বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কল্পনা’ কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত করুণরসাত্মক, সঙ্গীতময় ও আত্মরিক্ততার প্রণয়-গীতি কবিতা হলো ‘ভিখারি’। প্রেমাস্পদ ভিখারির অনন্ত চাওয়ার কাছে নিজের হৃদয়, সর্বস্ব ও ভূবন উজাড় করে নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার আর্তি এবং শেষ পর্যন্ত প্রিয়তমের কাছে পুনরায় দান গ্রহণের মাধ্যমেই তাকে আরও দেওয়ার আকুল আরতি এ কবিতায় মূর্ত হয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | ভিখারি |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | কল্পনা (অনলাইন অনুলিপিতে উল্লিখিত ১৯৫২ সালটি কোনো পরবর্তী সংস্করণের হতে পারে; মূল কাব্যগ্রন্থের প্রথম প্রকাশ ১৯০০ সালে) |
| প্রকাশের বছর | ১৯০০ (১৩৭ বঙ্গাব্দ) |
| রাগ ও তাল | ভৈরবী । একতালা |
| কবিতার ধরন | সঙ্গীতধর্মী আধ্যাত্মিক প্রণয়-লিরিক ও গীতি-কবিতা (Musical Devotional Lyric) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
সম্পূর্ণ কবিতা:
ভৈরবী । একতালা
ওগো কাঙাল, আমারে কাঙাল করেছ,
আরো কি তোমার চাই?
ওগো ভিখা’রি, আমার ভিখা’রি, চলেছ
কি কাতর গান গাই’?
প্রতিদিন প্রাতে নব নব ধনে
তুষিব তোমারে সাধ ছিল মনে
ভিখা’রি, আমার ভিখা’রি!
হায় পলকে সকলি সঁপেছি চরণে,
আর তো কিছুই নাই।
ওগো কাঙাল, আমারে কাঙাল করেছ,
আরো কি তোমার চাই?
আমি আমার বুকের আঁচল ঘেরিয়া
তোমারে পরানু বাস,
আমি আমার ভুবন শূন্য করেছি
তোমার পুরাতে আশ।
মম প্রাণমন যৌবন নব
করপুটতলে পড়ে আছে তব,
ভিখা’রি, আমার ভিখা’রি!
হায়, আরো যদি চাও, মোরে কিছু দাও,
ফিরে আমি দিব তাই।
ওগো কাঙাল, আমারে কাঙাল করেছ,
আরো কি তোমার চাই?
সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- ভিখারির অনন্ত দাবি ও আত্মরিক্ততা:“ওগো কাঙাল, আমারে কাঙাল করেছ, / আরো কি তোমার চাই? / ওগো ভিখারি, আমার ভিখারি, চলেছ / কি কাতর গান গাই’?”— প্রিয়তম স্বয়ং এক অতৃপ্ত ভিখারি। তার আকুল চাওয়ার তীব্রতা প্রেমিকাকে সর্বস্বান্ত করে দিয়েছে। প্রিয়ের এই রূপ জাগতিক কোনো দারিদ্র্যের নয়, প্রেমের অতল পিপাসার রূপক।
- সর্বস্ব সমর্পণের অপূর্ণ সাধ:“প্রতিদিন প্রাতে নব নব ধনে / তুষিব তোমারে সাধ ছিল মনে / … হায় পলকে সকলি সঁপেছি চরণে, / আর তো কিছুই নাই।”— প্রেমিকার ইচ্ছা ছিল প্রতিদিন একটু একটু করে নতুন নতুন অর্ঘ্যে প্রিয়াকে বরণ করবে। কিন্তু প্রেমের প্রথম আবেশেই সে এক পলকে নিজেকে নিঃশেষে উৎসর্গ করে ফেলেছে। ফলে এখন তার হাত শূন্য, অথচ প্রেমাস্পদের ভিক্ষাপাত্র এখনো প্রসারিত।
- গ্রহণের মাধ্যমে পুনরায় দানের ব্যাকুলতা:“আমি আমার ভুবন শূন্য করেছি / তোমার পুরাতে আশ। / … হায়, আরো যদি চাও, মোরে কিছু দাও, / ফিরে আমি দিব তাই।”— নিজের আবরণ খুলে প্রিয়াকে বস্ত্র পরিয়ে, নিজের ভুবন শূন্য করে দেওয়ার পরও প্রেমিকার মনে হয় সমর্পণ এখনো পূর্ণ হয়নি। তাই তার অন্তিম আকুলতা—পরমসত্তা যেন তাকে কৃপা করে নতুন সম্পদ দেন, যাতে পুনরায় সেই সম্পদই তাঁর পায়ে অঞ্জলি হিসেবে অর্পণ করা যায়। এই ভাব বৈষ্ণবীয় ‘অহৈতুকী প্রীতি’ ও পূর্ণ আত্মবিলোপের চরম শিখর।
![কল্পনা কাব্যগ্রন্থের ভিখারি কবিতা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1 ভিখারি bhikhari [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/ভিখারি-bhikhari-কবিতা-.gif)