শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের পাঁচিলের এধারে কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিণত বয়সের আধুনিক গদ্যকবিতার সংকলন ‘শেষ সপ্তক’-এর ৪২ সংখ্যক কবিতা হলো ‘পাঁচিলের এধারে’। প্রথাবদ্ধ কৃত্রিম শৃঙ্খলার বিপরীতে বুনো প্রকৃতির অবারিত মুক্তি এবং কবিতার আঙিনায় ছন্দ ও কাঠামোর সংকীর্ণ বেড়া ভেঙে মুক্ত রূপ ধারণের কাব্য-দর্শন এ কবিতায় অপূর্ব রূপকে প্রতিভাত হয়েছে।

 পাঁচিলের এধারে কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামপাঁচিলের এধারে (৪২ সংখ্যক কবিতা)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থশেষ সপ্তক
প্রকাশের বছর১৯৩৫ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনআধুনিক গদ্যকবিতা ও শিল্পতত্ত্বীয় লিরিক (Poetic Ars Poetica / Prose Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৩৫ সালে প্রকাশিত ‘শেষ সপ্তক’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ প্রাচীন ছন্দ ও অলংকারের কৃত্রিম প্রাচীর ভেঙে বাংলা কবিতায় আধুনিক গদ্যরীতির পথ প্রশস্ত করেন। এই কবিতায় পাঁচিলের ভেতরের সাজানো বাগান এবং বাইরের মুক্ত প্রান্তরকে কবি দুটি বিপরীত ধারার শিল্পাদর্শের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। পাঁচিলের ভেতরের টবে রাখা ছাঁটা গাছ হলো গতানুগতিক অলংকৃত ও কৃত্রিম নিয়মে বাঁধা কবিতার রূপ। অন্যদিকে পাঁচিলের ওপারের আকাশছোঁয়া ইউক্যালিপটাস ও সোনাঝুরি হলো সহজ, আচারমুক্ত ও প্রাণবন্ত সৃষ্টির প্রতীক। জীবনের শেষ পর্বে এসে কবি ঘোষণা করেন—তিনি তাঁর সৃষ্টিকে কৃত্রিম টব থেকে মুক্ত করে ছড়িয়ে দেবেন ‘বেড়াভাঙা ছন্দের অরণ্যে’।

 পাঁচিলের এধারে সম্পূর্ণ কবিতা:

পাঁচিলের এধারে

ফুলকাটা চিনের টবে

সাজানো গাছ সুসংযত।

ফুলের কেয়ারিতে

কাঁচিছাঁটা বেগনি গাছের পাড়।

পাঁচিলের গায়ে গায়ে

বন্দী-করা লতা।

এরা সব হাসে মধুর করে,

উচ্চহাস্য নেই এখানে;

হাওয়ায় করে দোলাদুলি

কিন্তু জায়গা নেই দুরন্ত নাচের,

এরা আভিজাত্যের সুশাসনে বাঁধা।

বাগানটাকে দেখে মনে হয়

মোগল বাদশার জেনেনা,

রাজ-আদরে অলংকৃত,

কিন্তু পাহারা চারদিকে,

চরের দৃষ্টি আছে ব্যবহারের প্রতি।

পাঁচিলের ওপারে দেখা যায়

একটি সুদীর্ঘ য়ুকলিপটাস

খাড়া উঠেছে ঊর্ধ্বে।

পাশেই দুটি তিনটি সোনাঝুরি

প্রচুর পল্লবে প্রগল্‌ভ।

নীল আকাশ অবারিত বিস্তীর্ণ

ওদের মাথার উপরে।

 

অনেকদিন দেখেছি অন্যমনে,

আজ হঠাৎ চোখে পড়ল

ওদের সমুন্নত স্বাধীনতা,

দেখলেম, সৌন্দর্যের মর্যাদা

আপন মুক্তিতে।

ওরা ব্রাত্য, আচারমুক্ত, ওরা সহজ;

সংযম আছে ওদের মজ্জার মধ্যে

বাইরে নেই শৃঙ্খলার বাঁধাবাঁধি।

ওদের আছে শাখার দোলন

দীর্ঘ লয়ে;

পল্লবগুচ্ছ নানা খেয়ালের;

মর্মরধ্বনি হাওয়ায় ছড়ানো।

আমার মনে লাগল ওদের ইঙ্গিত;

বললেম, “টবের কবিতাকে

রোপণ করব মাটিতে,

ওদের ডালপালা যথেচ্ছ ছড়াতে দেব

বেড়াভাঙা ছন্দের অরণ্যে।”

 পাঁচিলের এধারে সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Pachiler edhare
Phulkata chiner tobe
Shajano gachh shushongjoto.
Phuler keyarite
Kanchichhanta begni gachher par.
Pachiler gaye gaye
Bondi-kora lota.
Era shob hashe modhur kore,
Uchchohassho nei ekhane;
Haway kore doladuli
Kintu jayga nei duronto nacher,
Era obhijatter shushashone bandha.
Bagantake dekhe mone hoy
Moghol badshar jenana,
Raj-adore olongkrito,
Kintu pahara chardike,
Chorer drishti achhe byoboharer proti.
Pachiler opare dekha jay
Ekti shudirgho yukoliptas
Khara uthechhe urdhwe.
Pashei duti tinti shonajhuri
Prochur pollobe progolbho.
Nil akash obarito bistirno
Oder mathar upore.
Onekdin dekhechhi onnomone,
Aj hothat chokhe porlo
Oder shomunnoto shadhinota,
Dekhlem, shoundorjer morjada
Apon muktite.
Ora bratto, acharmukto, ora shohoj;
Shongjom achhe oder mojjar moddhye
Baire nei shringkholar bandhabandhi.
Oder achhe shakhar dolon
Dirgho loye;
Pollobguchho nana kheleyar;
Mormordhoni haway chhorano.
Amar mone laglo oder inggit;
Bollem, “Tober kobitake
Ropon korbo matite,
Oder dalpala jothechho chhorate debo
Bera-bhanga chhongder oronnye.”

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • আভিজাত্যের বন্দিশালা ও নিয়ন্ত্রিত রূপ:
    “বাগানটাকে দেখে মনে হয় / মোগল বাদশার জেনেনা, / রাজ-আদরে অলংকৃত, / কিন্তু পাহারা চারদিকে,”
    — পাঁচিলের ভেতরের টবে লালিত গাছ ও ফুলকে কবি তুলনা করেছেন মোগল হারেমের সাথে। বাহ্যিক সাজসজ্জা ও অলংকার যতই নিখুঁত হোক, কড়া পাহারায় বন্দি সেই সৌন্দর্যে প্রাণের কোনো উন্মুক্ত উল্লাস বা স্বাধীন বিকাশ থাকে না।
  • অবারিত মুক্তি ও মুক্তপ্রাণের নান্দনিকতা:
    “ওরা ব্রাত্য, আচারমুক্ত, ওরা সহজ; / সংযম আছে ওদের মজ্জার মধ্যে / বাইরে নেই শৃঙ্খলার বাঁধাবাঁধি।”
    — পাঁচিলের ওপারের ইউক্যালিপটাস ও সোনাঝুরি কোনো কৃত্রিম নিয়মের মুখাপেক্ষী নয়। তাদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিস্তারের মধ্যেই রয়েছে শিল্পের আসল আভিজাত্য। প্রকৃত সংযম কৃত্রিম কাঁচিছাঁটা শৃঙ্খলায় থাকে না, থাকে স্বভাবজাত অন্তরের সামঞ্জস্যে।
  • গদ্যকবিতার আত্মপ্রকাশ ও কাব্যতত্ত্ব:
    “বললেম, ‘টবের কবিতাকে / রোপণ করব মাটিতে, / ওদের ডালপালা যথেচ্ছ ছড়াতে দেব / বেড়াভাঙা ছন্দের অরণ্যে।'”
    — কবিতার শেষ পঙ্‌ক্তিগুলোতে কবির নিজস্ব কাব্যযাত্রার রূপান্তর ঘোষিত হয়েছে। প্রচলিত ছন্দের টব বা কাঠামোর সীমাবদ্ধতা ভেঙে তিনি কবিতাকে জীবনের উদার মাটিতে রোপণ করতে চান, যাতে তা মুক্ত গদ্যছন্দের অরণ্যে স্বাধীনভাবে বিস্তার লাভ করতে পারে।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন