খেয়া কাব্যগ্রন্থের ‘বন্দী’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘খেয়া’ (১৯০৬) কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর রূপকধর্মী ও মনস্তাত্ত্বিক দর্শনমূলক কবিতা হলো ‘বন্দী’। এই কবিতায় মানুষের অহংকার, অপরিমিত লোভ এবং ক্ষমতার মোহ কীভাবে শেষ পর্যন্ত মানুষকেই নিজের তৈরি কারাগারে বন্দি করে ফেলে, তার এক অনবদ্য চিত্র ফুটে উঠেছে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামবন্দী
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থখেয়া
প্রকাশের বছর১৯০৬ (১৩১৩ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনরূপকধর্মী, নীতি-দর্শন ও মনস্তাত্ত্বিক কবিতা (Allegorical, Philosophical and Psychological Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯০৬ সালে প্রকাশিত ‘খেয়া’ কাব্যগ্রন্থে আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি মানবচরিত্রের নানা দিক রূপকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। ‘বন্দী’ কবিতায় অহংকার ও ক্ষমতার মোহের এক করুণ পরিণতি দেখানো হয়েছে। মানুষ যখন নিজেকে সবার চেয়ে বড় ভাবতে শুরু করে, অন্যের সম্পদ গ্রাস করে এবং সবাইকে নিজের দাস বানাতে চায়, তখন সে নিজের অজান্তেই নিজের জন্য একটি অদৃশ্য শিকল তৈরি করে। অহংকার ও ক্ষমতার মোহে অন্ধ মানুষ দিনশেষে আবিষ্কার করে যে, সে অন্যকে বাঁধার জন্য যে শিকল তৈরি করেছিল, সেই শিকলই তাকে বন্দি করে ফেলেছে। এটি মূলত মানুষের বস্তুবাদী লালসা এবং তার আত্মঘাতী পরিণতির এক শাশ্বত দর্শন।

বন্দী – সম্পূর্ণ কবিতা

 

“ব’ন্দী, তোরে কে বেঁধেছে

           এত কঠিন ক’রে।’

প্রভু আমায় বেঁধেছে যে

           বজ্রকঠিন ডোরে।

মনে ছিল সবার চেয়ে

           আমিই হব বড়ো,

রাজার কড়ি করেছিলেম

           নিজের ঘরে জড়ো।

ঘুম লাগিতে শুয়েছিলেম

           প্রভুর শয্যা পেতে,

জেগে দেখি বাঁধা আছি

           আপন ভাণ্ডারেতে।

“ব’ন্দী ওগো, কে গড়েছে

           বজ্রবাঁধনখানি।’

আপনি আমি গড়েছিলেম

           বহু যতন মানি।

ভেবেছিলেম আমার প্রতাপ

           করবে জগৎ গ্রাস,

আমি রব একলা স্বাধীন,

           সবাই হবে দাস।

তাই গড়েছি রজনীদিন

           লোহার শিকলখানা–

কত আগুন কত আঘাত

           নাইকো তার ঠিকানা।

গড়া যখন শেষ হয়েছে

           কঠিন সুকঠোর,

দেখি আমায় ব’ন্দী করে

           আমারি এই ডোর।

 

Amar Rabindranath Logo

Romanized Version

“Bondi, tore ke bendhechhe
Eto kothin ko’re.”
Probhu amay bendhechhe je
Bojrokothin dore.
Mone chhilo shobar cheye
Amii hobo boro,
Rajar kori korechhilem
Nijer ghore joro.
Ghum lagite shuyechhilem
Probhur shojja pete,
Jege dekhi bandha achhi
Apon bhandarete.
“Bondi ogo, ke gorechhe
Bojrobandhonkhani.”
Apni ami gorechhilem
Bohu joton mani.
Bhebechhilem amar protap
Korbe jogot grash,
Ami robo ekla shadhin,
Shobai hobe dash.
Tai gorechhi rojonidin
Lohar shikolkhana–
Koto agun koto aghat
Naiko tar thikana.
Gora jokhon shesh hoyechhe
Kothin shukothor,
Dekhi amay bondi kore
Amari ei dor.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • সম্পদের মোহ ও আত্মবন্দিদশা:
“মনে ছিল সবার চেয়ে / আমিই হব বড়ো, / রাজার কড়ি করেছিলেম / নিজের ঘরে জড়ো… জেগে দেখি বাঁধা আছি / আপন ভাণ্ডারেতে।”
— মানুষের যখন সম্পদের মোহ জাগে, তখন সে অহংকারবশত অন্যের বা ঈশ্বরের (রাজার) সম্পদ নিজের ঘরে কুক্ষিগত করে নিজেকে সবচেয়ে বড় ও ক্ষমতাবান মনে করে। কিন্তু এই মোহ তাকে এমনভাবে গ্রাস করে যে, সে নিজের সম্পদের পাহাড়েই বন্দি হয়ে পড়ে এবং তার মানসিক স্বাধীনতা হারিয়ে যায়।
  • ক্ষমতার দম্ভ ও শিকল তৈরি:
“ভেবেছিলেম আমার প্রতাপ / করবে জগৎ গ্রাস, / আমি রব একলা স্বাধীন, / সবাই হবে দাস। / তাই গড়েছি রজনীদিন / লোহার শিকলখানা–“
— ক্ষমতা ও অহংকারে অন্ধ হয়ে মানুষ পুরো জগৎকে গ্রাস করতে চায়। সে চায় নিজে একাই স্বাধীন থাকতে আর বাকি সবাইকে দাস বানিয়ে রাখতে। এই হীন উদ্দেশ্যে সে সারাজীবন কঠোর পরিশ্রমে ও ষড়যন্ত্রে লোহার শিকল বা ক্ষমতার জাল তৈরি করে।
  • আত্মঘাতী পরিণতি:
“গড়া যখন শেষ হয়েছে / কঠিন সুকঠোর, / দেখি আমায় বন্দী করে / আমারি এই ডোর।”
— কবিতার এই চরম সত্যটি মানুষের পতনকে নির্দেশ করে। অন্যের জন্য তৈরি করা ক্ষমতার শিকল বা অহংকারের ফাঁদ শেষ পর্যন্ত মানুষটির নিজেকেই আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। লোভ ও দম্ভের পরিণতি যে কতটা আত্মঘাতী, তা-ই এখানে অত্যন্ত নিপুণভাবে মূর্ত হয়েছে।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (খেয়া কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও আপনার দেওয়া বিন্যাস অনুযায়ী উপস্থাপিত হয়েছে। (বি.দ্র. পাঠের সাবলীলতা ও প্রামাণ্য রূপ বজায় রাখতে আপনার প্রদত্ত শিরোনাম ও টেক্সটের ভেতরের অনাকাঙ্ক্ষিত অ্যাপোস্ট্রফি এবং ইংরেজি অংশগুলো পরিহার করে মূল প্রামাণ্য পাঠটি তুলে ধরা হয়েছে)।

মন্তব্য করুন