আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

সানাই কাব্যগ্রন্থের ‘সানাই’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামসানাই
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থসানাই
প্রকাশের বছর১৯৪০ (১৩৪৭ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনদার্শনিক ও প্রতীকী লিরিক কবিতা (Philosophical / Symbolic Lyric)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৪০ সালে প্রকাশিত ‘সানাই’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের একেবারে অন্তিম দশকের সৃষ্টি। এই গ্রন্থের কবিতাগুলোতে বার্ধক্যের প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে জীবনের তুচ্ছতা ও মহত্ত্ব, প্রাত্যহিক জীবনের অসংগতি এবং তার পেছনে লুকিয়ে থাকা এক পরম সত্যের সন্ধান অত্যন্ত গভীর মাত্রায় প্রকাশ পেয়েছে। নামাঙ্কিত ‘সানাই’ কবিতায় কবি এক গ্রামীণ বিয়ের বা ভোজের আসরের বাস্তব চিত্র এঁকেছেন—যেখানে গোছা গোছা কলাপাতা, সরা খুরি, অনাহূত মানুষের ঠেলাঠেলি, রঙিন উষ্ণীষধর অনুচরদের ব্যস্ততা এবং গোরুর গাড়ির ও ধানের কলের ধোঁয়া ও দুর্গন্ধ মিলে এক চরম বিশৃঙ্খলা ও অসংগতি তৈরি করেছে। কিন্তু এই সমস্ত কোলাহল ও অসংগতির ঠিক মাঝখানে হঠাৎ যখন সানাই বেজে ওঠে, তখন তার সুর সমস্ত দ্বন্দ্ব ভুলিয়ে দিয়ে অরূপের মর্ম থেকে উৎসবের মধুচ্ছন্দ ও বেদনার মূর্ছনায় এক অনির্বচনীয় ঐক্যের জন্ম দেয়।

সানাই কবিতা (সম্পূর্ণ)

সারারাত ধ’রে

     গোছা গোছা কলাপাতা আসে গাড়ি ভ’রে।

                আসে সরা খুরি

                   ভূরি ভূরি।

                এপাড়া ওপাড়া হতে যত

          রবাহূত অনাহূত আসে শত শত;

               প্রবেশ পাবার তরে

                   ভোজনের ঘরে

          ঊর্ধ্বশ্বাসে ঠেলাঠেলি করে;

               ব’সে পড়ে যে পারে যেখানে,

                   নিষেধ না মানে।

          কে কাহারে হাঁক ছাড়ে হৈ হৈ,

                   এ কই, ও কই।

               রঙিন উষ্ণীষধর

          লালরঙা সাজে যত অনুচর

          অনর্থক ব্যস্ততায় ফেরে সবে

                   আপনার দায়িত্বগৌরবে।

          গোরুর গাড়ির সারি হাটের রাস্তায়,

               রাশি রাশি ধুলো উড়ে যায়,

                   রাঙা রাগে

               রৌদ্রে গেরুয়া রঙ লাগে।

ওদিকে ধানের কল দিগন্তে কালিমাধূম্র হাত

     ঊর্ধ্বে তুলি, কলঙ্কিত করিছে প্রভাত।

          ধান-পচানির গন্ধে

               বাতাসের রন্ধ্রে রন্ধ্রে

                   মিশাইছে বিষ।

থেকে থেকে রেলগাড়ি মাঠের ওপারে দেয় শিস।

          দুই প্রহরের ঘণ্টা বাজে।

সমস্ত এ ছন্দভাঙা অসংগতি-মাঝে

     সানাই লাগায় তার সারঙের তান।

কী নিবিড় ঐক্যমন্ত্র করিছে সে দান

     কোন্‌ উদ্ভ্রান্তের কাছে,

          বুঝিবার সময় কি আছে।

     অরূপের মর্ম হতে সমুচ্ছ্বাসি

          উৎসবের মধুচ্ছন্দ বিস্তারিছে বাঁশি।

               সন্ধ্যাতারা-জ্বালা অন্ধকারে

     অনন্তের বিরাট পরশ যথা অন্তর-মাঝারে,

                   তেমনি সুদূর স্বচ্ছ সুর

                        গভীর মধুর

     অমর্ত লোকের কোন্‌ বাক্যের অতীত সত্যবাণী

          অন্যমনা ধরণীর কানে দেয় আনি।

     নামিতে নামিতে এই আনন্দের ধারা

          বেদনার মূর্ছনায় হয় আত্মহারা।

          বসন্তের যে দীর্ঘনিশ্বাস

বিকচ বকুলে আনে বিদায়ের বিমর্ষ আভাস,

          সংশয়ের আবেগ কাঁপায়

     সদ্যঃপাতী শিথিল চাঁপায়,

          তারি স্পর্শ লেগে

সাহানার রাগিণীতে বৈরাগিণী ওঠে যেন জেগে,

     চলে যায় পথহারা অর্থহারা দিগন্তের পানে।

কতবার মনে ভাবি, কী যে সে কে জানে।

          মনে হয়, বিশ্বের যে মূল উৎস হতে

সৃষ্টির নির্ঝর ঝরে শূন্যে শূন্যে কোটি কোটি স্রোতে

     এ রাগিণী সেথা হতে আপন ছন্দের পিছু পিছু

          নিয়ে আসে বস্তুর অতীত কিছু

               হেন ইন্দ্রজাল

          যার সুর যার তাল

        রূপে রূপে পূর্ণ হয়ে উঠে

                   কালের অঞ্জলিপুটে।

          প্রথম যুগের সেই ধ্বনি

               শিরায় শিরায় উঠে রণরণি;

     মনে ভাবি, এই সুর প্রত্যহের অবরোধ-‘পরে

               যতবার গভীর আঘাত করে

          ততবার ধীরে ধীরে কিছু কিছু খুলে দিয়ে যায়

               ভাবী যুগ-আরম্ভের অজানা পর্যায়।

নিকটের দুঃখদ্বন্দ্ব নিকটের অপূর্ণতা তাই

          সব ভুলে যাই,

     মন যেন ফিরে

          সেই অলক্ষ্যের তীরে তীরে

     যেথাকার রাত্রিদিন দিনহারা রাতে

          পদ্মের কোরক-সম প্রচ্ছন্ন রয়েছে আপনাতে।

Amar Rabindranath Logo

সানাই কবিতার Romanized Version:

Sararat dho’re
Gochha gochha kolapata ashe gari vhore।
Ashe shora khuri
Bhuri bhuri।
Epada opada hote joto
Robahuto onahuto ashe shoto shoto;
Probesh pabhar tore
Bhojoner ghore
Urdhoshwashe thelatheli kore;
Bo’se pore je pare jekhane,
Nishedh na mane।
Ke kahare hak chhare hoi hoi,
E koi, oi koi।
Rongin ushnishodhor
Lalronga shaje joto anuchor
Onorthok byastatay fere shobe
Aponar dayitwogourobe।
Gorur garir shari hater rastay,
Rashi rashi dhulo ure jay,
Ranga rage
Roudre geruya rong lage।
Odike dhaner kol digonte kalimahdumro hat
Urdhve tuli, kolongkito koriche provhat।
Dhan-pochanir gondhe
Batasher rondhre rondhre
Mishaychhe bish।
Theke theke relgari mather opare dey shish।
      Dui prohorer ghonta baje।
Shomosto e chhandobhanga osongoti-majhe
Sanai lagay tar sharonger tan।
Ki nibiro oikkyomontro koriche se dan
Kono udbhranter kache,
Bujhibar shomoy ki ache।
Aruper mormo hote shomuchchhashi
Utshober modhuchhondo bistarichhe bashi।
Shondhyatara-jwala andhakare
Ononter birat porosh jotha ontor-majhare,
Temni shudur shachchho shur
Gohobur modhur
Omorto loker kono bakyer otit sattyobani
Onyomona dhoronir kane dey ani।
Namite namite ei anonder dhara
Bedonar murchhonay hoy atmohara।
Boshonter je dirghonishash
Bikoch bokule ane bidayer bimorsho abhash,
Shongshoyer abeg kapaye
Shodyopati shithil champay,
Tari sporsho lege
Sahanar raginite bairagini othe jeno jege,
Chole jay pothhara orthohara digonter pane।
Koto bar mone bhabi, ki je se ke jane।
      Mone hoy, bishwer je mul utsho hote
Srishtir nirjhor zhore shunye shunye koti koti shrote
E ragini setha hote apon chhonder pichhu pichhu
Niye ashe bostur otit kichhu
Heno indrojal
Jar shur jar tal
Rupe rupe purno hoye uthe
Kaler onjolipuute।
Prothom juger shei dhoni
Shiray shiray uthe ronroni;
Mone bhabi, ei shur protyoher oborodhor-‘pore
Jotobar gobir aghat kore
Totobar dhire dhire kichhu kichhu khule diye jay
Bhabi yug-arombher ojana porjay।
Nikoter dujkhodwondo nikoter opurnota tai
Shob bhule jai,
Mon jeno fire
Sei olokhyer tire tire
Yethakar ratridin dinhara rate
Padmer korok-shomo prochchhonno royeche aponate।

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • অসংগতি ও ঐক্যের সুর: পার্থিব জীবনের বিশৃঙ্খলা, অসংগতি, উৎসবের কোলাহল এবং গ্রামীণ জঞ্জালের মাঝে সানাইয়ের সুদূর স্বচ্ছ সুর কীভাবে এক নিবিড় ঐক্য ও গভীর শান্তি নিয়ে আসে।
  • অমরতার বার্তা ও অন্তিম উপলব্ধি: সানাইয়ের তান কেবল একটি বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনি নয়, বরং তা বিশ্বপ্রকৃতির মূল উৎস এবং আদিম যুগের সেই ধ্বনি যা মানুষের শিরায় শিরায় রণরণি হয়ে বেজে ওঠে এবং প্রাত্যহিক জীবনের সমস্ত দুঃখদ্বন্দ্ব ভুলিয়ে দেয়—এই দার্শনিক ও আত্মিক উপলব্ধিতেই কবিতাটি পূর্ণতা পেয়েছে।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (সানাই কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত