শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থের ইচ্ছামতী কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শিশু ভোলানাথ’ কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর কল্পনাপ্রধান ও মনোহর শিশুতোষ কবিতা হলো ‘ইচ্ছামতী’। নিজের ইচ্ছামতো রূপ ধারণ করতে পারলে এক চঞ্চল শিশু কীভাবে একটি নদী হয়ে দুই কূলের আলো-ছায়া, চেনা-অচেনার দ্বন্দ্ব এবং অনন্ত রহস্যের মাঝে বয়ে যেতে চায়—তার এক অপূর্ব ও নিষ্পাপ রূপকল্প এ কবিতায় ধরা পড়েছে।

শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থের ইচ্ছামতী কবিতা

ইচ্ছামতী কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামইচ্ছামতী
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থশিশু ভোলানাথ
প্রকাশের বছর১৯২২ (১৩২৯ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনশিশুতোষ ও কল্পনামূলক লিরিক কবিতা (Children’s Imaginative Lyric)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯২২ সালে প্রকাশিত ‘শিশু ভোলানাথ’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ শিশুর অবাধ কল্পনার জগতকে পরম মমতায় মূর্ত করেছেন। নদীর মতোই শিশুর মন কোনো গণ্ডিতে আটকে থাকতে চায় না; সে একই সাথে হতে চায় নিজের চেনা গ্রামের পরম আপন এবং বহুদূরের অচেনা জগতের পরিব্রাজক। ইচ্ছামতী নদীর নামের রূপকটিকে গ্রহণ করে শিশুটি নিজের ইচ্ছায় নদী হয়ে ওঠার যে রূপকথা তৈরি করে, তাতে একাধারে প্রকৃতির সৌন্দর্য, লোকালয়ের কোলাহল এবং অতল রহস্যের ভীতি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

ইচ্ছামতী কবিতা (সম্পূর্ণ):

যখন যেমন মনে করি

          তাই হতে পাই যদি

আমি তবে একখানি হই

          ইচ্ছামতী নদী।

রৈবে আমার দখিন ধারে

          সূর্য ওঠার পার,

বাঁয়ের ধারে সন্ধ্যেবেলায়

          নামবে অন্ধকার।

আমি কইব মনের কথা

          দুই পারেরি সাথে,

আধেক কথা দিনের বেলায়,

          আধেক কথা রাতে।

যখন ঘুরে ঘুরে বেড়াই

          আপন গাঁয়ের ঘাটে

ঠিক তখনি গান গেয়ে যাই

          দূরের মাঠে মাঠে

গাঁয়ের মানুষ চিনি, যারা

          নাইতে আসে জলে,

গোরু মহিষ নিয়ে যারা

          সাঁতরে ওপার চলে।

দূরের মানুষ যারা তাঁদের

          নতুনতরো বেশ,

নাম জানি নে, গ্রাম জানি নে

          অদ্ভুতের একশেষ।

জলের উপর ঝলোমলো

          টুকরো আলোর রাশি।

ঢেউয়ে ঢেউয়ে পরীর নাচন,

          হাততালি আর হাসি।

নিচের তলায় তলিয়ে যেথায়

          গেছে ঘাটের ধাপ

সেইখানেতে কারা সবাই

          রয়েছে চুপচাপ।

কোণে কোণে আপন মনে

          করছে তারা কী কে।

আমারি ভয় করবে কেমন

          তাকাতে সেই দিকে।

গাঁয়ের লোকে চিনবে আমার

          কেবল একটুখানি।

বাকি কোথায় হারিয়ে যাবে

          আমিই সে কি জানি?

একধারেতে মাঠে ঘাটে

          সবুজ বরন শুধু,

আর একধারে বালুর চরে

          রৌদ্র করে ধু ধু।

দিনের বেলায় যাওয়া আসা,

          রাত্তিরে থম থম!

ডাঙার পানে চেয়ে চেয়ে

          করবে গা ছম ছম।

 

ইচ্ছামতী কবিতা সম্পূর্ণ Romanized Version:

Jokhon jemon mone kori
Tai hote pai jodi
Ami tobe ekkhani hoi
Ichchamoti nodi.
Roibe amar dokhin dhare
Shurjo othar par,
Banyer dhare shondhyebelay
Nambe ondhokar.
Ami koibo moner kotha
Dui pareri shathe,
Adhek kotha diner belay,
Adhek kotha rate.
Jokhon ghure ghure berai
Apon ganyer ghate
Thik tokhoni gan geye jai
Durer mathe mathe
Ganyer manush chini, jara
Naite ashe jole,
Goru mohish niye jara
Santrye opar chole.
Durer manush jara tander
Notuntoro besh,
Nam jani ne, gram jani ne
Odbhutero ekshesh.
Joler upor jholomolo
Tukro alor rashi.
Dheue dheue porir nachon,
Hattali ar hashi.
Nicher tolay toliye jethay
Gechhe ghater dhap
Sheikhanete kara shobai
Royechhe chupchap.
Kone kone apon mone
Korchhe tara ki ke.
Amari bhoy korbe kemon
Takate shei dike.
Ganyer loke chinbe amar
Kebol ektukhani.
Baki kothay hariye jabe
Ami-i she ki jani?
Ekdharete mathe ghate
Shobuj boron shudhu,
Ar ekdhare balur chore
Roudro kore dhu dhu.
Diner belay jawa asha,
Rattire thom thom!
Dangar pane cheye cheye
Korbe ga chhom chhom.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • চেনা ও অচেনার মেলবন্ধন:
    “গাঁয়ের মানুষ চিনি, যারা / নাইতে আসে জলে, … দূরের মানুষ যারা তাঁদের / নতুনতরো বেশ, / নাম জানি নে, গ্রাম জানি নে / অদ্ভুতের একশেষ।”
    — ইচ্ছামতী নদী হয়ে শিশুটি একদিকে নিজের চেনা গাঁয়ের স্নানযাত্রী ও পশুপালকদের সাথে পরিচিত সান্নিধ্য উপভোগ করতে চায়, আবার অন্যদিকে অচেনা দূর-দেশী মানুষের অদ্ভুত বেশভূষা দেখে কল্পনার রোমাঞ্চে মাতোয়ারা হয়।
  • আলো-আঁধারি ও সুরের দ্বৈতরূপ:
    “রৈবে আমার দখিন ধারে / সূর্য ওঠার পার, / বাঁয়ের ধারে সন্ধ্যেবেলায় / নামবে অন্ধকার।”
    — নদীটির এক পাড়ে সকালের উদীয়মান আলো এবং অপর পাড়ে সন্ধ্যার নীরব আঁধার। নদীর অস্তিত্বের মধ্য দিয়েই দিন ও রাত, আলো ও ছায়ার বৈপরীত্য এক অখণ্ড সুন্দর ধারায় রূপ লাভ করে।
  • জলের গভীরে অজানার ভীতি:
    “নিচের তলায় তলিয়ে যেথায় / গেছে ঘাটের ধাপ / সেইখানেতে কারা সবাই / রয়েছে চুপচাপ। / কোণে কোণে আপন মনে / করছে তারা কী কে। / আমারি ভয় করবে কেমন / তাকাতে সেই দিকে।”
    — শিশুসুলভ কল্পনার একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো গভীরের প্রতি অকারণ কৌতূহল ও ভয়। ঘাটের ডুবে যাওয়া ধাপের অন্ধকারে কারা যেন নিঃশব্দে বাস করে—এই চিন্তা নদী হয়েও শিশুর মনে এক মিষ্টি শিহরণ ও গা ছমছমে ভাব জাগিয়ে তোলে।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন