বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘খেয়া’ (১৯০৬) কাব্যগ্রন্থের একটি চমৎকার রূপকধর্মী ও গভীর জীবন-দর্শনমূলক কবিতা হলো ‘হারাধন’। এই কবিতায় একটি মহাজাগতিক রূপকথার আশ্রয়ে মানুষের একটি চিরন্তন মনস্তাত্ত্বিক স্বভাবকে তুলে ধরা হয়েছে—যা আছে তার চেয়ে যা নেই বা হারিয়ে গেছে, তার প্রতি মানুষের অকারণ মোহ এবং অপূর্ণতাবোধ।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | হারাধন |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | খেয়া |
| প্রকাশের বছর | ১৯০৬ (১৩১৩ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | রূপকধর্মী ও মনস্তাত্ত্বিক দর্শনমূলক কবিতা (Allegorical, Psychological and Philosophical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
হারাধন – সম্পূর্ণ কবিতা
বিধি যেদিন ক্ষান্ত দিলেন
সৃষ্টি করার কাজে
সকল তারা উঠল ফুটে
নীল আকাশের মাঝে।
নবীন সৃষ্টি সামনে রেখে
সুরসভার তলে
ছায়াপথে দেবতা সবাই
বসেন দলে দলে।
গাহেন তাঁরা, ‘কী আনন্দ!
এ কী পূর্ণ ছবি!
এ কী মন্ত্র, এ কী ছন্দ,
গ্রহ চন্দ্র রবি!’
হেনকালে সভায় কে গো
হঠাৎ বলি উঠে,
‘জ্যোতির মালায় একটি তারা
কোথায় গেছে টুটে!’
ছিঁড়ে গেল বীণার তন্ত্রী,
থেমে গেল গান,
হারা তারা কোথায় গেল
পড়িল সন্ধান।
সবাই বলে, ‘সেই তারাতেই
স্বর্গ হতে আলো–
সেই তারাটাই সবার বড়ো,
সবার চেয়ে ভালো।’
সেদিন হতে জগৎ আছে
সেই তারাটির খোঁজে–
তৃপ্তি নাহি দিনে, রাত্রে
চক্ষু নাহি বোজে।
সবাই বলে, ‘সকল চেয়ে
তারেই পাওয়া চাই।’
সবাই বলে, ‘সে গিয়েছে
ভুবন কানা তাই!’
শুধু গভীর রাত্রিবেলায়
স্তব্ধ তারার দলে–
‘মিথ্যা খোঁজা, সবাই আছে’
নীরব হেসে বলে।
Romanized Version
Bidhi jedin khanto dilen
Srishti korar kaje
Shokol tara uthlo phute
Nil akasher majhe.
Nobin srishti shamne rekhe
Shuroshobhar tole
Chhayapothe debota shobai
Boshen dole dole.
Gahen tnara, ‘Ki anondo!
E ki purno chhobi!
E ki montro, e ki chhondo,
Groho chondro robi!’
Henokale shobhay ke go
Hothat boli uthe,
‘Jyotir malay ekti tara
Kothay gechhe tute!’
Chhinre gelo binar tontri,
Theme gelo gan,
Hara tara kothay gelo
Porilo shondhan.
Shobai bole, ‘Shei taratei
Sworgo hote alo–
Shei taratai shobar boro,
Shobar cheye bhalo.’
Shedin hote jogot achhe
Shei taratir khonje–
Tripti nahi dine, ratre
Chokkhu nahi boje.
Shobai bole, ‘Shokol cheye
Tarei pawa chai.’
Shobai bole, ‘She giyechhe
Bhubon kana tai!’
Shudhu gobhir ratribelay
Stobdho tarar dole–
‘Mithya khonja, shobai achhe’
Nirob heshe bole.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- পূর্ণতার মাঝে কাল্পনিক অপূর্ণতা:
“গাহেন তাঁরা, ‘কী আনন্দ! / এ কী পূর্ণ ছবি! … ‘জ্যোতির মালায় একটি তারা / কোথায় গেছে টুটে!'”— স্রষ্টা যেদিন এই সুন্দর পৃথিবী ও মহাবিশ্ব সৃষ্টি করলেন, তখন সব দেবতারা এই নিখুঁত সৃষ্টির আনন্দে মেতে উঠেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ কেউ একজন বলে ওঠে যে একটি তারা হারিয়ে গেছে। অর্থাৎ, শতভাগ পূর্ণতার মাঝেও মন কোনো না কোনো কাল্পনিক অভাব বা খুঁত খুঁজে বের করে এবং নিজের আনন্দ নিজেই নষ্ট করে।
- যা নেই তার প্রতি মানুষের অকারণ মোহ:
“সবাই বলে, ‘সেই তারাতেই / স্বর্গ হতে আলো– / সেই তারাটাই সবার বড়ো, / সবার চেয়ে ভালো।'”— যে তারাটি হারিয়ে গেছে বলে ধরে নেওয়া হলো, সবাই ভাবতে শুরু করল সেটাই বুঝি সবচেয়ে দামি আর সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিল। মানুষের মনস্তত্ত্বও ঠিক এমনই; যা তার হাতের নাগালে নেই বা যা সে পায়নি, সেটাকেই সে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস ভেবে আক্ষেপ করে।
- অবাস্তবের পেছনে ছুটে চলা ও প্রকৃতির সত্য:
“সেদিন হতে জগৎ আছে / সেই তারাটির খোঁজে– … ‘মিথ্যা খোঁজা, সবাই আছে’ / নীরব হেসে বলে।”— সেই কাল্পনিক ‘হারাধন’ বা হারানো তারাটিকে খোঁজার জন্য জগত আজও অতৃপ্ত হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে। কিন্তু গভীর রাতে আকাশের স্তব্ধ তারারা নীরব হাসিতে জানায়, এই খোঁজাখুঁজি একেবারেই অর্থহীন। আসলে কিছুই হারায়নি, মহাবিশ্ব বা সৃষ্টি তার নিজের জায়গায় সম্পূর্ণ এবং নিখুঁত। অপূর্ণতা কেবল মানুষের মনের দৃষ্টিভঙ্গিতে তৈরি হওয়া এক বিভ্রম মাত্র।
