবে বিবেচনা করে দেবতার চরণে সম্পূর্ণ বিলীন করে দিতে চেয়েছে।

গানের সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

  • প্রতীকধর্মিতা: ফুল এখানে সমাজের তথাকথিত অবহেলিত, অন্ত্যজ বা ক্ষুদ্র মানুষের প্রতীক। ‘চণ্ডালিকা’ নাটকের মূল সুরের মতোই—বাহ্যিক জন্ম নয়, আত্মিক পবিত্রতাই পরমকে পাওয়ার একমাত্র পথ।
  • কাব্যিক অলংকার ও চিত্রকল্প: ‘দলগুলি কাঁপে থরোথরো’—চরণটিতে ভক্তি ও আনন্দের প্রাবল্যে অন্তরের কাঁপুনির এক জীবন্ত দৃশ্যকল্প তৈরি হয়েছে।
  • বৈপরীত্যের মিলন: ‘ধূলি’ এবং ‘স্বর্গীয়’—এই দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত ভাবকে ভক্ত ও ভগবানের প্রেমবন্ধনে একাকার করে দেওয়া হয়েছে।

সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য

  • রাগ ইমনকল্যাণ: কল্যাণ ঠাটের অন্তর্ভুক্ত রাগ ইমনকল্যাণ স্বভাবগতভাবেই শান্ত, গভীর ও ভক্তিমূলক। দেবতার প্রতি এই আকুল প্রার্থনা নিবেদনে ইমনকল্যাণের স্বরবিন্যাস গানটিকে অনন্য আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য দান করেছে।
  • তাল কাহারবা: ৪/৪ মাত্রার চলনে কাহারবা তালের প্রবহমান লয় গানের চরণের মিষ্টি দোলা ও বিনম্র আবেদনকে সুরের মাধ্যমে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।

রচনাপ্রেক্ষিত ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব

১৩৪০ বঙ্গাব্দে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বৌদ্ধ জাতকের উপাখ্যান অবলম্বনে ‘চণ্ডালিকা’ নৃত্যনাট্যটি রচনা করেন। আনন্দ এবং প্রকৃতির আধ্যাত্মিক পুনর্জন্মের যে মূল সুর, এই গানটি তারই অন্যতম প্রধান ভিত্তি। সামাজিকভাবে অবহেলিত সত্তার অন্তরের শুদ্ধতা প্রতিষ্ঠা এবং আত্মোৎসর্গের মহৎ বার্তার কারণে রবীন্দ্রসংগীতের পূজা ও নাট্যগীতি উভয় ধারায় গানটি অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত।

উৎস ও তথ্যসূত্র

  • গীতবিতান (পূজা পর্যায়, গান নং ১৬), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী প্রকাশন বিভাগ।
  • চণ্ডালিকা (নৃত্যনাট্য), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৩৪০ বঙ্গাব্দ / ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দ)।
  • স্বরবিতান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী প্রকাশনা পর্ষদ।
  • Tagoreweb Digital Archive, প্রামাণ্য রবীন্দ্রসংগীত তথ্যভাণ্ডার।

মন্তব্য করুন