বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘উৎসর্গ’ (১৯১৪) কাব্যগ্রন্থের একটি অসাধারণ নারী-বন্দনামূলক কবিতা হলো ‘যদি ইচ্ছা কর তবে কটাক্ষে হে নারী’। এই কবিতায় চিরায়ত বাঙালি তথা ভারতীয় নারীর নিরহংকার স্বভাব, সংসারের প্রতি নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ এবং নিজের অসীম ক্ষমতা সম্পর্কে তাদের উদাসীনতাকে এক পরম শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে তুলে ধরা হয়েছে। নারীর প্রকৃত মহিমা তার বাহ্যিক রূপ বা বিশ্বজয়ের ক্ষমতায় নয়, বরং আপন সংসারের ধুলোমাটি পরিষ্কার করার বিনম্র সেবার মাঝেই নিহিত—এটাই এই কবিতার মূল সুর।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | যদি ইচ্ছা কর তবে কটাক্ষে হে নারী |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | উৎসর্গ |
| প্রকাশের বছর | ১৯১৪ (১৩২১ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | নারী-বন্দনা ও প্রেমমূলক গীতি-কবিতা (Ode to Womanhood and Romantic Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
যদি ইচ্ছা কর তবে কটাক্ষে হে নারী – সম্পূর্ণ কবিতা
যদি ইচ্ছা কর তবে কটা-ক্ষে হে নারী,
কবির বিচিত্র গান নিতে পার কাড়ি
আপন চরণপ্রান্তে; তুমি মুগ্ধচিতে
মগ্ন আছ আপনার গৃহের সংগীতে।
স্তবে তব নাহি কান, তাই স্তব করি,
তাই আমি ভক্ত তব, অনিন্দ্যসুন্দরী।
ভুবন তোমারে পূজে, জেনেও জান না;
ভক্তদাসীসম তুমি কর আরাধনা
খ্যাতিহীন প্রিয়জনে। রাজমহিমারে
যে করপরশে তব পার’ করিবারে
দ্বিগুণ মহিমান্বিত, সে সুন্দর করে
ধূলি ঝাঁট দাও তুমি আপনার ঘরে।
সেই তো মহিমা তব, সেই তো গরিমা–
সকল মাধুর্য চেয়ে তারি মধুরিমা।

Romanized Version
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- নারীর প্রচ্ছন্ন ক্ষমতা ও গৃহের প্রতি মমতা:
“যদি ইচ্ছা কর তবে কটাক্ষে হে নারী, / কবির বিচিত্র গান নিতে পার কাড়ি / আপন চরণপ্রান্তে; তুমি মুগ্ধচিতে / মগ্ন আছ আপনার গৃহের সংগীতে।”— কবি বলছেন, নারী চাইলে তার সামান্য একটু কটাক্ষ বা ভ্রুকুটি দিয়ে শ্রেষ্ঠ কবিদের সমস্ত সৃষ্টিকে নিজের পায়ের কাছে এনে লুটিয়ে দিতে পারে। কিন্তু নারী তার এই সম্মোহনী ক্ষমতার কোনো পরোয়া না করে, অত্যন্ত মুগ্ধচিত্তে নিজের সাধারণ সংসারের কাজে বা ‘গৃহের সংগীতে’ মগ্ন থাকতে ভালোবাসে।
- স্তুতির প্রতি উদাসীনতা ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা:
“স্তবে তব নাহি কান, তাই স্তব করি, … ভুবন তোমারে পূজে, জেনেও জান না; / ভক্তদাসীসম তুমি কর আরাধনা / খ্যাতিহীন প্রিয়জনে।”— পৃথিবীর সমস্ত স্তুতি বা প্রশংসার প্রতি নারীর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। আর সে প্রশংসার কাঙাল নয় বলেই কবি তার এত বড় ভক্ত। সারা বিশ্ব তাকে পূজা করলেও সে তা জানে না, বরং সে নিজেই একজন সাধারণ দাসীর মতো তার খ্যাতিহীন, সাধারণ পরিজনদের ভালোবেসে আরাধনা করে।
- বিনম্র সেবার মাঝেই প্রকৃত গরিমা:
“রাজমহিমারে / যে করপরশে তব পার’ করিবারে / দ্বিগুণ মহিমান্বিত, সে সুন্দর করে / ধূলি ঝাঁট দাও তুমি আপনার ঘরে। / সেই তো মহিমা তব, সেই তো গরিমা–“— নারীর যে সুন্দর হাতের ছোঁয়ায় রাজাদের রাজত্ব আরও বেশি মহিমান্বিত হতে পারত, নারী সেই সুন্দর হাত দিয়েই পরম মমতায় নিজের ঘরের ধুলো ঝাঁট দেয়। পৃথিবীর কোনো সিংহাসনের চেয়ে সংসারের এই ধুলোমাটি পরিষ্কার করাতেই নারীর যে আনন্দ, সেটিই তার জীবনের শ্রেষ্ঠ গরিমা এবং জগতের সকল মাধুর্যের চেয়ে মধুরতম।


![মু-ক্তি mukti [ কবিতা ] – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মু-ক্তি mukti [ কবিতা ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/মু-ক্তি-mukti-কবিতা--1024x536.gif)


