আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

আকাশ প্রদীপ কাব্যগ্রন্থের ‘আমগাছ’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আকাশ প্রদীপ’ (১৯৩৯) কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম গভীর প্রকৃতি-মনস্ক, রহস্যময় ও আত্মমগ্ন কবিতা হলো ‘আমগাছ’। এই কবিতায় শীতের অঘ্রানের স্তব্ধতার মাঝে কবির জানালার সামনের একটি আমগাছের সাথে মানুষের চেতনাতীত ও নিগূঢ় যোগ এবং প্রকৃতির অন্তরালে লুকিয়ে থাকা এক পরম রহস্যের অপূর্ব কাব্যিক রূপ ফুটে উঠেছে।

কবিতার মূল তথ্য
বিষয়বিবরণ
কবিতার নামআমগাছ
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থআকাশ প্রদীপ
প্রকাশের বছর১৯৩৯ (১৩৪৬ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনপ্রকৃতি-চেতনানির্ভর ও মননশীল গীতি-কবিতা (Nature-conscious and Contemplative Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯৩৯ সালে প্রকাশিত ‘আকাশ প্রদীপ’ কাব্যগ্রন্থটি কবির স্মৃতিকাতরতা ও নিসর্গপ্রীতির এক অনন্য দলিল। এই গ্রন্থের বেশিরভাগ কবিতায় কবি তাঁর ফেলে আসা শৈশব, পল্লিপ্রকৃতি এবং গাছপালার সাথে প্রাণের এক সুক্ষ্ম যোগ অনুভব করেছেন। ‘আমগাছ’ কবিতায় অঘ্রান মাসের এক স্তব্ধ বিকেলে কবি সামনের আমগাছটির দিকে চেয়ে দেখছেন—গাছটি বাহ্যিকভাবে স্থির ও নীরব হলেও তার ভেতরে এক অদৃশ্য চঞ্চলতা ও প্রাণের স্পন্দন কাজ করছে, যা মানুষের বুদ্ধির বা ভাষার অতীত।

আমগাছ – সম্পূর্ণ কবিতা

এ তো সহজ কথা,

                          অঘ্রানে এই স্তব্ধ নীরবতা

                     জড়িয়ে আছে সামনে আমার

                                      আমের গাছে;

                          কিন্তু ওটাই সবার চেয়ে

                                      দুর্গম মোর কাছে।

                     বিকেল বেলার রোদ্‌দুরে এই চেয়ে থাকি,

                          যে রহস্য ওই তরুটি রাখল ঢাকি

                                গুঁড়িতে তার ডালে ডালে

                                      পাতায় পাতায় কাঁপনলাগা তালে

                          সে কোন্‌ ভাষা আলোর সোহাগ

                                          শূন্যে বেড়ায় খুঁজি।

                                মর্ম তাহার স্পষ্ট নাহি বুঝি,

                          তবু যেন অদৃশ্য তার চঞ্চলতা

                                      রক্তে জাগায় কানে-কানে কথা,

                          মনের মধ্যে বুলায় যে অঙ্গুলি

                                আভাস-ছোঁওয়া ভাষা তুলি

                                      সে এনে দেয় অস্পষ্ট ইঙ্গিত

                                          বাক্যের অতীত।

                          ওই যে বাকলখানি

                                রয়েছে ওর পর্দা টানি

                     ওর ভিতরের আড়াল থেকে আকাশ-দূতের সাথে

                                বলাকওয়া কী হয় দিনে রাতে,

                          পরের মনের স্বপ্নকথার সম

                                পৌঁছবে না কৌতূহলে মম।

                          দুয়ার-দেওয়া যেন বাসরঘরে

                     ফুলশয্যার গোপন রাতে কানাকানি করে,

                                অনুমানেই জানি,

                          আভাসমাত্র না পাই তাহার বাণী।

                     ফাগুন আসে বছরশেষের পারে,

                                দিনে-দিনেই খবর আসে দ্বারে।

                     একটা যেন চাপা হাসি কিসের ছলে

                                অবাক শ্যামলতার তলে

                     শিকড় হতে শাখে শাখে

                                ব্যাপ্ত হয়ে থাকে।

                     অবশেষে খুশির দুয়ার হঠাৎ যাবে খুলে

                                মুকুলে মুকুলে।

Amar Rabindranath Logo

Romanized Version
E to shohojo kotha,
Oghrane ei sthobdo nirobota
Joriye achhe shamne amar
Amer gachhe;
Kintu otai shobar cheye
Durgom mor kache।
Bikel belar roddure ei cheye thaki,
Je rohosyo oi toruti rakhlo dhaki
Gundite tar dale dale
patay patay kapanlaga tale
Se kon bhasha alor shohag
Shunye beray khuji।
Mormo tahar sporsho nahi bujhi,
Tobu jeno odrishyo tar choncholata
Rokte jagay kane-kane kotha,
Moner modhye bulay je onguli
Abhash-chhowa bhasha tuli
Se ene dey osposhto ingito
Bakyher otit।
                              Oi je bakal-khani
                                    Royechhe or porda tani
                Or bhiterer aral theke akash-duter shathe
                              Bolokowa ki hoy dine rate,
                        Porer moner shopnokothar shomo
                                    Pounchhbe na koutuhale momo।
                Duar-dewa jeno bashorghore
                Phulshojyar gopon rate kanakani kore,
                              Anumanei jani,
                        Abhashmatro na pai tahar bani।
                Fagun ashe bochorshosher pare,
                              Dine-dinei khobor ashe dware।
                Ekta jeno chapa hashi kiser chhole
                              Obak shomomaltar tole
                Shikor hote shakhe shakhe
                              Byapto hoye thake।
                Obosheshe khusir duar hothat jabe khule
                              Mukule mukule।
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
  • নীরবতার অন্তরালে রহস্য:
    “এ তো সহজ কথা, / অঘ্রানে এই স্তব্ধ নীরবতা / জড়িয়ে আছে সামনে আমার / আমের গাছে; / কিন্তু ওটাই সবার চেয়ে / দুর্গম মোর কাছে।”
    — বাহ্যিকভাবে অঘ্রান মাসের দুপুরের স্তব্ধতায় আমগাছটিকে সাধারণ ও স্থির বলে মনে হলেও, কবির কাছে এই গাছটির সত্তা অত্যন্ত রহস্যময় ও দুর্গম।
  • প্রকৃতির সাথে প্রাণের অবোধ্য ভাষা:
    “মর্ম তাহার স্পষ্ট নাহি বুঝি, / তবু যেন অদৃশ্য তার চঞ্চলতা / রক্তে জাগায় কানে-কane কথা… সে এনে দেয় অস্পষ্ট ইঙ্গিত বাক্যের অতীত।”
    — গাছটির সাথে বাতাসের বা আলোর যে ভাবের আদান-প্রদান চলে, তার সঠিক অর্থ মানুষের ভাষা দিয়ে পুরোপুরি বোঝা যায় না। কিন্তু তার অস্পষ্ট ইঙ্গিত ও অদৃশ্য চঞ্চলতা কবির রক্তের স্পন্দনে এক অদ্ভুত অনুভূতি জাগিয়ে তোলে, যা কথার অতীত।
  • গোপন বাসরঘরের মতো আড়াল:
    “দুয়ার-দেওয়া যেন বাসরঘরে / ফুলশয্যার গোপন রাতে কানাকানি করে, / অনুমানেই জানি, / আভাসমাত্র না পাই তাহার বাণী।”
    — গাছটির ছাল বা বাকল যেন এক গভীর পর্দার মতো তার ভেতরের জগতকে ঢেকে রেখেছে। আকাশ বা প্রকৃতির সাথে গাছটির যে অবিরাম গোপন কথা চলে, তা যেন বাসরঘরের গোপনীয়তার মতো—বাইরে থেকে কেবল অনুমানই করা যায়, তার পূর্ণ বাণী সাধারণের নাগালের বাইরে।
  • ফাগুনের আগমন ও মুকুলে মুকুলে আনন্দ:
    “ফাগুন আসে বছরশেষের পারে… অবশেষে খুশির দুয়ার হঠাৎ যাবে খুলে / মুকুলে মুকুলে।”
    — শীতের স্তব্ধতা কাটিয়ে ফাগুনে যখন বসন্ত আসে, তখন সেই অবাক শ্যামলতার তলে লুকিয়ে থাকা প্রাণের আনন্দ হঠাৎ করেই আমের মুকুলে মুকুলে ফেটে পড়ে এবং সমস্ত গাছটি খুশিতে ভরে ওঠে। প্রকৃতির এই অন্তহীন জীবনরহস্যই কবিতার মূল দর্শন।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (আকাশ প্রদীপ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও আপনার দেওয়া পূর্বনির্ধারিত বিন্যাস অনুযায়ী কোনো অংশ বাদ না দিয়ে সম্পূর্ণভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত