বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নবজাতক’ (১৯৪০) কাব্যগ্রন্থের অন্যতম একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক, দার্শনিক ও আত্মানুসন্ধানমূলক সৃষ্টি হলো ‘ভাগ্যরাজ্য’। এই কবিতায় কবির জীবনের অন্তিম লগ্নে নিজের ভাগ্যরাজ্যের নানা অবহেলিত প্রদেশ, অতীত আসক্তি, অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা, অসম্পূর্ণ শিল্পকর্ম এবং না-জানার রহস্যময় বেদনার এক অপূর্ব কাব্যিক রূপ অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | ভাগ্যরাজ্য |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | নবজাতক |
| প্রকাশের বছর | ১৯৪০ (১৩৪৭ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক লিরিক কবিতা (Psychological / Philosophical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৯৪০ সালে প্রকাশিত ‘নবজাতক’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের শেষভাগের এক অত্যন্ত আধুনিক ও মননশীল সৃষ্টি। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতে বার্ধক্যের প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে জীবনের হিসাব-নিকাশ, অতীতে ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতি এবং অপূর্ণতার বেদনা এক গভীর শিল্পরূপ লাভ করেছে। ‘ভাগ্যরাজ্য’ কবিতায় কবি তাঁর মনের এক অদৃশ্য রাজ্যের রূপক এঁকেছেন। এই রাজ্যের এক কোণে পড়ে আছে আয়ুহারাদের ভগ্নশেষ বা পুরোনো কালের জীর্ণ দিনগুলো, যেখানে পূর্ব আসক্তির শিকড়জাল বর্তমান কালকে আঁকড়ে ধরে আছে। অন্যদিকে রয়েছে অসমাপ্ত আকাঙ্ক্ষা, অপঘাতপ্রাপ্ত যাত্রীদের চকিত আশা এবং পাথরে খোদাই করা এক অসম্পূর্ণ মূর্তি, যার সম্পূর্ণ রূপ দেখার আগেই চেষ্টা থেমে গেছে। সেই শেষ না-জানার রহস্য এবং স্মৃতির বেদনা ও অপ্রাপ্তির অভিশাপ কীভাবে ভাগ্যরাজ্যকে নিত্য উজ্জ্বল করে রাখে, সেটাই এই কবিতার মূল প্রতিপাদ্য।
ভাগ্যরাজ্য কবিতা (সম্পূর্ণ)
আমার এ ভাগ্যরাজ্যে পুরানো কালের যে প্রদেশ,
আয়ুহারাদের ভগ্নশেষ
সেথা পড়ে আছে
পূর্বদিগন্তের কাছে।
নিঃশেষ করেছে মূল্য সংসারের হাটে,
অনাবশ্যকের ভাঙা ঘাটে
জীর্ণ দিন কাটাইছে তারা
অর্থহারা।
ভগ্ন গৃহে লগ্ন ঐ অর্ধেক প্রাচীর;
আশাহীন পূর্ব আসক্তির
কাঙাল শিকড়জাল
বৃথা আঁকড়িয়া ধরে প্রাণপণে বর্তমান কাল।
আকাশে তাকায় শিলালেখ,
তাহার প্রত্যেক
অস্পষ্ট অক্ষর আজ পাশের অক্ষরে
ক্লান্ত সুরে প্রশ্ন করে,
“আরো কি রয়েছে বাকি কোনো কথা,
শেষ হয়ে যায় নি বারতা।”
এ আমার ভাগ্যরাজ্যে অন্যত্র হোথায় দিগন্তরে
অসংলগ্ন ভিত্তি-‘পরে
করে আছে চুপ
অসমাপ্ত আকাঙক্ষার অসম্পূর্ণ রূপ।
অকথিত বাণীর ইঙ্গিতে
চারিভিতে
নীরবতা-উৎকণ্ঠিত মুখ
রয়েছে উৎসুক।
একদা যে যাত্রীদের সংকল্পে ঘটেছে অপঘাত,
অন্য পথে গেছে অকস্মাৎ,
তাদের চকিত আশা,
স্থকিত চলার স্তব্ধ ভাষা
জানায়, হয় নি চলা সারা–
দুরাশার দূরতীর্থ আজো নিত্য করিছে ইশারা।
আজিও কালের সভা-মাঝে
তাদের প্রথম সাজে
পড়ে নাই জীর্ণতার দাগ,
লক্ষ্যচ্যুত কামনায় রয়েছে আদিম রক্তরাগ।
কিছু শেষ করা হয় নাই,
হেরো, তাই
সময় যে পেল না নবীন
কোনোদিন
পুরাতন হতে–
শৈবালে ঢাকে নি তারে বাঁধা-পড়া ঘাটে-লাগা স্রোতে;
স্মৃতির বেদনা কিছু, কিছু পরিতাপ,
কিছু অপ্রাপ্তির অভিশাপ
তারে নিত্য রেখেছে উজ্জ্বল;
না দেয় নীরস হতে মজ্জাগত গুপ্ত অশ্রুজল।
যাত্রাপথ-পাশে
আছ তুমি আধো-ঢাকা ঘাসে–
পাথরে খুদিতেছিনু, হে মূর্তি, তোমারে কোন্ ক্ষণে
কিসের কল্পনে।
অপূর্ণ তোমার কাছে পা না উত্তর।
মনে যে কী ছিল মোর
যেদিন ফুটিত তাহা শিল্পের সম্পূর্ণ সাধনাতে
শেষ-রেখাপাতে,
সেদিন তা জানিতাম আমি;
তার আগে চেষ্টা গেছে থামি।
সেই শেষ না-জানার
নিত্য নিরুত্তরখানি মর্ম-মাঝে রয়েছে আমার;
স্বপ্নে তার প্রতিবিম্ব ফেলি
সচকিত আলোকের কটাক্ষে সে করিতেছে কেলি।

ভাগ্যরাজ্য কবিতার Romanized Version:
Akashe takay shilalekh,
Tahar prottyek
Osposhto okkhor aj pasher okkhore
Klanto shure proshno kore,
"Aro ki royeche baki kono kotha,
Shesh hoye jay ni barata."
Aji koaler shova-majhe
Tader prothom shaje
Pore nai jirnotar dag,
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- অপূর্ণতা ও স্মৃতির বেদনা: জীবনের অন্তিম প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে সাধক বা কবির মনে জমে থাকা অসমাপ্ত আকাঙ্ক্ষা, অসম্পূর্ণ শিল্পকর্ম এবং অপূর্ণতার বেদনাই এই কবিতার মূল ভিত্তি।
- অজানা রহস্য ও অন্তিম জিজ্ঞাসা: জীবনের নানা ভাঙা গড়া, স্মৃতির পরিতাপ এবং না-জানার রহস্যময় উত্তরহীনতাই ভাগ্যরাজ্যের পথকে চিরসচল ও উজ্জ্বল করে রাখে।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (নবজাতক কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।








![ভালোবেসে সখী নিভৃতে [ Bhalobese sokhi nibhrite jatane ] প্রেম ৩৪ ভালোবেসে সখী নিভৃতে [ Bhalobese sokhi nibhrite jatane ] প্রেম ৩৪](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/11/ভালোবেসে-সখী-নিভৃতে-1024x536.gif)