আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল , প্রকৃতি পর্যায়, ৫৭ | রবীন্দ্রসঙ্গীত

Table of Content

বর্ষার রূপময় আগমন এবং প্রকৃতির সাথে মানবহৃদয়ের সৃষ্টিশীল আদান-প্রদানের এক অপূর্ব নান্দনিক প্রকাশ “বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল”। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রকৃতি পর্যায়ের (বর্ষা উপ-পর্যায়) এই গানটিতে প্রকৃতির নশ্বর উপহারের বিপরীতে শিল্পীর অবিনাশী সৃষ্টির প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছে। বর্ষার সূচনায় উপহার হিসেবে পাওয়া প্রথম কদম ফুলের বিনিময়ে কবি তাঁর অন্তরের সুরের সাধনায় লালিত ‘শ্রাবণের গান’ উপহার দিচ্ছেন। কদম ফুলের স্থায়িত্ব ক্ষণস্থায়ী হলেও সুর ও বাণীর মাধ্যমে সেই সম্মান যে মহাকালের বিস্মৃতির প্লাবন পেরিয়ে যুগে যুগে ফিরে আসবে—গানটি সেই শাশ্বত শিল্পচেতনার এক অনুপম দলিল।

গানের বিস্তারিত তথ্য

তথ্যবিবরণবিস্তারিত তথ্য
শিরোনামবাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল
পর্যায়প্রকৃতি পর্যায় (গান সংখ্যা: ৫৭)
উপ-পর্যায়বর্ষা
রাগমল্লার
তালদাদরা (ছয় মাত্রা: ৩+৩, আবর্তন: ২)
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ)১৪ শ্রাবণ, ১৩৪৬ বঙ্গাব্দ
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ)৩০ জুলাই, ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দ
রচনাস্থানশান্তিনিকেতন
স্বরলিপিকারশৈলজারঞ্জন মজুমদার
আকর গ্রন্থগীতবিতান (প্রকৃতি পর্যায়) ও স্বরবিতান
মূল উপজীব্যবর্ষার উপহার, প্রকৃতির নশ্বরতা বনাম সৃষ্টির অমরত্ব, কদম ফুল ও সুরের বিনিময়

বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান

বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান,
আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান॥

মেঘের ছায়ায় অন্ধকারে রেখেছি ঢেকে তারে
এই-যে আমার সুরের ক্ষেতের প্রথম সোনার ধান॥

আজ এনে দিলে, হয়তো দিবে না কাল–
রিক্ত হবে যে তোমার ফুলের ডাল।
এ গান আমার শ্রাবণে শ্রাবণে তব বিস্মৃতিস্রোতের প্লাবনে
ফিরিয়া ফিরিয়া আসিবে তরণী বহি তব সম্মান॥

 

Badal-Diner Prothom Kodom Phul Korechho Dan

Badal-diner prothom kodom phul korechho dan,

Ami dite eshechhi Shraboner gan॥

Megher chhayay andhokare rekhechhi dheke tare

Ei-je amar surer kheter prothom sonar dhan॥

Aj ene dile, hoyto dibe na kal—

Rikto hobe je tomar phuler dal।

E gan amar Shrabone Shrabone tobo bismritisroter plabone

Firiya firiya asibe toroni bahi tobo somman॥

 

গানের মূল ভাব

“বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল” গানটির মূল ভিত্তি হলো প্রেমাস্পদ বা প্রকৃতির সাথে শিল্পীর আত্মিক উপহারের বিনিময় এবং পার্থিব নশ্বরতার বিপরীতে শিল্পের অবিনাশী শক্তিকে উপলব্ধি করা। বর্ষার সূচনালগ্নে নিবেদিত সদ্য প্রস্ফুটিত কদম ফুল ঋতুকালীন সৌন্দর্যের এক পরম উপহার। কিন্তু ফুল রক্ত-মাংসের মতোই ক্ষণস্থায়ী—ঋতু পেরোলেই গাছের শাখা রিক্ত ও পুষ্পহীন হয়ে পড়ে।

কবি সেই ক্ষণভঙ্গুর উপহারের প্রতিদানে নিবেদন করেছেন তাঁর চিরন্তন ‘শ্রাবণের গান’। কবি নিজের সুরসাধনাকে তুলনা করেছেন কৃষকের সোনালি ধানের সাথে, যা তিনি মেঘের ছায়ায় অন্তরের নিভৃত অন্ধকারে পরম মমতায় ফলিয়ে তুলেছেন। পার্থিব ফুল ঝরে গেলেও এই সুরের তরণী কালের বিস্মৃতিস্রোত অতিক্রম করে প্রতি বর্ষায় ফিরে আসবে এবং সেই ভালোবাসার সম্মানকে অনন্তকালের জন্য অক্ষয় করে রাখবে।

চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ

১. উপহারের বিনিময় ও সুরের সোনার ধান

  • “বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান, আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান / মেঘের ছায়ায় অন্ধকারে রেখেছি ঢেকে তারে এই-যে আমার সুরের ক্ষেতের প্রথম সোনার ধান…”
    গানটির সূচনাই হয় এক আত্মিক বিনিময়ের মধ্য দিয়ে। প্রিয়জনের কদম ফুলের উপহারের বিপরীতে কবি নিবেদন করেন তাঁর হৃদয়ের সৃষ্টিশীল ফসল। সুরের খেতের প্রথম ধান অন্তরের মেঘলা অন্ধকারে গোপনে লালিত হয়েছিল, যা আজ অর্ঘ্য হিসেবে প্রকাশিত হলো।

২. নশ্বরতার অনিবার্যতা ও শূন্যতার ভয়

  • “আজ এনে দিলে, হয়তো দিবে না কাল—রিক্ত হবে যে তোমার ফুলের ডাল…”
    প্রকৃতির চরম বাস্তবতার নিখুঁত উপলব্ধি। পার্থিব সৌন্দর্যের আয়ু অতি সীমিত। আজ যে ডাল কদম ফুলে শোভিত, কালের নিয়মে কালই তা রিক্ত ও নিঃস্ব হয়ে যাবে।

৩. বিস্মৃতির প্লাবন ও অবিনাশী তরণী

  • “এ গান আমার শ্রাবণে শ্রাবণে তব বিস্মৃতিস্রোতের প্লাবনে / ফিরিয়া ফিরিয়া আসিবে তরণী বহি তব সম্মান…”
    রবীন্দ্র-দর্শনের এক অমর উচ্চারণ। মহাকালের স্রোত হয়তো সব স্মৃতি ভাসিয়ে নিয়ে যায়, কিন্তু খাঁটি শিল্প সৃষ্টি সেই বিস্মৃতির বন্যায় ডোবে না। প্রতি বর্ষার আগমনে এই গান স্মৃতির তরণী বেয়ে বারবার ফিরে এসে ভালোবাসার ঋণ শোধ করবে।

বিদায়ের আঘাত ও আশাহীন নয়ন

প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে কদম ফুলের আয়ু নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী। কালকের শূন্য ও রিক্ত ডালের চিত্রকল্পটি অন্তরে এক গভীর বিষাদময় বিচ্ছেদের ছায়া ফেলে। যখন প্রিয়জনের ফুলের ডাল শূন্য হয়ে পড়ে এবং আশাহীন নয়ন তাকিয়ে দেখে ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্যের অনিবার্য বিলোপ, তখন সেই রিক্ততার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শিল্পী শরণ নেন সুরের অনন্ত আশ্রয়ে। পার্থিব উপস্থিতির বিদায়ের আঘাতকে কবি রূপান্তরিত করেছেন চিরন্তন সৃষ্টিতে—যেখানে চাক্ষুষ রূপ হারিয়ে গেলেও গানের তরণী যুগে যুগে সেই ভালোবাসার স্মৃতিকে বহন করে চলে।

সাহিত্যিক ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য

  • রূপকের অনুপম বিন্যাস: কদম ফুল (প্রকৃতির ক্ষণস্থায়ী উপহার), সুরের ক্ষেতের ধান (শিল্পীর আত্মিক সৃষ্টি), এবং বিস্মৃতিস্রোতের তরণী (মহাকালের বুকে অক্ষয় শিল্প)—এই রূপকগুলো কবিতার গভীরতাকে এক অনন্য নান্দনিকতায় পৌঁছে দিয়েছে।
  • দ্বান্দ্বিক দার্শনিকতা: ক্ষণভঙ্গুর প্রকৃতি বনাম অমর শিল্পের চিরন্তন দ্বন্দ্বকে অত্যন্ত মাধুর্যময় ও ঋজু ভাষায় সমন্বয় করা হয়েছে।
  • চিত্ররূপময় ভাষা: মেঘের অন্ধকার, কদম ফুলের স্নিগ্ধতা, সোনালি ধান এবং বর্ষার প্লাবনের দৃশ্যকল্প গানটিকে এক জীবন্ত চিত্রকলার রূপ দিয়েছে।

সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সুরের নান্দনিকতা

  • মল্লার রাগের বর্ষা-আবহ: উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের বর্ষার প্রধান রাগ ‘মল্লার’-এর গম্ভীর ও রসঘন ছায়ায় গানটি আশ্রিত। মেঘের গুরুগম্ভীর রূপ এবং বৃষ্টির আর্দ্রতা মল্লারের স্বরবিন্যাসে প্রগাঢ় হয়ে উঠেছে।
  • দাদরা তালের সাবলীল গতি: ছয় মাত্রার দাদরা তালের ছন্দদোলা গানটির সুরে বৃষ্টির ধারাপাতের মতো এক স্বাভাবিক ও সাবলীল প্রবাহ তৈরি করে।
  • শৈলজারঞ্জন মজুমদারের স্বরলিপি: শান্তিনিকেতনের বিশিষ্ট সংগীতগুরু শৈলজারঞ্জন মজুমদারের করা প্রামাণ্য স্বরলিপিতে মল্লারের মীড় ও স্বরপ্রক্ষেপণ নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত হয়েছে।

শিল্পী ও স্রষ্টা পরিচিতি

  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১): ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ জুলাই (১৪ শ্রাবণ, ১৩৪৬ বঙ্গাব্দ) শান্তিনিকেতনে বর্ষাকালে কবি এই গানটি রচনা করেন। জীবনের প্রান্তসীমায় পৌঁছে রচিত এই গানে প্রকৃতির রূপ এবং সৃষ্টির অমরত্ববোধ একাকার হয়ে গিয়েছিল।
  • গীতবিতানের প্রকৃতি পর্যায়: রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি পর্যায়ের গানগুলোর মধ্যে বর্ষার গানগুলো বাঙালির আবেগ, প্রেম ও প্রকৃতির অনুভূতির অন্যতম শীর্ষ সংযোজন।

সাংস্কৃতিক তাৎপর্য

“বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল” বাংলা সংস্কৃতিতে বর্ষাবরণের এক চিরন্তন প্রতীক। আষাঢ় ও শ্রাবণের আগমনে কদম ফুল এবং এই গানটি যেন বাঙালির অস্তিত্বের সাথে জড়িয়ে আছে। যেকোনো বর্ষা উৎসব, রবীন্দ্রসংগীতের আসর কিংবা প্রকৃতির রূপ উদযাপনে এই গানটি নশ্বর সৌন্দর্য ও অবিনাশী ভালোবাসার এক অমলিন স্মারক হিসেবে আজও সমানভাবে সমাদৃত।

উৎস ও তথ্যসূত্র

  1. গীতবিতান (অখণ্ড সংস্করণ), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ।
  2. স্বরবিতান (৪৭তম খণ্ড), রবীন্দ্রসংগীতের প্রামাণ্য স্বরলিপি সংকলন।
  3. রবীন্দ্র-জীবনী (চতুর্থ খণ্ড), প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়।

 

আমার রবীন্দ্রনাথ চ্যানেলের জন্য গেয়েছেন “পুজা কর্মকার”:

 

Share

ফিচার ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নতুন করে দেখা, জানা ও বোঝার একটি বিশেষ আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর ফিচার ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের জীবন, সাহিত্য, সংগীত, দর্শন, শিক্ষা, সমাজভাবনা, রাজনীতি, শিল্পচেতনা ও সমকালকে ঘিরে প্রকাশিত হবে বিশ্লেষণধর্মী ফিচার, প্রবন্ধ, স্মৃতিচিত্র, সাক্ষাৎকার, গবেষণাভিত্তিক লেখা ও নানা বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে তাঁর সময়, সমাজ ও বিশ্বপরিসরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার পাশাপাশি তাঁর চিন্তার সমকালীন প্রাসঙ্গিকতাও অনুসন্ধান করবে এই ডেস্ক। কবিতা ও গানের পরিচিত পাঠের বাইরে তাঁর অজানা দিক, সৃষ্টির নেপথ্যের গল্প, মানুষ রবীন্দ্রনাথের জীবন ও তাঁর বহুমাত্রিক উত্তরাধিকারকে পাঠকের সামনে তুলে ধরাই ‘ফিচার ডেস্ক’-এর অন্যতম লক্ষ্য।রবীন্দ্রনাথকে শুধু পড়া নয়—তাঁকে জানা, তাঁর সময়কে বোঝা এবং তাঁর ভাবনার সঙ্গে আজকের সময়ের সংযোগ খোঁজাই আমাদের এই আয়োজন।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত