Table of Contents
পাঁচিলের এধারে কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | পাঁচিলের এধারে (৪২ সংখ্যক কবিতা) |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | শেষ সপ্তক |
| প্রকাশের বছর | ১৯৩৫ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | আধুনিক গদ্যকবিতা ও শিল্পতত্ত্বীয় লিরিক (Poetic Ars Poetica / Prose Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
পাঁচিলের এধারে সম্পূর্ণ কবিতা:
পাঁচিলের এধারে
ফুলকাটা চিনের টবে
সাজানো গাছ সুসংযত।
ফুলের কেয়ারিতে
কাঁচিছাঁটা বেগনি গাছের পাড়।
পাঁচিলের গায়ে গায়ে
বন্দী-করা লতা।
এরা সব হাসে মধুর করে,
উচ্চহাস্য নেই এখানে;
হাওয়ায় করে দোলাদুলি
কিন্তু জায়গা নেই দুরন্ত নাচের,
এরা আভিজাত্যের সুশাসনে বাঁধা।
বাগানটাকে দেখে মনে হয়
মোগল বাদশার জেনেনা,
রাজ-আদরে অলংকৃত,
কিন্তু পাহারা চারদিকে,
চরের দৃষ্টি আছে ব্যবহারের প্রতি।
পাঁচিলের ওপারে দেখা যায়
একটি সুদীর্ঘ য়ুকলিপটাস
খাড়া উঠেছে ঊর্ধ্বে।
পাশেই দুটি তিনটি সোনাঝুরি
প্রচুর পল্লবে প্রগল্ভ।
নীল আকাশ অবারিত বিস্তীর্ণ
ওদের মাথার উপরে।
অনেকদিন দেখেছি অন্যমনে,
আজ হঠাৎ চোখে পড়ল
ওদের সমুন্নত স্বাধীনতা,
দেখলেম, সৌন্দর্যের মর্যাদা
আপন মুক্তিতে।
ওরা ব্রাত্য, আচারমুক্ত, ওরা সহজ;
সংযম আছে ওদের মজ্জার মধ্যে
বাইরে নেই শৃঙ্খলার বাঁধাবাঁধি।
ওদের আছে শাখার দোলন
দীর্ঘ লয়ে;
পল্লবগুচ্ছ নানা খেয়ালের;
মর্মরধ্বনি হাওয়ায় ছড়ানো।
আমার মনে লাগল ওদের ইঙ্গিত;
বললেম, “টবের কবিতাকে
রোপণ করব মাটিতে,
ওদের ডালপালা যথেচ্ছ ছড়াতে দেব
বেড়াভাঙা ছন্দের অরণ্যে।”
পাঁচিলের এধারে সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- আভিজাত্যের বন্দিশালা ও নিয়ন্ত্রিত রূপ:“বাগানটাকে দেখে মনে হয় / মোগল বাদশার জেনেনা, / রাজ-আদরে অলংকৃত, / কিন্তু পাহারা চারদিকে,”— পাঁচিলের ভেতরের টবে লালিত গাছ ও ফুলকে কবি তুলনা করেছেন মোগল হারেমের সাথে। বাহ্যিক সাজসজ্জা ও অলংকার যতই নিখুঁত হোক, কড়া পাহারায় বন্দি সেই সৌন্দর্যে প্রাণের কোনো উন্মুক্ত উল্লাস বা স্বাধীন বিকাশ থাকে না।
- অবারিত মুক্তি ও মুক্তপ্রাণের নান্দনিকতা:“ওরা ব্রাত্য, আচারমুক্ত, ওরা সহজ; / সংযম আছে ওদের মজ্জার মধ্যে / বাইরে নেই শৃঙ্খলার বাঁধাবাঁধি।”— পাঁচিলের ওপারের ইউক্যালিপটাস ও সোনাঝুরি কোনো কৃত্রিম নিয়মের মুখাপেক্ষী নয়। তাদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিস্তারের মধ্যেই রয়েছে শিল্পের আসল আভিজাত্য। প্রকৃত সংযম কৃত্রিম কাঁচিছাঁটা শৃঙ্খলায় থাকে না, থাকে স্বভাবজাত অন্তরের সামঞ্জস্যে।
- গদ্যকবিতার আত্মপ্রকাশ ও কাব্যতত্ত্ব:“বললেম, ‘টবের কবিতাকে / রোপণ করব মাটিতে, / ওদের ডালপালা যথেচ্ছ ছড়াতে দেব / বেড়াভাঙা ছন্দের অরণ্যে।'”— কবিতার শেষ পঙ্ক্তিগুলোতে কবির নিজস্ব কাব্যযাত্রার রূপান্তর ঘোষিত হয়েছে। প্রচলিত ছন্দের টব বা কাঠামোর সীমাবদ্ধতা ভেঙে তিনি কবিতাকে জীবনের উদার মাটিতে রোপণ করতে চান, যাতে তা মুক্ত গদ্যছন্দের অরণ্যে স্বাধীনভাবে বিস্তার লাভ করতে পারে।