আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

সোনার তরী কাব্যগ্রন্থের ‘শৈশবসন্ধ্যা’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ (১৮৯৪) কাব্যগ্রন্থের অন্যতম এক স্নিগ্ধ, নস্টালজিক ও মনস্তাত্ত্বিক গীতি-কবিতা হলো ‘শৈশবসন্ধ্যা’। এই কবিতায় সন্ধ্যার প্রাক্কালে প্রকৃতির শান্ত রূপ, দূর গ্রামের কোনো বালকের উদাসীন গান এবং তার সূত্র ধরে কবির শৈশবের স্মৃতি ও মানবজীবনের চিরন্তন বাল্যকালের রূপ অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামশৈশবসন্ধ্যা
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থসোনার তরী
প্রকাশের বছর১৮৯৪ (১২০১ বঙ্গাব্দ) / মানসী-সোনার তরী পর্ব
কবিতার ধরননস্টালজিক, প্রকৃতি-নির্ভর ও গীতি-কবিতা (Nostalgic, Nature-conscious and Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৮৯৪ সালে প্রকাশিত ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থে কবির প্রকৃতিপ্রেম ও অতীতের স্মৃতিচারণার এক অপূর্ব রূপ প্রকাশ পেয়েছে। ‘শৈশবসন্ধ্যা’ কবিতায় কবি নদীতীরে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যার অন্ধকার ও শ্রান্ত প্রকৃতির রূপ দেখছেন। এমন সময় দূর গ্রামের পথ দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে কোনো এক অচেনা বালকের উচ্চস্বরে গান গাওয়ার শব্দ তাঁর মনে শৈশবের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে। কবি ভাবেন—সংসার যতই বৃদ্ধ হোক না কেন, পৃথিবীর বুকে চিরকাল নতুন বালক-বালিকা, মায়ের মুখের স্নেহ, দীপের আলোক এবং শৈশবের সেই সহজ আনন্দ ও অমর বিশ্বাস টিকে রয়েছে।

শৈশবসন্ধ্যা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ধীরে ধীরে বিস্তারিছে ঘেরি চারিধার
শ্রান্তি, আর শান্তি, আর সন্ধ্যা-অন্ধকার,
মায়ের অঞ্চলসম। দাঁড়ায়ে একাকী
মেলিয়া পশ্চিম-পানে অনিমেষ আঁখি
স্তব্ধ চেয়ে আছি। আপনারে মগ্ন করি
অতলের তলে, ধীরে লইতেছি ভরি
জীবনের মাঝে— আজিকার এই ছবি,
জনশূন্য নদীতীর, অস্তমান রবি,
ম্লান মূর্ছাতুর আলো— রোদন-অরুণ,
ক্লান্ত নয়নের যেন দৃষ্টি সকরুণ
স্থির বাক্যহীন— এই গভীর বিষাদ,
জলে স্থলে চরাচরে শ্রান্তি অবসাদ।

সহসা উঠিল গাহি কোন্‌খান হতে
বন-অন্ধকারঘন কোন্‌ গ্রামপথে
যেতে যেতে গৃহমুখে বালক-পথিক।
উচ্ছ্বসিত কণ্ঠস্বর নিশ্চিন্ত নির্ভীক
কাঁপিছে সপ্তম সুরে, তীব্র উচ্চতান
সন্ধ্যারে কাটিয়া যেন করিবে দুখান।

দেখিতে না পাই তারে। ওই যে সম্মুখে
প্রান্তরের সর্বপ্রান্তে, দক্ষিণের মুখে,
আখের খেতের পারে, কদলী সুপারি
নিবিড় বাঁশের বন, মাঝখানে তারি
বিশ্রাম করিছে গ্রাম, হোথা আঁখি ধায়।
হোথা কোন্‌ গৃহপানে গেয়ে চলে যায়
কোন্‌ রাখালের ছেলে, নাহি ভাবে কিছু,
নাহি চায় শূন্যপানে, নাহি আগুপিছু।

দেখে শুনে মনে পড়ে সেই সন্ধ্যাবেলা
শৈশবের। কত গল্প, কত বাল্যখেলা,
এক বিছানায় শুয়ে মোরা সঙ্গী তিন;

সে কি আজিকার কথা, হল কত দিন।
এখনো কি বৃদ্ধ হয়ে যায় নি সংসার।

ভোলে নাই খেলাধুলা, নয়নে তাহার
আসে নাই নিদ্রাবেশ শান্ত সুশীতল,
বাল্যের খেলানাগুলি করিয়া বদল
পায় নি কঠিন জ্ঞান? দাঁড়ায়ে হেথায়
নির্জন মাঠের মাঝে, নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়,
শুনিয়া কাহার গান পড়ি গেল মনে—

কত শত নদীতীরে, কত আম্রবনে,
কাংস্যঘণ্টা-মুখরিত মন্দিরের ধারে,
কত শস্যক্ষেত্রপ্রান্তে, পুকুরের পাড়ে
গৃহে গৃহে জাগিতেছে নব হাসিমুখ,
নবীন হৃদয়ভরা নব নব সুখ,
কত অসম্ভব কথা, অপূর্ব কল্পনা,
কত অমূলক আশা, অশেষ কামনা,
অনন্ত বিশ্বাস। দাঁড়াইয়া অন্ধকারে
দেখিনু নক্ষত্রালোকে, অসীম সংসারে
রয়েছে পৃথিবী ভরি বালিকা বালক,
সন্ধ্যাশয্যা, মার মুখ, দীপের আলোক।

শৈশবসন্ধ্যা কবিতার Romanized Version:

Dhire dhire bistariche gheri charidhar
Shranti, ar shanti, ar shondhya-ondhokar,
Mayer oncholshomo. Daraye ekaki
Meliye poshchim-pane onimesh ankhi
Stobdho cheye achhi. Aponare mogno kori
Atoler tole, dhire loitechhi vori
Jiboner majhe— ajikar ei chhobi,
Jonoshunyo noditir, ostoman robi,
Mlan murchhatur alo— rodon-orun,
Klanto noyoner jeno drishti shokorun
Sthir bakyohin— ei govir bishad,
Jole sthole chorachore shranti oboshad.
Shohosha uthilo gahi kon-khan hote
Bon-ondhorkhoghono kon grampothe
Jete jete grihomukhe balok-pothik.
Uchchhoshito konthoshor nishchinto nirbhik
Kapiచే shoptom shure, tibro uchchhotan
Shondhyare katiye jeno koribe dukhan.
Dekhite na pai tare. Oi je shummukhe
Prantorer shorborante, dokkhiner mukhe,
Akher khete pare, kodoli shupari
Nibir basher bon, majhkane tari
Bishram koriche gram, hotha ankhi dhay.
Hotha kon grihopane geye chole jay
Kon rakhaler chhele, nahi vhabe kichhu,
Nahi chay shunnyopane, nahi agupichu.
Dekhe shune mone pore sei shondhyabela
Shoishober. Koto golpo, koto balykhela,
Ek bichanay shuye mora shonggi tin;
Se ki ajikar holo koto din.
Ekhono ki briddho hoye jay ni shongshar.
Vole nai kheladhula, noyone tahar
Ase nai nidrabesh shonto sushitol,
Balyer khelanaguli koriya bodol
Pay ni kothin gyan? Daraye hethay
Nirjon mather majhe, nistobdho shondhyay,
Shuniya kahar gan pori gelo mone—
Koto shoto noditire, koto amrobone,
Kangsyo-ghonta-mukhorito mondirer dhare,
Koto shoshhyakhetprante, pukurer pare
Grihe grihe jageche nobo hashimukh,
Nobin hridoyvhora nobo nobo shukh,
Koto oshombhob kotha, opurbo kolpona,
Koto omulok asha, oshesh kamona,
Ononto bishvash. Daraiya ondhokare
Dekhinu nokhotroloke, oshim shongshare
Royeche prithibi vhori balika balok,
Shondhyashojya, mar mukh, diper alok.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • সন্ধ্যার স্তব্ধতা ও বিষাদ: দিনের শ্রান্তি ও শান্তির মাঝে সন্ধ্যার অন্ধকার যখন চারপাশ ঘিরে ধরে, তখন নদীতীরে দাঁড়িয়ে কবির মনে এক গভীর বিষাদ ও উদাসীনতা জাগে।
  • বালক-পথিকের গান ও স্মৃতি: দূর গ্রামের পথ দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় এক বালকের উচ্চস্বরে গান গাওয়া কবিকে তাঁর নিজের হারিয়ে যাওয়া শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
  • শৈশবের অমরত্ব: সংসার যতই প্রাচীন হোক না কেন, পৃথিবীর ধূলিমৃত্তিকায় চিরকাল শিশু-কিশোরদের কৌতূহল, মায়ের স্নেহ, দীপের আলো এবং অপ্রতিরোধ্য স্বপ্ন বেঁচে থাকে—এই শাশ্বত সত্যই এই কবিতার প্রাণ।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (সোনার তরী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত