আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থের ‘আবির্ভাব’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষণিকা’ (১৯০০) কাব্যগ্রন্থের অন্যতম একটি রোমান্টিক, ভাবঘন ও বর্ষাস্বভাবের সৃষ্টি হলো ‘আবির্ভাব’। এই কবিতায় ফাল্গুনের বসন্তদিনের প্রতীক্ষা পেরিয়ে বর্ষার মেঘমন্দ্রিত ও রূপসী মূর্তিতে প্রিয়ার বা কল্পনার দেবতার আকস্মিক ও সর্বগ্রাসী উপস্থিতির এক অপূর্ব লিরিক রূপ অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামআবির্ভাব
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থক্ষণিকা
প্রকাশের বছর১৯০০ (বাংলা ১৩০৭)
কবিতার ধরনরোমান্টিক লিরিক ও বর্ষাপ্রকৃতির কবিতা (Romantic Lyric)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যযাত্রায় ‘ক্ষণিকা’ (১৯০০) কাব্যগ্রন্থটি এক লঘু, চটুল অথচ গভীর ভাবরসময় সুর নিয়ে এসেছে। ‘আবির্ভাব’ কবিতায় কবি দেখিয়েছেন যে, ফাল্গুনের ফুলবনে বসে তিনি যার জন্য প্রতীক্ষা করেছিলেন এবং যত ফুলহার গেঁথেছিলেন, সে ফাল্গুনে আসেনি। বরং সে ধরা দিয়েছে আষাঢ়-শ্রাবণের ঘোর ঘন বরষায়, উত্তাল তুমুল ছন্দে ও নবঘন-বিপুল-মন্দ্রিত রূপ নিয়ে। কনকাঞ্চল-আবরণ আর চম্পক-আভরণের সেই কোমল রূপ বদলে এবার সে এসেছে ঘন নীল মেঘের গুণ্ঠনে, চপল বিদ্যুতের চমকে এবং সঘন সজল বিশাল মায়া নিয়ে। কবির ক্ষুদ্র বীণার তারে তার যোগ্য গান না থাকলেও এবং আয়োজনহীন কুটিরে তাকে বরণ করার ত্রুটি থাকলেও, বর্ষার এই মহোৎসবে সেই দেবী বা প্রিয়া এসে কবির হৃদয়কে প্লাবিত করেছে।

আবির্ভাব abirbhab [ কবিতা ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আবির্ভাব কবিতা (সম্পূর্ণ)

বহুদিন হল কোন্‌ ফাল্গুনে

         ছিনু আমি তব ভরসায়;

         এলে তুমি ঘন বরষায়।

আজি উত্তাল তুমুল ছন্দে

আজি নবঘন-বিপুল-মন্দ্রে

আমার পরানে যে গান বাজাবে

          সে গান তোমার করো সায়

          আজি জলভরা বরষায়।

দূরে একদিন দেখেছিনু তব

          কনকাঞ্চল-আবরণ,

          নবচম্পক-আভরণ।

কাছে এলে যবে হেরি অভিনব

ঘোর ঘননীল গুণ্ঠন তব,

চলচপলার চকিত চমকে

          করিছে চরণ বিচরণ।

          কোথা চম্পক-আভরণ!

সেদিন দেখেছি খনে খনে তুমি

          ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেতে বনতল,

          নুয়ে নুয়ে যেত ফুলদল।

শুনেছিনু যেন মৃদু রিনি রিনি

ক্ষীণ কটি ঘেরি বাজে কিংকিণী,

পেয়েছিনু যেন ছায়াপথে যেতে

          তব নিশ্বাসপরিমল,

          ছুঁয়ে যেতে যবে বনতল।

আজি আসিয়াছ ভুবন ভরিয়া

          গগনে ছড়ায়ে এলোচুল,

          চরণে জড়ায়ে বনফুল।

ঢেকেছে আমারে তোমার ছায়ায়

সঘন সজল বিশাল মায়ায়,

আকুল করেছ শ্যাম সমারোহে

          হৃদয়সাগর-উপকূল

          চরণে জড়ায়ে বনফুল।

ফাল্গুনে আমি ফুলবনে বসে

          গেঁথেছিনু যত ফুলহার

          সে নহে তোমার উপহার।

যেথা চলিয়াছ সেথা পিছে পিছে

স্তবগান তব আপনি ধ্বনিছে,

বাজাতে শেখে নি সে গানের সুর

          এ ছোটো বীণার ক্ষীণ তার–

          এ নহে তোমার উপহার।

কে জানিত সেই ক্ষণিকা মুরতি

          দূরে করি দিবে বরষন,

          মিলাবে চপল দরশন?

কে জানিত মোরে এত দিবে লাজ?

তোমার যোগ্য করি নাই সাজ,

বাসর-ঘরের দুয়ারে করালে

          পূজার অর্ঘ্য-বিরচন–

          একি রূপে দিলে দরশন।

ক্ষমা করো তবে ক্ষমা করো মোর

          আয়োজনহীন পরমাদ,

          ক্ষমা করো যত অপরাধ।

এই ক্ষণিকের পাতার কুটিরে

প্রদীপ-আলোকে এসো ধীরে ধীরে,

এই বেতসের বাঁশিতে পড়ুক

          তব নয়নের পরসাদ–

          ক্ষমা করো যত অপরাধ।

আস নাই তুমি নবফাল্গুনে

          ছিনু যবে তব ভরসায়,

          এসো এসো ভরা বরষায়।

এসো গো গগনে আঁচল লুটায়ে,

এসো গো সকল স্বপন ছুটায়ে,

এ পরান ভরি যে গান বাজাবে

          সে গান তোমার করো সায়

          আজি জলভরা বরষায়।

 

Amar Rabindranath Logo

আবির্ভাব কবিতার Romanized Version:

Bohudin holo kon falgune
Chhinu ami tobo vorosay;
Ele tumi ghono boroshay.
Aji uttal tumul chonde
Aji noboghono-bipul-mondre
Amar porane je gan bajabe
She gan tomar koro say
Aji jolvhora boroshay.
Dure ekdin dekhechhinu tobo
Konkonchol-aboron,
Nobochompok-aboron.
Kache ele jobe heri obinobo
Ghor ghononil gunthon tobo,
Cholchopolar chokito chomoke
Koriche choron bichoron.
Kotha chompok-aboron!
Sedin dekhechhi khone khone tumi
Chhuye chhuye jete bontol,
Nue nue jeto fuldol.
Shunechhinu jeno mridu rini rini
Khin koti gheri baje kingkini,
Peyechhinu jeno chhayapothe jete
Tobo nishshash-porimol,
Chhuye jete jobe bontol.
Aji ashiyachho vhubon vhoriya
Gogone choraye elochul,
Chorone joraye bonful.
Dhekechhe amare tomar chhayay
Shoghono sojol bishal mayay,
Akul korechho shyam shomorohe
Hridoysagor-upokul
Chorone joraye bonful.
Falgune ami fulbone bose
Genthechhinu joto fulhar
Se nahe tomar upohar.
Jetha chaliyachho setha piche piche
Stobogan tobo apni dhiniche,
Bajate shekhe ni se ganer shor
E chhoto binar khin tar–
E nahe tomar upohar.
Ke janito sei khonika murti
Dure kori dibe boroshon,
Milabe chopol doroshon?
Ke janito more eto dibe laj?
Tomar joggo kori nai saj,
Bashor-ghorer duyare korale
Pujar orghyo-birochon–
Eki rupe dile doroshon.
Khoma koro tobe khoma koro mor
Ayojonhin poromad,
Khoma koro joto oporadh.
Ei khoniker patar kutire
Prodip-aloke eso dhire dhire,
Ei betoser bashite poruk
Tobo noyoner porsad–
Khoma koro joto oporadh.
Asho nai tumi nobofalgune
Chhinu jabe tobo vorosay,
Eso eso vhora boroshay.
Eso go gogone anchol lutaye,
Eso go sokol shopon chhutaye,
E poran vhori je gan bajabe
She gan tomar koro say
Aji jolvhora boroshay.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
  • বসন্তের প্রতীক্ষা ও বর্ষার রূপায়ণ: বসন্তের ফুল ও ফাল্গুনের সুখস্মৃতির আশা ভেঙে যখন বর্ষার সঘন মেঘ ও বিজলির চমক নেমে আসে, তখন সেই প্রিয়ার আবির্ভাব এক নতুন ও নাটকীয় মাত্রা পায়।
  • বিনম্র আত্মসমর্পণ: কবির ক্ষুদ্র কুটির এবং অপর্যাপ্ত আয়োজনের মাঝেও প্রিয়ার এই মহিমাময় ও সজল উপস্থিতি কবিকে যেমন লজ্জিত করে, তেমনই তার সমগ্র সত্তাকে গভীর প্রেমে ও সুরে নিমগ্ন করে তোলে।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত