বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বীথিকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর ভাবোদ্দীপক ও গীতিধর্মী কবিতা হলো ‘বাদলরাত্রি’। বর্ষার অন্ধকার রাতের নির্জনতা, মেঘ-বিদ্যুতের চমক এবং দূরবর্তী প্রিয়জনের উদ্দেশ্যে হৃদয়ের ব্যাকুল আর্তি এই কবিতায় অত্যন্ত বেদনামধুর সুরে ফুটে উঠেছে। প্রকৃতির দুর্যোগময় রাতের সাথে বিরহী হৃদয়ের বেদনার এক অপূর্ব মেলবন্ধন এই রচনার মূল উপজীব্য।
Table of Contents
বীথিকা কাব্যগ্রন্থের বাদলরাত্রি কবিতা
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | বাদলরাত্রি |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | বীথিকা |
| প্রকাশের বছর | ১৯৩৫ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | গীতিধর্মী বিরহের কবিতা (Lyrical Elegy / Song-poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
সম্পূর্ণ কবিতা:
গান
কী বেদনা মোর জানো সে কি তুমি, জানো,
ওগো মিতা মোর, অনেক দূরের মিতা–
আজি এ নিবিড় তিমিরযামিনী
বিদ্যুৎ-সচকিতা।
বাদল বাতাস ব্যেপে
হৃদয় উঠিছে কেঁপে,
ওগো, সে কি তুমি জানো!
উৎসুক এই দুখজাগরণ,
এ কি হবে হায় বৃথা!
ওগো মিতা মোর, অনেক দূরের মিতা,
আমার ভবনদ্বারে
রোপণ করিলে যারে
সজল হাওয়ার করুণ পরশে
সে মালতী বিকশিতা–
ওগো, সে কি তুমি জানো।
তুমি যার সুর দিয়েছিলে বাঁধি
মোর কোলে আজ উঠিছে সে কাঁদি,
ওগো, সে কি তুমি জানো!
সেই যে তোমার বীণা সেকি বিস্মৃতা,
ওগো মিতা, মোর অনেক দূরের মিতা!

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
Ogo mita mor, onek durer mita,
Amar bhobonodware
Ropon korile jare
Shojol hawar korun poroshe
She maloti bikoshita--
Ogo, she ki tumi jano.
Tumi jar shur diyechhile bandhi
Mor kole aj uthiche she kandi,
Ogo, she ki tumi jano!
Shei je tomar bina sheki bishmrita,
Ogo mita, mor onek durer mita!
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- বর্ষার রাতে বিরহের আর্তি:“কী বেদনা মোর জানো সে কি তুমি, জানো, / ওগো মিতা মোর, অনেক দূরের মিতা– / আজি এ নিবিড় তিমিরযামিনী / বিদ্যুৎ-সচকিতা।”— ঘন অন্ধকার রাত এবং বিদ্যুতের চমকের মাঝে কবি তাঁর দূরবর্তী প্রিয়জনের কাছে জানতে চাইছেন, তাঁর হৃদয়ের এই নিদারুণ যাতনা প্রিয়জনের কাছে পৌঁছায় কি না। বিরহের সাথে প্রকৃতির রুদ্র রূপের যোগ এখানে সুস্পষ্ট।
- স্মৃতির বেদনা ও প্রকৃতির পুনর্জাগরণ:“আমার ভবনদ্বারে / রোপণ করিলে যারে / সজল হাওয়ার করুণ পরশে / সে মালতী বিকশিতা–“— প্রিয়জন একদা যে মালতীলতাটি রোপণ করে গিয়েছিলেন, বর্ষার সজল বাতাসে আজ তা প্রস্ফুটিত হয়েছে। প্রিয় মানুষটির অনুপস্থিতিতে এই ফুল কবির বিরহবেদনাকে আরও তীব্র ও সজীব করে তুলেছে।
- সুর ও স্মৃতির ক্রন্দন:“তুমি যার সুর দিয়েছিলে বাঁধি / মোর কোলে আজ উঠিছে সে কাঁদি, / ওগো, সে কি তুমি জানো! / সেই যে তোমার বীণা সেকি বিস্মৃতা,”— প্রিয়জনের বেঁধে দেওয়া সুরের বীণাটি আজ কবির কোলে একা একা ক্রন্দনরত। সেই সুর ও স্মৃতি কি দূরবর্তী মিতার মনে আজও বেঁচে আছে, নাকি তা কালের অতলে বিস্মৃত হয়ে গেছে—এই জিজ্ঞাসা দিয়েই কবিতাটির বিষাদময় সমাপ্তি ঘটেছে।










