আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

পরিশেষ কাব্যগ্রন্থের ‘আতঙ্ক’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামআতঙ্ক
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থপরিশেষ
প্রকাশের বছর১৯৩২ (১৩৩৯ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনমনস্তাত্ত্বিক ও স্মৃতিকাতর লিরিক কবিতা (Psychological / Reflective Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৩২ সালে প্রকাশিত ‘পরিশেষ’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের শেষভাগের এক গভীর ও পরিণত চিন্তার ফসল। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতে প্রাত্যহিক জীবনের অভিজ্ঞতা, বয়স বাড়ার সাথে সাথে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং মনস্তাত্ত্বিক সত্য প্রকাশ পেয়েছে। ‘আতঙ্ক’ কবিতায় কবি স্মৃতিরোমন্থন করেছেন তাঁর শৈশবের এক ভয়ভীতি জড়ানো স্মৃতির। ছোটবেলায় গোধূলিবেলায় বাগানের জীর্ণ পাঁচিলের সাদাকালো দাগগুলোকে তাঁর কাছে দৈত্যপুরী বা ডাইনিবুড়ির আস্তানা বলে মনে হতো—কাশীরাম দাসের মহাভারতের হিড়িম্বা বা সূর্পণখার কাল্পনিক মূর্তি যেন সেখানে লুকিয়ে থাকত। কিন্তু ১৭ বছর পর যখন তিনি সেই সাবেক বাড়িতে ফিরে আসেন, তখন সেই বাহ্যিক দাগগুলো বা ভয়ের রূপগুলো আর মনে কোথাও থাকে না। বরং জীবন ও দেশের ভাঙা দেউল, জীর্ণ ভিত্তি এবং ভীরু কল্পনার কুটিল আশঙ্কাগুলোর মধ্য দিয়ে এক অন্য ধরনের মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক ও নিরাশার চিত্র ফুটে ওঠে।

আতঙ্ক কবিতা (সম্পূর্ণ)

বটের জটায় বাঁধা ছায়াতলে

                       গোধূলিবেলায়

           বাগানের জীর্ণ পাঁচিলেতে

                       সাদাকালো দাগগুলো

                       দেখা দিত ভয়ংকর মূর্তি ধরে।

           ওইখানে দৈত্যপুরী,

                 অদৃশ্য কুঠুরি থেকে তার

      মনে-মনে শোনা যেত হাঁউমাউখাঁউ।

           লাঠি হাতে কুঁজোপিঠ

      খিলিখিলি হাসত ডাইনিবুড়ী।

                     কাশিরাম দাস

      পয়ারে যা লিখেছিল হিড়িম্বার কথা

           ইট-বের-করা সেই পাঁচিলের ‘পরে

                    ছিল তারি প্রত্যক্ষ কাহিনী।

      তারি সঙ্গে সেইখানে নাককাটা সূর্পণখা

                 কালো কালো দাগে

                       করেছিল কুটুম্বিতা।

      সতেরো বৎসর পরে

           গিয়েছি সে সাবেক বাড়িতে।

                 দাগ বেড়ে গেছে,

      মুগ্ধ নতুনের তুলি পুরোনোকে দিয়েছে প্রশ্রয়।

      ইঁটগুলো মাঝে-মাঝে খসে গিয়ে

                 পড়ে আছে রাশকরা।

           গায়ে গায়ে লেগেছে অনন্তমূল,

                 কালমেঘ লতা,

                 বিছুটির ঝাড়;

           ভাঁটিগাছে হয়েছে জঙ্গল।

                 পুরোনো বটের পাশে

           উঠেছে ভেরেণ্ডাগাছ মস্তবড়ো হয়ে।

      বাইরেতে সূর্পণখা-হিড়িম্বার চিহ্নগুলো আছে,

           মনে তারা কোনোখানে নেই।

      স্টেশনে গেলেম ফিরে একবার খুব হেসে নিয়ে

                 জীবনের ভিত্তিটার গায়ে

                       পড়েছে বিস্তর কালো দাগ,

                 মূঢ় অতীতের মসীলেখা;

                       ভাঙা গাঁথুনিতে

           ভীরু কল্পনার যত জটিল কুটিল চিহ্নগুলো।

                       মাঝে-মাঝে

                 যেদিন বিকেলবেলা

                       বাদলের ছায়া নামে

                 সারি সারি তালগাছে

                       দিঘির পাড়িতে,

                    দূরের আকাশে

                 স্নিগ্ধ সুগম্ভীর

               মেঘের গর্জন ওঠে গুরুগুরু,

           ঝিঁ ঝিঁ ডাকে বুনো খেজুরের ঝোপে,

                 তখন দেশের দিকে চেয়ে

           বাঁকাচোরা আলোহীন পথে

                ভেঙেপড়া দেউলের মূর্তি দেখি;

                 দীর্ণ ছাদে, তার জীর্ণ ভিতে

                 নামহীন অবসাদ,-

           অনির্দিষ্ট শঙ্কাগুলো নিদ্রাহীন পেঁচা,

                 নৈরাশ্যের অলীক অত্যুক্তি যত,

             দুর্বলের স্বরচিত শত্রুর চেহারা।

                 ধিক্‌ রে ভাঙনলাগা মন,

      চিন্তায় চিন্তায় তোর কত মিথ্যা আঁচড় কেটেছে।

           দুষ্টগ্রহ সেজে ভয়

                 কালোচিহ্নে মুখভঙ্গি করে।

           কাঁটা-আগাছার মতো

                 অমঙ্গল নাম নিয়ে

                      আতঙ্কের জঙ্গল উঠেছে।

           চারিদিকে সারি সারি জীর্ণ ভিতে

           ভেঙেপড়া অতীতের বিরূপ বিকৃতি।

                 কাপুরুষে করিছে বিদ্রূপ।

Amar Rabindranath Logo

আতঙ্ক কবিতার Romanized Version:

Boter jotay bandha chhayatole
Godhulibelay
Baganer jirno panchilete
Sadakalo daggulo
Deka dito bhoyongkor murti dhorhe.
Oikhane doityopuri,
Odrissho kuthuri theke tar
Mone-mane shona jeto haumaumkhau.
Lathi hate kunjobith
Khilikhili hashot dainiburi.
Kashiram dash
Poyare ja likechhilo hidimbar kotha
It-ber-kora shei panchiler ‘pore
Chhilo tari protshokho kahini.
Tari shongge seikhane nakkata shurponkha
Kalo kalo dage
kutumbita korechhilo.
Shororo borshotor pore
giyechhi shei shabek barite.
Dag bere geche,
Mugdho notuner tuli puronoke diyeche proshroy.
Intguli majhe-majhe khose giye
Pore ache rashkora.
Gaye gaye legeche onontomul,
Kalmegh lota,
Bichhutir jhar;
Bhatigache hoyeche jongol.
Purono boter pashe
UTheche verendagach mostoboro hoye.
Bairete shurponkha-hidimbar chihnuguli ache,
Mone tara konokhane nei.
Sheshene gelam fire ekbar khub hese niye
Jiboner bhittitar gaye
Poreche bistoro kalo dag,
Muro otiter moshilekha,
Bhanga ganthunite
Bhiru kolponar joto jotil kutil chihnuguli.
Majhe-majhe
Jedin bikelbelay
Badoler chhaya name
Sari sari talgache
Digir parite,
Durer akashe
Snigdho shugombhir
Megher gorjon othe guruguru,
Zhin zhin dake buno khejurer jhope,
Tokhon desher dike cheye
Bankachora alohin pothe
Vhengepora deuler murti dekhi;
Dirno chhade, tar jirno vhite
Namhin oboshad,–
Onirdishto shonkaguli nidrahin pecha,
Noirashher olik atyukti joto,
Durboler shorochito shotrur chehara.
Dhik re bhangonlaga mon,
Chintay chintay tor koto mithya anchhor keteche.
Dushtogroho sheje voy
Kalochihne mukhbhongi kore.
Kanta-agachar moto
Omongol nam niye
Atanker jongol uTheche.
Charidike sari sari jirno vhite
Vhengepora otiter biroop bikriti.
Kapurushe koriche bidrup.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • শৈশবের আতঙ্ক ও বাস্তবের মুখোমুখি: শৈশবে মনের ভয়ে যে কাল্পনিক দৈত্য-ডাইনি বা আতঙ্ক তৈরি হয়, পরিণত বয়সে তার রূপ বদলায় এবং তা বাস্তব জীবনের নানা সংকট, নিরাশা ও আশঙ্কার জঙ্গল হিসেবে ধরা দেয়।
  • ভীতু মনের সমালোচনা: মানুষের অবচেতন মনের ভয় ও কুসংস্কার কীভাবে কাল্পনিক শত্রুর জন্ম দেয় এবং মনকে আতঙ্কিত করে তোলে, তার এক অনবদ্য মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এই কবিতায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পরিশেষ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত