পত্রপুট কাব্যগ্রন্থের ‘গো তরুণী’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্ত্যপর্বের কাব্যসৃষ্টির একটি উল্লেখযোগ্য কবিতা ‘গো তরুণী’। কবিতাটি পত্রপুট কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত। এখানে একজন প্রবীণ কবি নিজেকে এক তরুণীর কাছে অতীতের এক দূরবর্তী সময়ের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরেছেন। পুরোনো দিনের অভিজ্ঞতা, বিস্মৃত বেদনা, প্রেম ও বসন্তের স্মৃতি তিনি নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে চান তাঁর গানের মধ্য দিয়ে।

পত্রপুট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ পর্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ। বাংলা ২৫ বৈশাখ ১৩৪৩ (১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে) এটি প্রকাশিত হয় এবং এতে মোট আঠারোটি কবিতা রয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়তথ্য
কবিতার নামগো তরুণী
কবিরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কাব্যগ্রন্থপত্রপুট
প্রকাশকাল১৩৪৩ বঙ্গাব্দ / ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দ
রচনাস্থানশান্তিনিকেতন
রচনার তারিখ১৯ বৈশাখ ১৩৪৩
ধরনগীতিধর্মী কবিতা
প্রধান বিষয়যৌবন, স্মৃতি, সময়, প্রেম, বেদনা, উত্তরাধিকার ও অমরত্ব

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি, সাহিত্যিক, সংগীতস্রষ্টা ও চিন্তাবিদ। তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যজীবনের শেষ পর্যায়ের রচনাগুলিতে সময়, মৃত্যু, স্মৃতি, একাকিত্ব, নবীন প্রজন্ম এবং নিজের সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা বিশেষভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

‘গো তরুণী’ কবিতাতেও অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একটি অন্তরঙ্গ সংলাপ তৈরি হয়েছে। কবি নিজেকে এমন একজন মানুষ হিসেবে দেখেছেন, যিনি বহু পুরোনো সময় থেকে এসে বর্তমানের তরুণ প্রজন্মের কাছে তাঁর গান, স্মৃতি ও অনুভূতির উত্তরাধিকার রেখে যেতে চান।

কবিতার শেষে এই ভাব আরও গভীর হয়ে ওঠে—মানুষ একদিন থাকবে না, কিন্তু তার গান ও সৃষ্টির মধ্যে তার অস্তিত্ব থেকে যেতে পারে।

সম্পূর্ণ কবিতা

গো তরুণী

ওগো তরুণী,
ছিল অনেক দিনের পুরোনো বছরে
এমনি একখানি নতুন কাল,
দক্ষিণ হাওয়ায় দোলায়িত,
সেই কালেরই আমি।
মুছে-আসা ঝাপ্‌সা পথ বেয়ে
এসে পড়েছি বনগন্ধের সংকেতে
তোমাদের এই আজকে-দিনের নতুন কালে।
পারো যদি মেনে নিয়ো আমায় সখা ব’লে,
আর কিছু নয়, আমি গান জোগাতে পারি
তোমাদের মিলনরাতে
আমার সেই নিদ্রাহারা সুদূর রাতের গান;
তা’র সুরে পাবে দূরের নতুনকে,
তোমার লাগবে ভালো,
পাবে আপনাকেই
আপনার সীমানার অতীত পারে।
সেদিনকার বসন্তের বাঁশিতে
লেগেছিল যে প্রিয়-বন্দনার তান,
আজ সঙ্গে এনেছি তাই,
সে নিয়ো তোমার অর্ধনিমীলিত চোখের পাতায়,
তোমার দীর্ঘনিঃশ্বাসে।

আমার বিস্মৃত বেদনার আভাসটুকু
ঝরা ফুলের মৃদু গন্ধের মতো
রেখে দিয়ে যাব তোমার নব বসন্তের হাওয়ায়।
সেদিনকার ব্যথা
অকারণে বাজবে তোমার বুকে;
মনে বুঝবে, সেদিন তুমি ছিলে না তবু ছিলে,
নিখিল যৌবনের রঙ্গভূমির নেপথ্যে
যবনিকার ওপারে।

ওগো চিরন্তনী,
আজ আমার বাঁশি তোমাকে বলতে এল,—
যখন তুমি থাকবে না তখন তুমি থাকবে আমার গানে
ডাকতে এলেম আমার হারিয়ে-যাওয়া পুরোনোকে
তা’র খুঁজে-পাওয়া নতুন নামে।
হে তরুণী,
আমাকে মেনে নিয়ে তোমার সখা ব’লে,
তোমার অন্যযুগের সখা॥

শান্তিনিকেতন
১৯ বৈশাখ, ১৩৪৩

Romanized Version

Go Taruṇī

Ogo taruṇī,
Chhilo anek diner purono bachore
Emoni ekkhāni notun kāl,
Dakṣiṇ hāoyāy dolāyito,
Sei kāleri āmi.
Muche-āsā jhāpśā path beye
Ese paṛechhi bon-gandher saṅkete
Tomāder ei ājke-diner notun kāle.
Pāro yadi mene niyo āmāy sakhā bole,
Ār kichhu noy, āmi gān jogāte pāri
Tomāder milan-rāte
Āmār sei nidrāhārā sudūr rāter gān;
Tār sure pābe durer notunke,
Tomār lāgbe bhālo,
Pābe āpnākei
Āpnār sīmānār atīt pāre.
Sedin-kār basanter bāṃshite
Legechhilo je priya-bandanar tān,
Āj saṅge enechhi tāi,
Se niyo tomār ardha-nimilita chokher pātāy,
Tomār dīrghanihśvāse.

Āmār bismṛta bedanār ābhāsṭuku
Jharā phuler mṛdu gandher mato
Rekhe diye yābo tomār naba basanter hāoyāy.
Sedin-kār byathā
Akāraṇe bājbe tomār buke;
Mane bujhbe, sedin tumi chhile nā tabu chhile,
Nikhil youbaner raṅgabhūmir nepathye
Jabanikār opāre.

Ogo chīrantanī,
Āj āmār bāṃshi tomāke balte el,—
Jakhon tumi thākbe nā takhan tumi thākbe āmār gāne
Ḍākte elem āmār hāriye-yāoā puronoke
Tār khuje-pāoā notun nāme.
He taruṇī,
Āmāke mene niye tomār sakhā bole,
Tomār anyayuger sakhā॥

Śāntiniketan
19 Baiśākh, 1343

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

১. অতীত থেকে বর্তমানের দিকে যাত্রা

কবি নিজেকে অতীতের একটি সময়ের প্রতিনিধি হিসেবে কল্পনা করেছেন—

“ছিল অনেক দিনের পুরোনো বছরে
এমনি একখানি নতুন কাল,”

অতীত তাঁর কাছে নিছক পুরোনো নয়; সেই পুরোনো সময়ের মধ্যেও একদিন নতুনত্ব ছিল। এই উপলব্ধিই অতীত ও বর্তমানকে একটি ধারাবাহিকতার মধ্যে যুক্ত করে।

২. তরুণ প্রজন্মের কাছে স্মৃতির উত্তরাধিকার

কবি তরুণীর কাছে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে চান না কোনো কর্তৃত্বের মাধ্যমে। তিনি শুধু তাঁর গানটি দিয়ে যেতে চান—

“আর কিছু নয়, আমি গান জোগাতে পারি”

এখানে গান হয়ে ওঠে প্রজন্মান্তরের স্মৃতি ও অনুভূতির বাহন।

৩. প্রেম ও বসন্তের স্মৃতি

“বসন্তের বাঁশি”, “প্রিয়-বন্দনার তান”, “ঝরা ফুলের মৃদু গন্ধ”—এসব চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবি অতীতের প্রেম ও সৌন্দর্যের স্মৃতিকে বর্তমানের অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

পুরোনো বেদনার স্মৃতিও তাই কেবল দুঃখ নয়; তা নতুন বসন্তের হাওয়ায় মিশে থাকা এক অদৃশ্য সুবাস।

৪. অনুপস্থিত থেকেও উপস্থিত থাকা

কবিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি—

“সেদিন তুমি ছিলে না তবু ছিলে,”

মানুষ কোনো নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত না থাকলেও বৃহত্তর মানবজীবনের অভিজ্ঞতা ও সৃষ্টির ধারার মধ্যে তার এক ধরনের অস্তিত্ব থাকতে পারে। অতীতের মানুষ ভবিষ্যৎ মানুষের অনুভূতির মধ্যে নতুন করে আবিষ্কৃত হয়।

৫. গান ও সৃষ্টির মধ্যে অমরত্ব

শেষ স্তবকে কবিতার ভাবটি আরও স্পষ্ট হয়েছে—

“যখন তুমি থাকবে না তখন তুমি থাকবে আমার গানে”

এখানে ‘গান’ মানুষের সৃষ্টিশীল অস্তিত্বের প্রতীক। ব্যক্তি চলে যায়, কিন্তু তার সৃষ্টির মধ্যে তার অনুভূতি ও কণ্ঠস্বর পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে পারে।

৬. ‘চিরন্তনী’ তরুণী

কবিতায় তরুণী শেষ পর্যন্ত শুধু একজন ব্যক্তি নন; তিনি সময়ের চিরনবীনতারও প্রতীক। তাই কবি তাঁকে একদিকে “তরুণী”, অন্যদিকে “চিরন্তনী” বলে সম্বোধন করেছেন। বয়স বদলায়, প্রজন্ম বদলায়, কিন্তু নবীনতার প্রবাহ চলতে থাকে।

কবিতাটির দার্শনিক তাৎপর্য

‘গো তরুণী’ মূলত সময় ও সৃষ্টির সম্পর্কের কবিতা। এখানে অতীত নিজেকে বর্তমানের কাছে সমর্পণ করছে, কিন্তু কোনো বোঝা হিসেবে নয়—গান, স্মৃতি ও অনুভূতির উত্তরাধিকার হিসেবে।

কবি জানেন যে মানুষ একদিন অনুপস্থিত হবে। কিন্তু তাঁর সৃষ্টির মধ্যে তাঁর অতীত, প্রেম, বেদনা ও সৌন্দর্য নতুন মানুষের কাছে নতুন অর্থে ফিরে আসতে পারে। ফলে কবিতাটি ব্যক্তিগত স্মৃতি থেকে ধীরে ধীরে মানবসভ্যতার সাংস্কৃতিক স্মৃতির দিকে প্রসারিত হয়েছে।

‘পুরোনো’ এবং ‘নতুন’ এখানে পরস্পরের বিপরীত নয়। পুরোনোই নতুনের মধ্যে নতুন নামে ফিরে আসে। এই কারণেই কবিতার শেষের পঙ্‌ক্তি—

“তা’র খুঁজে-পাওয়া নতুন নামে।”

—কবিতাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য। সৃষ্টির প্রকৃত উত্তরাধিকার হয়তো এটাই: পুরোনো অনুভূতি নতুন মানুষের হৃদয়ে নতুন ভাষা ও নতুন অর্থে পুনর্জন্ম লাভ করে।

উৎস

  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পত্রপুট।
  • কবিতার রচনাস্থল ও তারিখ: শান্তিনিকেতন, ১৯ বৈশাখ ১৩৪৩।
  • কবিতার মূল পাঠ: প্রদত্ত পাঠ অনুসারে সংরক্ষিত।

মন্তব্য করুন