বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পরিশেষ’ (১৯৩২) কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর দার্শনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক কবিতা হলো ‘প্রাণ’। এই কবিতায় অনন্ত মহাবিশ্বের বিশাল পটভূমিতে মানবপ্রাণের ক্ষুদ্রতা সত্ত্বেও তার অসীম গুরুত্ব ও তাৎপর্যের কথা অত্যন্ত চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। (উল্লেখ্য, কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থে কবির ‘প্রাণ’ নামের আরেকটি বিখ্যাত কবিতা থাকলেও এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং ভাবগাম্ভীর্যে অনন্য)।

কবিতার মূল তথ্য
বিষয়বিবরণ
কবিতার নামপ্রাণ
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থপরিশেষ
প্রকাশের বছর১৯৩২ (১৩৩৯ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনদার্শনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক কবিতা (Philosophical and Scientific Poem)
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯৩২ সালে প্রকাশিত ‘পরিশেষ’ কাব্যগ্রন্থে কবির মৃত্যুচেতনা এবং মহাবিশ্বের বিশালতার মাঝে মানুষের ক্ষুদ্র অস্তিত্বের উপলব্ধি গভীরভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ‘প্রাণ’ কবিতায় কবি বলেছেন যে, এই কোটি কোটি বছর ধরে চলা বিশাল অন্ধকার মহাবিশ্বের তুলনায় আমাদের পৃথিবী একটি সামান্য মাটির বুদবুদ মাত্র। আর সেখানে মানুষের প্রাণ বা অস্তিত্ব সময়ের হিসেবে অতি ক্ষুদ্র এবং আলোকের হিসেবে এক কণা শিখা মাত্র। কিন্তু এই অতি ক্ষুদ্র প্রাণ বা চেতনা না থাকলে বিশাল মহাবিশ্বের কোনো অর্থই থাকত না। মানুষের প্রাণই তার চেতনা দিয়ে মহাবিশ্বের এই নীরব সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করে এবং তার সার্থকতা প্রমাণ করে।

প্রাণ – সম্পূর্ণ কবিতা

বহু লক্ষ বর্ষ ধরে জ্বলে তারা,

              ধাবমান অন্ধকার কালস্রোতে

                    অগ্নির আবর্ত ঘুরে ওঠে।

      সেই স্রোতে এ ধরণী মাটির বুদ্‌বুদ্‌;

           তারি মধ্যে এই প্রা’ণ

                 অণুতম কালে

      কণাতম শিখা লয়ে

                 অসীমের করে সে আরতি।

      সে না হলে বিরাটের নিখিলমন্দিরে

                 উঠত না শঙ্খধ্বনি,

               মিলত না যাত্রী কোনোজন,

      আলোকের সামমন্ত্র ভাষাহীন হয়ে

                 রইত নীরব।

Amar Rabindranath Logo

 

Romanized Version
Bohu lokkho borsho dhore jwole tara,
Dhaboman ondhokar kaloshrote
Ognir aborto ghure othe.
Shei srote e dhoroni matir budbud;
Tari modhye ei pran
Onutomo kale
Konatomo shikha loye
Oshimer kore she aroti.
She na hole birater nikhilmondire
Uthto na shongkhodhwoni,
Milto na jatri konojon,
Aloker shamomontro bhashahin hoye
Roito nirob.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • মহাবিশ্বের বিশালতা ও পৃথিবীর ক্ষুদ্রতা:

“বহু লক্ষ বর্ষ ধরে জ্বলে তারা, / ধাবমান অন্ধকার কালস্রোতে… সেই স্রোতে এ ধরণী মাটির বুদ্‌বুদ্‌;”
— কোটি কোটি বছর ধরে এই অন্ধকার অনন্ত মহাকাশে নক্ষত্ররা জ্বলছে এবং আগুনের আবর্ত ঘুরছে। সেই বিশাল অনন্ত কালস্রোত ও মহাবিশ্বের তুলনায় আমাদের এই পৃথিবী কেবল একটি ক্ষণস্থায়ী মাটির বুদবুদ মাত্র।

  • প্রাণের ক্ষুদ্রতা অথচ অসীমের বন্দনা:
“তারি মধ্যে এই প্রাণ / অণুতম কালে / কণাতম শিখা লয়ে / অসীমের করে সে আরতি।”
— পৃথিবীর এই বুদবুদে মানুষের প্রাণ বা অস্তিত্ব সময়ের নিরিখে অতি ক্ষুদ্র এবং শক্তির দিক দিয়ে এক ক্ষুদ্রতম শিখা মাত্র। কিন্তু এই ক্ষুদ্র প্রাণই তার চেতনা ও বুদ্ধি দিয়ে সেই অসীম মহাবিশ্বের আরতি বা বন্দনা করে।
  • প্রাণের অপরিহার্যতা ও মহাবিশ্বের সার্থকতা:
“সে না হলে বিরাটের নিখিলমন্দিরে / উঠত না শঙ্খধ্বনি… আলোকের সামমন্ত্র ভাষাহীন হয়ে / রইত নীরব।”
— মহাবিশ্ব যত বিশালই হোক না কেন, যদি এই প্রাণ বা চেতনার অস্তিত্ব না থাকত, তবে সেই বিশালতার কোনো দর্শক বা যাত্রী থাকত না। আলোর যে অপার্থিব নীরব মন্ত্র মহাকাশে ধ্বনিত হচ্ছে, প্রাণ বা মানবচেতনা না থাকলে তা উপলব্ধি করার কেউ থাকত না, তা সম্পূর্ণ ভাষাহীন ও অর্থহীন হয়ে থাকত।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পরিশেষ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও আপনার দেওয়া পূর্বনির্ধারিত বিন্যাস অনুযায়ী উপস্থাপিত হয়েছে। (বি.দ্র. পাঠের সাবলীলতা ও প্রামাণ্য রূপ বজায় রাখতে আপনার প্রদত্ত শিরোনাম ও টেক্সটের ভেতরের ইংরেজি অংশ, ‘প্রা’ণ’ শব্দের অনাকাঙ্ক্ষিত অ্যাপোস্ট্রফি এবং ‘আরও দেখুন’ জাতীয় অপ্রাসঙ্গিক অংশ পরিহার করে মূল প্রামাণ্য রূপটি তুলে ধরা হয়েছে)।

মন্তব্য করুন