আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

সোনার তরী কাব্যগ্রন্থের ‘বিম্ববতী’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ (১৮৯৪) কাব্যগ্রন্থের অন্যতম শ্রেষ্ঠ, রূপকথা-আশ্রিত, নাটকীয় ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যঙ্গধর্মী মাস্টারপিস হলো ‘বিম্ববতী’। এই কবিতায় রূপকথার অবয়বে মানুষের মনের গভীরতম অন্ধকার, সতিনের মেয়ের প্রতি হিংসা, পরশ্রীকাতরতা এবং সৌন্দর্যের অবিনশ্বর রূপ অত্যন্ত নিপুণ ও মর্মে গিয়ে পৌঁছানোর মতো ভাষায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:
বিষয়বিবরণ
কবিতার নামবিম্ববতী (রূপকথা)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থসোনার তরী
প্রকাশের তারিখফাল্গুন, ১২৯৮ বঙ্গাব্দ (সোনার তরী কাব্যগ্রন্থভুক্ত)
কবিতার ধরনরূপকথা-নির্ভর, মনস্তাত্ত্বিক ও নাট্যধর্মী গীতি-কবিতা (Fairytale-based, Psychological and Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৮৯৪ সালে প্রকাশিত ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থে মানবমনের নানা জটিল ও অন্ধকার প্রবৃত্তিগুলো রূপকথার মোড়কে অপূর্বভাবে প্রকাশিত হয়েছে। ‘বিম্ববতী’ কবিতায় এক রূপকথার রানীর গল্প বলা হয়েছে, যিনি জাদুময়ী কনকদর্পণের কাছে বারবার জানতে চান ধরাপৃষ্ঠে সবকটি নারীর মধ্যে সবচেয়ে রূপসী কে। দর্পণে প্রতিবারই ভেসে ওঠে সতিনের মেয়ে রাজকন্যা বিম্ববতীর মুখ। রানি তাকে বিষফুলমালা পরিয়ে, বনে পাঠিয়ে এবং নানা উপায়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরিশেষে বিম্ববতীর রাজপুত্রের সাথে বিয়ের ছবি দর্পণে ফুটে উঠলে রানীর হিংসা ও বুকফাটা জ্বালায় প্রাণবায়ু উড়ে যায়, কিন্তু সেই মায়াদর্পণ বা বিম্ববতীর রূপকে একটুও ম্লান করা যায় না—সৌন্দর্যের চিরন্তন ও সত্য রূপের এটাই পরম জয়।

বিম্ববতী কবিতা (সম্পূর্ণ)

সযত্নে সাজিল রানী, বাঁধিল কবরী,
নবঘনস্নিগ্ধবর্ণ নব নীলাম্বরী
পরিল অনেক সাধে। তার পরে ধীরে
গুপ্ত আবরণ খুলি আনিল বাহিরে
মায়াময় কনকদর্পণ। মন্ত্র পড়ি
শুধাইল তারে— কহো মোরে সত্য করি
সর্বশ্রেষ্ঠ রূপসী কে ধরায় বিরাজে।

ফুটিয়া উঠিল ধীরে মুকুরের মাঝে
মধুমাখা হাসি-আঁকা একখানি মুখ,
দেখিয়া বিদারি গেল মহিষীর বুক—
রাজকন্যা বিম্ববতী সতিনের মেয়ে,
ধরাতলে রূপসী সে সবাকার চেয়ে।

তার পরদিন রানী প্রবালের হার
পরিল গলায়। খুলি দিল কেশভার
আজানুচুম্বিত। গোলাপি অঞ্চলখানি,
লজ্জার আভাস-সম, বক্ষে দিল টানি।
সুবর্ণমুকুর রাখি কোলের উপরে
শুধাইল মন্ত্র পড়ি— কহো সত্য করে
ধরামাঝে সব চেয়ে কে আজি রূপসী।
দর্পণে উঠিল ফুটে সেই মুখশশী।
কাঁপিয়া কহিল রানী, অগ্নিসম জ্বালা—
পরালেম তারে আমি বিষফুলমালা,
তবু মরিল না জ্বলে সতিনের মেয়ে,
ধরাতলে রূপসী সে সকলের চেয়ে!

তার পরদিনে— আবার রুধিল দ্বার
শয়নমন্দিরে। পরিল মুক্তার হার,
ভালে সিন্দূরের টিপ, নয়নে কাজল,
রক্তাম্বর পট্টবাস, সোনার আঁচল।
শুধাইল দর্পণেরে— কহো সত্য করি
ধরাতলে সব চেয়ে কে আজি সুন্দরী।
উজ্জ্বল কনকপটে ফুটিয়া উঠিল
সেই হাসিমাখা মুখ। হিংসায় লুটিল
রানী শয্যার উপরে। কহিল কাঁদিয়া—
বনে পাঠালেম তারে কঠিন বাঁধিয়া,
এখনো সে মরিল না সতিনের মেয়ে,
ধরাতলে রূপসী সে সবাকার চেয়ে!

তার পরদিনে— আবার সাজিল সুখে
নব অলংকারে; বিরচিল হাসিমুখে
কবরী নূতন ছাঁদে বাঁকাইয়া গ্রীবা,
পরিল যতন করি নবরৌদ্রবিভা
নব পীতবাস। দর্পণ সম্মুখে ধরে
শুধাইল মন্ত্র পড়ি— সত্য কহো মোরে
ধরামাঝে সব চেয়ে কে আজি রূপসী।
সেই হাসি সেই মুখ উঠিল বিকশি
মোহনমুকুরে। রানী কহিল জ্বলিয়া—
বিষফল খাওয়ালেম তাহারে ছলিয়া,
তবুও সে মরিল না সতিনের মেয়ে,
ধরাতলে রূপসী সে সকলের চেয়ে!

তার পরদিনে রানী কনকরতনে
খচিত করিল তনু অনেক যতনে।
দর্পণেরে শুধাইল বহু দর্পভরে—
সর্বশ্রেষ্ঠ রূপ কার বল্‌ সত্য করে।
দুইটি সুন্দর মুখ দেখা দিল হাসি—
রাজপুত্র রাজকন্যা দোঁহে পাশাপাশি
বিবাহের বেশে। অঙ্গে অঙ্গে শিরা যত

রানীরে দংশিল যেন বৃশ্চিকের মতো।
চীৎকারি কহিল রানী কর হানি বুকে
মরিতে দেখেছি তারে আপন সম্মুখে
কার প্রেমে বাঁচিল সে সতিনের মেয়ে,
ধরাতলে রূপসী সে সকলের চেয়ে!
ঘষিতে লাগিল রানী কনকমুকুর
বালু দিয়ে— প্রতিবিম্ব না হইল দূর।
মসী লেপি দিল তবু ছবি ঢাকিল না।

অগ্নি দিল তবুও তো গলিল না সোনা।
আছাড়ি ফেলিল ভূমে প্রাণপণ বলে,
ভাঙিল না সে মায়া-দর্পণ। ভূমিতলে
চকিতে পড়িল রানী, টুটি গেল প্রাণ—
সর্বাঙ্গে হীরকমণি অগ্নির সমান
লাগিল জ্বলিতে। ভূমে পড়ি তারি পাশে
কনকদর্পণে দুটি হাসিমুখ হাসে।
বিম্ববতী, মহিষীর সতিনের মেয়ে
ধরাতলে রূপসী সে সকলের চেয়ে।

ফাল্গুন, ১২৯৮।

বিম্ববতী কবিতার Romanized Version:

Sojotne sajil rani, bandhilo kobori,
Noboghonosnigdho-borno nobo nilambori
Porilo onek sadhe. Tar pore dhire
Gupto aboron khuli anilo bahire
Mayamoy konok-dorpon. Montro pori
Shudhal tare— koho more shotyo kori
Shorboshreshtho ruposhi ke dhoray biraje.
Futiya uthile dhire mukurer majhe
Modhumakha hashi-anka ekhani mukh,
Dekhiya bidari gelo mohishir buk—
Rajkonya Bimboboti shotiner meye,
Dhoratole ruposhi se shobakar cheye.
Tar pordin rani probaler har
Porilo golay. Khuli dil keshbhar
Ajanuchumbito. Golapi oncholkhani,
Lojjar avhash-shomo, bokke dil tani.
Suborno-mukur rakhi koler upore
Shudhal montro pori— koho shotyo kore
Dhoramajhe shob cheye ke aji ruposhi.
Dorpone uthile fute shei mukh-shoshi.
Kapiye kohilo rani, ognisomo jwala—
Poralem tare ami bisho-fulmala,
Tobu morilo na jole shotiner meye,
Dhoratole ruposhi se shokoler cheye!
Tar pordine— abar rudhilo dwar
Shoyonmondire. Porilo muktar har,
Bhale shindurer tip, noyone kajol,
Roktombor pottobash, shonar onchol.
Shudhal dorponere— koho shotyo kori
Dhoratole shob cheye ke aji shundori.
Ujjwol konokpote futiya uthilo
Sei hashimakha mukh. Hingsay lutilo
Rani shoyjar upore. Kohilo kaddiya—
Bone pathalem tare kothin bandhiya,
Ekhono se morilo na shotiner meye,
Dhoratole ruposhi se shobakar cheye!
Tar pordine— abar sajil sukhe
Nobo olongkare; birochilo hashimukhe
Kobori nuton chhade bankiya griba,
Porilo joton kori noboroudro-bibha
Nobo pitobash. Dorpon shummukhe dhore
Shudhal montro pori— shotyo koho more
Dhoramajhe shob cheye ke aji ruposhi.
Sei hashi sei mukh uthilo bikoshi
Mohon-mukure. Rani kohilo joliya—
Bishfol khawolem tahare choliya,
Tobu-o se morilo na shotiner meye,
Dhoratole ruposhi se shokoler cheye!
Tar pordine rani konok-rotone
Khochito korilo tonu onek jotone.
Dorponere shudhal bohu dorpovhore—
Shorboshreshtho rup kar bolo shotyo kore.
Duiti shundor mukh deka dil hashi—
Rajputro rajkonya dohe pashapashi
Bibaher beshe. Onge onge shira joto
Rani-re donshilo jeno brischiker moto.
Chitchari kohilo rani kor hani buke
Morite dekhechhe tare apon shummukhe
Kar preme bachhilo se shotiner meye,
Dhoratole ruposhi se shokoler cheye!
Ghoshite lagilo rani konok-mukur
Balu diye— protibimb na hoilo dur.
Moshi lepi dil tobu chobi dhakilo na.
Aogni dil tobu-o to golilo na shona.
Achhari felilo vhume pranpon bole,
Bhangilo na se maya-dorpon. Bhumitole
Chokite porilo rani, tuti gelo pran—
Shorbonge hirkomoni ognir shoman
Lagilo joliye. Vhume pori tari pashe
Konok-dorpone duti hashimukh hase.
Bimboboti, mohishir shotiner meye
Dhoratole ruposhi se shokoler cheye.
Falgun, 1298.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • অহংকার ও অন্ধ হিংসার রূপ: রানী তার রূপের অহংকারে অন্ধ হয়ে রাজকন্যা বিম্ববতীকে সহ্য করতে পারে না এবং তাকে একে একে নানা উপায়ে ধ্বংস করতে চেয়েও ব্যর্থ হয়।
  • সৌন্দর্যের অবিনশ্বরতা: মায়াদর্পণের প্রতীকী অর্থে সত্য ও সুন্দরের রূপকে কোনোমতেই মুছে ফেলা যায় না। যতই হিংসার আগুন জ্বালানো হোক না কেন, বিম্ববতীর রূপ ও প্রেম অক্ষুণ্ণ থাকে।
  • হিংসার আত্মঘাতী পরিণতি: অন্যের প্রতি তীব্র হিংসা ও পরশ্রীকাতরতা যে শেষ পর্যন্ত মানুষকে নিজের ভেতর থেকেই পুড়িয়ে মেরে ধ্বংস করে দেয়, এই রূপকটিই এই কবিতার মূল উপজীব্য।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (সোনার তরী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত