বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘উৎসর্গ’ (১৯১৪) কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর আত্মবিশ্লেষণমূলক, দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক কবিতা হলো ‘রোগীর শিয়রে রাত্রে একা ছিনু জাগি’। এই কবিতায় রুগ্ণ শয্যার পাশের একঘেয়ে উদ্বেগ ও ক্লান্তির মুহূর্ত থেকে ক্ষণিকের জন্য খোলা আকাশের নিচে বেরিয়ে এসে কবির অনন্ত বিশ্বপ্রকৃতি ও পরম সত্তার সাথে একাত্ম হওয়ার এক অপরূপ দার্শনিক স্তুতি ফুটে উঠেছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | রোগীর শিয়রে রাত্রে একা ছিনু জাগি |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | উৎসর্গ |
| প্রকাশের বছর | ১৯১৪ (১৩২১ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | আত্মবিশ্লেষণমূলক, আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক গীতি-কবিতা (Introspective, Spiritual and Philosophical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
রোগীর শিয়রে রাত্রে একা ছিনু জাগি – সম্পূর্ণ কবিতা
রোগীর শিয়রে রাত্রে একা ছি-নু জাগি
বাহিরে দাঁড়ানু এসে ক্ষণেকের লাগি।
শান্ত মৌন নগরীর সুপ্ত হর্ম্য-শিরে
হেরিনু জ্বলিছে তারা নিস্তব্ধ তিমিরে।
ভূত ভাবী বর্তমান একটি পলকে
মিলিল বিষাদস্নিগ্ধ আনন্দপুলকে
আমার অন্তরতলে; অনির্বচনীয়
সে মুহূর্তে জীবনের যত-কিছু প্রিয়,
দুর্লভ বেদনা যত, যত গত সুখ,
অনুদ্গত অশ্রুবাষ্প, গীত মৌনমূক
আমার হৃদয়পাত্রে হয়ে রাশি রাশি
কী অনলে উজ্জ্বলিল। সৌরভে নিশ্বাসি
অপরূপ ধূপধূম উঠিল সুধীরে
তোমার নক্ষত্রদীপ্ত নিঃশব্দ মন্দিরে।

Romanized Version
Tomar nokkhotrodipto nishobdo mondire.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- ক্লান্তি থেকে মহাজাগতিক উপলব্ধি:
“রোগীর শিয়রে রাত্রে একা ছিনু জাগি / বাহিরে দাঁড়ানু এসে ক্ষণেকের লাগি। / শান্ত মৌন নগরীর সুপ্ত হর্ম্য-শিরে / হেরিনু জ্বলিছে তারা নিস্তব্ধ তিমিরে।”— রোগীকক্ষে রাত জাগার উদ্বেগ ও আবদ্ধ পরিবেশ থেকে কবি যখন ক্ষণিকের জন্য বাইরে আসেন, তখন তাঁর চোখের সামনে এক বিশাল, স্তব্ধ ও শান্ত পটভূমি উন্মোচিত হয়। ঘুমন্ত শহরের অট্টালিকার (হর্ম্য) চূড়ার ওপর নিস্তব্ধ অন্ধকারে তারার আলো কবির মনকে জাগতিক ক্ষুদ্রতা থেকে মহাজাগতিক অসীমতার দিকে নিয়ে যায়।
- সময়ের বিলুপ্তি ও বিষাদস্নিগ্ধ আনন্দ:
“ভূত ভাবী বর্তমান একটি পলকে / মিলিল বিষাদস্নিগ্ধ আনন্দপুলকে / আমার অন্তরতলে; অনির্বচনীয়”— অসীম তারার দিকে তাকিয়ে কবির মনে হয়, অনন্ত কালের কাছে মানুষের অতীত (ভূত), বর্তমান ও ভবিষ্যৎ যেন পলকের মধ্যে এক হয়ে গেছে। তাঁর হৃদয়ে এক অনির্বচনীয় বা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না এমন অনুভূতির জন্ম হয়, যা একই সাথে বিষাদের মতো স্নিগ্ধ আবার আনন্দের মতো রোমাঞ্চকর (পুলক)।
- জীবনের সব অভিজ্ঞতার ঐশ্বরিক সমর্পণ:
“সে মুহূর্তে জীবনের যত-কিছু প্রিয়… অনুদ্গত অশ্রুবাষ্প, গীত মৌনমূক / আমার হৃদয়পাত্রে হয়ে রাশি রাশি / কী অনলে উজ্জ্বলিল। সৌরভে নিশ্বাসি / অপরূপ ধূপধূম উঠিল সুধীরে / তোমার নক্ষত্রদীপ্ত নিঃশব্দ মন্দিরে।”— সেই শান্ত মুহূর্তে কবির মনে পড়ে যায় জীবনের যত প্রিয় স্মৃতি, যত বিরল বেদনা, ফেলে আসা সুখ, না-ঝরা চোখের জল এবং না-গাওয়া নীরব গানগুলোর কথা। এসব অনুভূতি কবির হৃদয়-পাত্রে এক পবিত্র আগুনে জ্বলতে শুরু করে। আর সেই অনুভূতির অপরূপ সুগন্ধি ধূপের ধোঁয়া ধীরে ধীরে মহাকাশের দিকে, অর্থাৎ ঈশ্বরের নক্ষত্রখচিত ও নিঃশব্দ মন্দিরের দিকে চিরস্থায়ী নৈবেদ্য হিসেবে উঠে যায়।
