বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘উৎসর্গ’ (১৯১৪) কাব্যগ্রন্থের অন্যতম গভীর দর্শনমূলক এবং বহুল পরিচিত একটি কবিতা (এবং গান) হলো ‘ধূপ আপনারে মিলাইতে চাহে গন্ধে’। এই কবিতায় সীমা ও অসীমের, রূপ ও অরূপের এবং বন্ধন ও মুক্তির চিরন্তন দ্বান্দ্বিক ঐক্যের কথা বলা হয়েছে। বিপরীতমুখী দুটি সত্তার একে অপরের প্রতি এই শাশ্বত আকর্ষণই সৃষ্টির মূল ভিত্তি।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামধূপ আপনারে মিলাইতে চাহে গন্ধে
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থউৎসর্গ
প্রকাশের বছর১৯১৪ (১৩২১ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনদার্শনিক, আধ্যাত্মিক ও রূপকধর্মী গীতি-কবিতা (Philosophical, Spiritual and Allegorical Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯১৪ সালে প্রকাশিত ‘উৎসর্গ’ কাব্যগ্রন্থে কবি অসীম ও সসীমের, রূপ ও অরূপের এক গভীর দার্শনিক মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। এই কবিতায় (যা একটি বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীতও বটে) বিপরীতমুখী দুটি সত্তার চিরন্তন আকর্ষণের কথা বলা হয়েছে। ধূপ যেমন নিজের সত্তা পুড়িয়ে গন্ধে বিলীন হতে চায়, তেমনি গন্ধও চায় ধূপের আশ্রয়ে থাকতে। একইভাবে সুর ও ছন্দ, ভাব ও রূপ এবং সসীম ও অসীম একে অপরের পরিপূরক হতে চায়। সৃষ্টি ও ধ্বংসের (প্রলয়ে সৃজনে) এই শাশ্বত নিয়মে মুক্তি যেমন বন্ধন ছাড়া অর্থহীন, তেমনি সীমার মাঝেই অসীমের প্রকৃত প্রকাশ ঘটে।

ধূপ আপনারে মিলাইতে চাহে গন্ধে – সম্পূর্ণ কবিতা

ধূপ আপ-নারে মিলাইতে চাহে গন্ধে,

      গন্ধ সে চাহে ধূপেরে রহিতে জুড়ে।

সুর আপনারে ধরা দিতে চাহে ছন্দে,

      ছন্দ ফিরিয়া ছুটে যেতে চায় সুরে।

ভাব পেতে চায় রূপের মাঝারে অঙ্গ,

      রূপ পেতে চায় ভাবের মাঝারে ছাড়া।

অসীম সে চাহে সীমার নিবিড় সঙ্গ,

      সীমা চায় হতে অসীমের মাঝে হারা।

প্রলয়ে সৃজনে না জানি এ কার যুক্তি,

      ভাব হতে রূপে অবিরাম যাওয়া-আসা,

বন্ধ ফিরিছে খুঁজিয়া আপন মুক্তি,

      মুক্তি মাগিছে বাঁধনের মাঝে বাসা।

 

Amar Rabindranath Logo

Romanized Version

Dhup aponare milaite chahe gondhe,
Gondho she chahe dhupere rohite jure.
Shur aponare dhora dite chahe chhende,
Chhondo phiriya chhute jete chay shure.
Bhab pete chay ruper majhare ongo,
Rup pete chay bhaber majhare chhara.
Oshim she chahe shimar nibiro shongo,
Shima chay hote oshimer majhe hara.
Proloye srijone na jani e kar jukti,
Bhab hote rupe obiram jawa-asha,
Bondho phirichhe khunjiya apon mukti,
Mukti magichhe bandhoner majhe basha.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • ধূপ ও গন্ধ, সুর ও ছন্দ (পরস্পরের পরিপূরক):
“ধূপ আপনারে মিলাইতে চাহে গন্ধে, / গন্ধ সে চাহে ধূপেরে রহিতে জুড়ে। / সুর আপনারে ধরা দিতে চাহে ছন্দে, / ছন্দ ফিরিয়া ছুটে যেতে চায় সুরে।”
— ধূপ যেমন নিজেকে পুড়িয়ে সুগন্ধে ছড়িয়ে দিতে চায়, আবার সেই সুগন্ধ ধূপের অস্তিত্বকেই জড়িয়ে থাকতে চায়—তেমনি সুর নিজেকে ছন্দের কাঠামোয় বাঁধতে চায়, আর ছন্দ চায় সুরের মাঝে মিশে যেতে। এরা একে অপরের পরিপূরক।
  • রূপ ও অরূপের মিলন:
“ভাব পেতে চায় রূপের মাঝারে অঙ্গ, / রূপ পেতে চায় ভাবের মাঝারে ছাড়া।”
— নিরাকার ভাব (abstract thought) চায় একটি বাস্তব রূপ বা শরীর (অঙ্গ) পেতে। অন্যদিকে, বাস্তব রূপ চায় তার সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে ভাবের অসীমতায় মিশে যেতে বা মুক্তি পেতে।
  • সীমা ও অসীমের চিরন্তন টান:
“অসীম সে চাহে সীমার নিবিড় সঙ্গ, / সীমা চায় হতে অসীমের মাঝে হারা। / প্রলয়ে সৃজনে না জানি এ কার যুক্তি… বন্ধ ফিরিছে খুঁজিয়া আপন মুক্তি, / মুক্তি মাগিছে বাঁধনের মাঝে বাসা।”
— অসীম সত্তা (ঈশ্বর বা অনন্ত) চায় সীমার (সৃষ্টি বা মানুষের) মাঝে নিবিড়ভাবে ধরা দিতে। আর সসীম মানুষ চায় তার ক্ষুদ্র গণ্ডি পেরিয়ে অসীমের মাঝে হারিয়ে যেতে। সৃষ্টি ও ধ্বংসের এই অবিরাম যাতায়াত মূলত বন্ধন ও মুক্তিরই এক চিরন্তন খেলা, যেখানে মানুষ যেমন মুক্তি খোঁজে, তেমনি পরম মুক্তিও চায় প্রেমের বাঁধনের মাঝেই নিজের স্থায়ী বাসা তৈরি করতে।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও আপনার দেওয়া পূর্বের বিন্যাস অনুযায়ী উপস্থাপিত হয়েছে। (বি.দ্র. পাঠের সাবলীলতা ও প্রামাণ্য রূপ বজায় রাখতে আপনার প্রদত্ত শিরোনাম ও টেক্সটের ভেতরের অনাকাঙ্ক্ষিত হাইফেনগুলো যেমন ‘আপ-নারে’, ‘কবি-তা’ ইত্যাদি পরিহার করে মূল প্রামাণ্য রূপটি তুলে ধরা হয়েছে)।

মন্তব্য করুন