বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চিত্রা-চৈতালি’ পর্বের অন্তর্গত ‘চৈতালী’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম রোমান্টিক, প্রকৃতি-নির্ভর ও ভাবগম্ভীর লিরিক কবিতা হলো ‘প্রেয়সী’। ১৮৯৬ সালে (আশ্বিন, ১৩০৩ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত এই কবিতায় বর্ষার স্নিগ্ধ প্রকৃতি, কবির চিত্তপদ্মে দেবীর বা প্রেয়সীর একাকী আসন এবং সংসারের শত ব্যস্ততা ও কোলাহল ভুলে এক মহা নীরবতা ও শান্তির রাজ্যে হারিয়ে যাওয়ার সুমধুর রূপায়ণ ঘটেছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | প্রেয়সী |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | চৈতালী |
| প্রকাশের বছর | ১৮৯৬ (আশ্বিন, ১৩০৩ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | রোমান্টিক ও প্রকৃতিভিত্তিক লিরিক কবিতা (Romantic and Nature-based Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্য রচনার ‘চিত্রা-চৈতালি’ পর্যায়টি নিসর্গপ্রীতি, সৌন্দর্যচেতনা এবং মানবমনের গভীর অনুভূতির এক স্বর্ণালী অধ্যায়। ‘চৈতালী’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো ছোট কলেবরের হলেও তাতে বাংলার রূপ, বর্ষার স্নিগ্ধতা এবং রোমান্টিক ভাবনার অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। ‘প্রেয়সী’ কবিতায় কবি প্রকৃতি এবং কল্পনার এক দেবীরূপকে তাঁর অন্তরের মন্দিরে বা চিত্তপদ্মে স্থাপন করেছেন, যেখানে বর্ষার স্বচ্ছ নীলাম্বর, শস্যপূর্ণ ধরা এবং বাতাসের আলিঙ্গন মিলে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে।
প্রেয়সী – সম্পূর্ণ কবিতা
হে প্রেয়-সী, হে শ্রেয়সী, হে বীণাবাদিনী,
আজি মোর চিত্তপদ্মে বসি একাকিনী
ঢালিতেছ স্বর্গসুধা; মাথার উপর
সদ্যস্নাত বরষার স্বচ্ছ নীলাম্বর
রাখিয়াছে স্নিগ্ধহস্ত আশীর্বাদে ভরা;
সম্মুখেতে শষ্যপূর্ণ হিল্লোলিত ধরা
বুলায় নয়নে মোর অমৃতচুম্বন;
উতলা বাতাস আসি করে আলিঙ্গন;
অন্তরে সঞ্চার করি আনন্দের বেগ
বহে যায় ভরা নদী; মধ্যাহ্নের মেঘ
স্বপ্নমালা গাঁথি দেয় দিগন্তের ভালে।
তুমি আজি মুগ্ধমুখী আমারে ভুলালে,
ভুলাইলে সংসারের শতলক্ষ কথা–
বীণাস্বরে রচি দিলে মহা নীরবতা।
Romanized Version
He prey-shi, he shreyashi, he binabadini,
Aji mor chittopodme bosi ekakini
Dhalitecho sworgosudha; mathar upor
Sodyosnat boroshar shwachchho nilambor
Rakhiyache snigdhohosto ashirbade vora;
Shommukhete shoshnopurno hillolito dhora
Bulay noyone mor omrito-chumbon;
Utola batash ashi kore alingon;
Ontore shonchar kore anonder beg
Bohe jay vora nodi; modhyahner megh
Shopnomala ganthi dey digonter bhale.
Tumi aji mugdhmukhi amare bhulale,
Bhulaile shongsharer shotolokho kotha–
Binarshore rochi dile moha nirobota.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- চিত্তপদ্মে প্রেয়সীর আসন ও স্বর্গসুধা:
“হে প্রেয়-সী, হে শ্রেয়সী, হে বীণাবাদিনী, / আজি মোর চিত্তপদ্মে বসি একাকিনী / ঢালিতেছ স্বর্গসুধা…”— কবির অন্তরে বা চিত্তপদ্মে প্রেয়সী বা বীণাবাদিনীর একাকী আসন গ্রহণ এবং স্বর্গসুধা ঢেলে দেওয়ার চিত্রের মধ্য দিয়ে কবিতার স্নিগ্ধ সূচনা হয়েছে।
- প্রকৃতির স্নিগ্ধ আশীর্বাদ:
“সদ্যস্নাত বরষার স্বচ্ছ নীলাম্বর / রাখিয়াছে স্নিগ্ধহস্ত আশীর্বাদে ভরা…”— সদ্যস্নাত বর্ষার আকাশ যেন স্নিগ্ধ হাতে কবির মাথার উপর আশীর্বাদ ছড়িয়ে দিচ্ছে, আর শস্যপূর্ণ ধরা ও মধ্যাহ্নের মেঘ মিলে এক স্বপ্নময় আবহ তৈরি করছে।
- সংসারের কোলাহল থেকে মুক্তি ও নীরবতা:
“তুমি আজি মুগ্ধমুখী আমারে ভুলালে, / ভুলাইলে সংসারের শতলক্ষ কথা– / বীণাস্বরে রচি দিলে মহা নীরবতা।”— পার্থিব জীবনের শত ব্যস্ততা, কোলাহল ও হাজারো কথা ভুলিয়ে প্রেয়সীর বীণার সুরে এক মহা নীরবতা ও পরম শান্তির রাজ্য প্রতিষ্ঠা হওয়ার মধ্য দিয়ে কবিতাটি পূর্ণতা পেয়েছে।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (চৈতালী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।
