বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সানাই’ (১৯৪০) কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও প্রেমের কবিতা হলো ‘উদ্বৃত্ত’। এই কবিতায় প্রেমের অপূর্ণতা এবং সেই সামান্য প্রাপ্তির মাঝেই সারা জীবনের পূর্ণতার স্বপ্ন খুঁজে পাওয়ার এক অসাধারণ চিত্র ফুটে উঠেছে।

কবিতার মূল তথ্য
বিষয়বিবরণ
কবিতার নামউদ্বৃত্ত
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থসানাই
প্রকাশের বছর১৯৪০ (১৩৪৭ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনপ্রেম ও মনস্তাত্ত্বিক গীতি-কবিতা (Romantic and Psychological Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯৪০ সালে প্রকাশিত ‘সানাই’ কাব্যগ্রন্থে কবি প্রেমের বাস্তব, সূক্ষ্ম ও পরিণত রূপগুলো তুলে ধরেছেন। ‘উদ্বৃত্ত’ কবিতায় বলা হয়েছে, ভালোবাসার মানুষটি যদি তার সমস্ত প্রেম বা সত্তা উজাড় করে সমর্পণ নাও করে, তবুও প্রেমিকের কোনো আক্ষেপ থাকে না। প্রিয়জনের সামান্য একটু স্পর্শ, একটু ইঙ্গিত বা আলো-ছায়ার উপস্থিতিই প্রেমিকের মনের আঙিনায় আলপনা এঁকে যায়। গ্রীষ্মের শুকনো নদী যেমন পূর্ণ স্রোত না দিলেও তীরের তৃষ্ণা জাগিয়ে রাখে, তেমনি ভালোবাসার এই সামান্য উদ্বৃত্ত বা অবশিষ্ট অংশটুকুই প্রেমিকের সারা জীবনের স্বপ্ন ও বেঁচে থাকার পাথেয় হয়ে ওঠে।

উদ্বৃত্ত – সম্পূর্ণ কবিতা

তব দক্ষিণ হাতের পরশ
কর নি সমর্পণ।
লেখে আর মোছে তব আলো ছায়া
ভাবনার প্রাঙ্গণে
খনে খনে আলিপন।
বৈশাখে কৃশ নদী
পূর্ণ স্রোতের প্রসাদ না দিল যদি
শুধু কুণ্ঠিত বিশীর্ণ ধারা
তীরের প্রান্তে
জাগালো পিয়াসি মন।
যতটুকু পাই ভীরু বাসনার
অঞ্জলিতে
নাই বা উচ্ছলিল,
সারা দিবসের দৈন্যের শেষে
সঞ্চয় সে যে
সারা জীবনের স্বপ্নের আয়োজন।

উদ্বৃত্ত কবিতা Romanized Version

Tobo dokkhin hater porosh
Koro ni shomorpon.
Lekhe ar mochhe tobo alo chhaya
Bhabonar pranggone
Khone khone alipon.
Boishakhe krisho nodi
Purno sroter proshad na dilo jodi
Shudhu kunthito bishirno dhara
Tirer prante
Jagalo piyashi mon.
Jototuku pai bhiru bashonar
Onjolite
Nai ba uchchholilo,
Shara dibosher doinyer sheshe
Shonchoy she je
Shara jiboner swopner ayojon.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
  • অপূর্ণতার মাঝে মাধুর্য:
    “তব দক্ষিণ হাতের পরশ / কর নি সমর্পণ। / লেখে আর মোছে তব আলো ছায়া… খনে খনে আলিপন।”
    — প্রিয়জন তার সম্পূর্ণ প্রেম বা সত্তা (দক্ষিণ হাতের পরশ) সমর্পণ করেনি। কিন্তু তার সেই ধরা না দেওয়ার মাঝেও যে আলো-ছায়ার খেলা রয়েছে, তা প্রতিনিয়ত কবির ভাবনার প্রাঙ্গণে ক্ষণে ক্ষণে আলপনা এঁকে দিয়ে যায়।
  • বিশীর্ণ নদীর রূপক ও তৃষ্ণা:
    “বৈশাখে কৃশ নদী / পূর্ণ স্রোতের প্রসাদ না দিল যদি / শুধু কুণ্ঠিত বিশীর্ণ ধারা… জাগালো পিয়াসি মন।”
    — বৈশাখ মাসের শুকনো নদী যেমন তার তীরকে পূর্ণ স্রোতের উপহার দিতে পারে না, কিন্তু তার ওই ক্ষীণ ও কুণ্ঠিত জলের ধারাটি তীরের মনে এক গভীর তৃষ্ণা জাগিয়ে রাখে; ঠিক তেমনি প্রিয়জনের এই সামান্য প্রেমটুকুও কবির হৃদয়ে ভালোবাসার চিরন্তন তৃষ্ণা জাগিয়ে রেখেছে।
  • সামান্য সঞ্চয়ে জীবনের পূর্ণতা:
    “যতটুকু পাই ভীরু বাসনার / অঞ্জলিতে / নাই বা উচ্ছলিল… সঞ্চয় সে যে / সারা জীবনের স্বপ্নের আয়োজন।”
    — ভীরু বাসনার অঞ্জলিতে যেটুকু সামান্য প্রেম জমা হয়, তা উপচে না পড়লেও কবির কোনো দুঃখ নেই। কারণ, সারাদিনের রিক্ততা ও দৈন্যের শেষে প্রিয়জনের দেওয়া ওই সামান্য উদ্বৃত্ত প্রেমটুকুই কবির সারা জীবনের স্বপ্ন দেখার জন্য এক বিশাল সঞ্চয় হয়ে দাঁড়ায়।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (সানাই কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও আপনার দেওয়া পূর্বনির্ধারিত বিন্যাস অনুযায়ী উপস্থাপিত হয়েছে। (বি.দ্র. পাঠের সাবলীলতা ও প্রামাণ্য রূপ বজায় রাখতে আপনার প্রদত্ত শিরোনাম ও টেক্সটের ভেতরের ইংরেজি অংশ এবং ‘উদ্‌’বৃত্ত’ শব্দের অনাকাঙ্ক্ষিত অ্যাপোস্ট্রফি পরিহার করে মূল প্রামাণ্য রূপটি তুলে ধরা হয়েছে)।

মন্তব্য করুন