বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আকাশ প্রদীপ’ (১৯৩৯) কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত গভীর মনস্তাত্ত্বিক, আত্মোপলব্ধিমূলক ও মর্মস্পর্শী কবিতা হলো ‘বঞ্চিত’। এই কবিতায় রাজসভার সম্মান, খ্যাতি ও বাহবা পাওয়ার পরেও জীবনের প্রকৃত সরল আনন্দ, প্রেমের নিভৃত সৌরভ এবং সাধারণ সুন্দরের কাছে কবি নিজেকে কীভাবে বঞ্চিত বলে অনুভব করেছেন, তার এক অপূর্ব কাব্যিক চিত্র ফুটে উঠেছে।
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | বঞ্চিত |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | আকাশ প্রদীপ |
| প্রকাশের বছর | ১৯৩৯ (১৩৪৬ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মকথনমূলক গীতি-কবিতা (Psychological and Confessional Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৯৩৯ সালে প্রকাশিত ‘আকাশ প্রদীপ’ কাব্যগ্রন্থে কবিজীবনের সায়াহ্নে এসে স্মৃতিকাতরতা এবং জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির এক গভীর মূল্যায়ণ দেখা যায়। ‘বঞ্চিত’ কবিতায় দেখানো হয়েছে যে বাহ্যিক জগতের যশের মুকুট, রাজার দেওয়া মণিমালা এবং সভার পন্ডিত ও গুণীজনদের সংবর্ধনা মানুষকে কৃত্রিম খ্যাতিতে ভূষিত করতে পারে, কিন্তু জীবনের অন্তরঙ্গ ও সহজ সুখের ভান্ডার থেকে সে অনেক সময় বঞ্চিতই থেকে যায়। রাজসভার সম্মান পেরিয়ে ঘরে ফেরার পথে এক সাধারণ তরুণীর জানালার পাশের স্নিগ্ধ দৃশ্য দেখে কবির মনে যে উপলব্ধির জন্ম হয়, সেটাই এই কবিতার মূল চেতনা।
বঞ্চিত – সম্পূর্ণ কবিতা
রাজসভাতে ছিল জ্ঞানী,
ছিল অনেক গুণী।
কবির মুখে কাব্যকথা শুনি
ভাঙল দ্বিধার বাঁধ,
সমস্বরে জাগল সাধুবাদ।
উষ্ঞীষেতে জড়িয়ে দিল
মণিমালার মান,
স্বয়ং রাজার দান।
রাজধানীময় যশের বন্যাবেগে
নাম উঠল জেগে।
দিন ফুরাল। খ্যাতিক্লান্ত মনে
যেতে যেতে পথের ধারে
দেখল বাতায়নে,
তরুণী সে, ললাটে তার
কুঙ্কুমেরি ফোঁটা,
অলকেতে সদ্য অশোক ফোটা।
সামনে পদ্মপাতা,
মাঝখানে তার চাঁপার মালা গাঁথা,
সন্ধেবেলার বাতাস গন্ধে ভরে।
নিশ্বাসিয়া বললে কবি,
এই মালাটি নয় তো আমার তরে।
Din phuralo. Khyatiklanto mone
jete jete pother dhare
dekhe batayone,
Toruni she, lolate tar
kunkumeri fhota,
Alokete shodyo ashok fhota.
Samne podmpata,
Majhkane tar champar mala gantha,
Shondhebelar batas gondhe bhore.
Nishshiya boleche kobi,
Ei malati noy to amar tore.
- রাজসভার খ্যাতি ও যশের মুকুট:“রাজসভাতে ছিল জ্ঞানী, / ছিল অনেক গুণী। / কবির মুখে কাব্যকথা শুনি… স্বয়ং রাজার দান। / রাজধানীময় যশের বন্যাবেগে / নাম উঠল জেগে।”— রাজসভায় পন্ডিত ও গুণীজনদের ভিড়ে কবি যখন তাঁর কাব্যকথা শুনিয়েছিলেন, তখন চারপাশের দ্বিধা ভেঙে সাধুবাদের জোয়ার বয়ে গিয়েছিল। রাজার পক্ষ থেকে উষ্ণীষে বা মাথায় মণিমালার সম্মান জড়িয়ে দেওয়া হয় এবং রাজধানীর সর্বত্র তাঁর যশের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।
- খ্যাতিক্লান্ত মন ও প্রাত্যহিক সুন্দরের মুখোমুখি:“দিন ফুরাল। খ্যাতিক্লান্ত মনে / যেতে যেতে পথের ধারে / দেখল বাতায়নে, / তরুণী সে, ললাটে তার / কুঙ্কুমেরি ফোঁটা, / অলকেতে সদ্য অশোক ফোটা।”— বাহ্যিক এই বাহবা ও সম্মান পাওয়ার পর দিন ফুরিয়ে আসে। খ্যাতিতে ক্লান্ত মন নিয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় কবির নজর পড়ে এক জানালার পাশের দৃশ্যে। সেখানে এক তরুণী বসে আছে, যার কপালে কুঙ্কুমের ফোঁটা এবং চুলে সদ্য ফোটা অশোক ফুল গোঁজা।
- প্রকৃত প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত বোধ:“সামনে পদ্মপাতা, / মাঝখানে তার চাঁপার মালা গাঁথা, / সন্ধেবেলার বাতাস গন্ধে ভরে। / নিশ্বাসিয়া বললে কবি, / এই মালাটি নয় তো আমার তরে।”— পদ্মপাতার ওপর সাজানো চাঁপার মালা এবং সন্ধের সুবাসিত বাতাসে এক স্নিগ্ধ পরিবেশ বিরাজ করছে। কিন্তু রাজসভার মুকুটধারী বিখ্যাত কবি বুঝতে পারেন যে, জীবনের এই স্নিগ্ধ, সহজ ও নিভৃত প্রেমের মালাটি তাঁর জন্য নয়। বাহ্যিক যশ-খ্যাতির আড়ালে জীবনের আসল ও সহজ সুন্দরের আনন্দ থেকে তিনি মূলত চিরবঞ্চিতই রয়ে গেছেন।








