আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

চৈতালী কাব্যগ্রন্থের ‘দুর্লভ জন্ম’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চৈতালী’ (১৮৯৬) কাব্যগ্রন্থের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক ও জীবনবোধের কবিতা হলো ‘দুর্লভ জন্ম’। মৃত্যু অনিবার্য জেনেও এই নশ্বর পৃথিবীর প্রতি মানুষের যে গভীর মমতা এবং জাগতিক প্রতিটি তুচ্ছ বস্তুর প্রতি যে দুর্লভ ভালোবাসা জন্মায়, তা এই কবিতায় অত্যন্ত শান্ত ও প্রগাঢ় ভাষায় ব্যক্ত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য
বিষয়বিবরণ
কবিতার নামদুর্লভ জন্ম
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থচৈতালী
প্রকাশের বছর১৮৯৬ (১৩০৩ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনদার্শনিক ও জীবনবোধমূলক কবিতা (Philosophical and Life-affirming Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্য রচনার ‘চিত্রা-চৈতালী’ পর্বে (বিশেষ করে শিলাইদহ ও পদ্মাপারে কাটানো দিনগুলোতে) প্রকৃতির অবারিত রূপ এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রতি তাঁর গভীর টান তৈরি হয়। ‘দুর্লভ জন্ম’ কবিতাটিতে মৃত্যুর অমোঘ সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জীবনের একটি নতুন অর্থ খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। জীবন ক্ষণস্থায়ী বলেই এই পৃথিবীর প্রতিটি ধূলিকণা, প্রতিটি মুহূর্ত এবং প্রতিটি তুচ্ছ বিষয় কবির কাছে ‘দুর্লভ’ বা মহার্ঘ হয়ে উঠেছে।

দুর্লভ জন্ম – সম্পূর্ণ কবিতা

একদিন এই দেখা হয়ে যাবে শেষ,

পড়িবে নয়ন-‘পরে অন্তিম নিমেষ।

পরদিনে এইমতো পোহাইবে রাত,

জাগ্রত জগৎ-‘পরে জাগিবে প্রভাত।

কলরবে চলিবেক সংসারের খেলা,

সুখে দুঃখে ঘরে ঘরে বহি যাবে বেলা।

সে কথা স্মরণ করি নিখিলের পানে

আমি আজি চেয়ে আছি উৎসুক নয়ানে।

যাহা-কিছু হেরি চোখে কিছু তুচ্ছ নয়,

সকলি দুর্লভ ব’লে আজি মনে হয়।

দুর্লভ এ ধরণীর লেশতম স্থান,

দুর্লভ এ জগতের ব্যর্থতম প্রাণ।

যা পাই নি তাও থাক্‌, যা পেয়েছি তাও,

তুচ্ছ ব’লে যা চাই নি তাই মোরে দাও।

Romanized Version

Ekdin ei dekha hoye jabe shesh,
Poribe noyon-‘pore ontimo nimesh.
Porodine eimoto pohaibe rat,
Jagroto jogot-‘pore jagibe probhat.
Kolorobe cholibek shongsharer khela,
Shukhe dukkhe ghore ghore bohi jabe bela.
She kotha shmoron kori nikhiler pane
Ami aji cheye achhi utshuk noyane.
Jaha-kichhu heri chokhe kichhu tuchchho noy,
Shokoli durlobh b’le aji mone hoy.
Durlobh e dhoronir leshotom sthan,
Durlobh e jogoter byarthotom pran.
Ja pai ni tao thak, ja peyechhi tao,

Tuchchho b’le ja chai ni tai more dao.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • মৃত্যুর অমোঘতা ও জগতের বহমানতা:
    “একদিন এই দেখা হয়ে যাবে শেষ… জাগ্রত জগৎ-‘পরে জাগিবে প্রভাত।”
    — কবিতাটির শুরুতেই মৃত্যুচেতনার কথা বলা হয়েছে। কবি জানেন, একদিন তাঁর চোখের পাতা চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু তাঁর মৃত্যুতে পৃথিবীর কিছুই থেমে থাকবে না। পরের দিন ঠিকই নিয়ম করে সকাল হবে, আলো ফুটবে এবং সংসারের কোলাহলময় খেলা আপন গতিতেই চলতে থাকবে।
  • মৃত্যুচেতনায় জীবনের মূল্যবোধ:
    “সে কথা স্মরণ করি নিখিলের পানে / আমি আজি চেয়ে আছি উৎসুক নয়ানে। / যাহা-কিছু হেরি চোখে কিছু তুচ্ছ নয়”
    — নিজের এই অনিবার্য বিদায়ের কথা মনে পড়লেই সমগ্র পৃথিবীর দিকে কবির দৃষ্টি আরও উৎসুক ও মমতাময় হয়ে ওঠে। যেহেতু এই পৃথিবীতে তাঁর সময় সীমিত, তাই এখানকার কোনো কিছুই আর তাঁর কাছে তুচ্ছ বা ফেলনা মনে হয় না।
  • তুচ্ছতার অবসান ও পরম প্রাপ্তি:
    “দুর্লভ এ ধরণীর লেশতম স্থান… তুচ্ছ ব’লে যা চাই নি তাই মোরে দাও।”
    — পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম স্থান থেকে শুরু করে সবচেয়ে ব্যর্থ প্রাণটিও কবির কাছে অত্যন্ত দুর্লভ ও মূল্যবান বলে মনে হচ্ছে। তাই জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তিনি জীবনের না-পাওয়া বা বড় কোনো প্রাপ্তির হিসাব মেলাতে চান না। বরং যেসব জিনিসকে একদিন তুচ্ছ মনে করে তিনি অবহেলা করেছিলেন, আজ সেই তুচ্ছ অথচ দুর্লভ জাগতিক উপাদানগুলোকেই তিনি দুহাত ভরে গ্রহণ করতে চাইছেন।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (চৈতালী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও আপনার দেওয়া পূর্বনির্ধারিত বিন্যাস অনুযায়ী কোনো অংশ বাদ না দিয়ে সম্পূর্ণভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। (বি.দ্র. আপনার প্রদত্ত তথ্যের ইংরেজি অংশ ও অপ্রয়োজনীয় হাইফেন পরিহার করে আর্কাইভের জন্য একটি পরিচ্ছন্ন ও প্রামাণ্য রূপ তৈরি করা হয়েছে)।

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত