রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–এর দীর্ঘ কাব্যজীবনের এক অনন্য সংযোজন বিচিত্রতা কাব্যগ্রন্থটি। ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে কবির সৃষ্টিশীল মন এক বিশেষ বাঁক নেয়—যেখানে একদিকে রয়েছে বিচিত্র বিষয়বস্তুর সমাবেশ, অন্যদিকে রয়েছে গভীর আত্মসমীক্ষা ও দার্শনিক অনুসন্ধান। নামের মধ্যেই গ্রন্থটির বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে: ‘বিচিত্রতা’—অর্থাৎ বৈচিত্র্য, বহুরূপতা, এবং একাধিক স্বর ও অনুভবের সহাবস্থান।
এই কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ তাঁর পূর্বপরিচিত কাব্যভাষা থেকে অনেক ক্ষেত্রে সরে এসে নতুন অভিব্যক্তির পথ খুঁজেছেন। এখানে প্রকৃতি, মানবমন, সমাজ, সময়, স্মৃতি ও ব্যক্তিগত অনুভব—সবই এসেছে ভিন্ন ভিন্ন রূপে। কবিতাগুলি কখনো গীতিময়, কখনো চিন্তাশীল, আবার কখনো প্রায় প্রবন্ধধর্মী। এই বহুমাত্রিকতা গ্রন্থটিকে একরৈখিক পাঠের বাইরে নিয়ে যায় এবং পাঠককে প্রতিটি কবিতায় নতুনভাবে প্রবেশ করতে আহ্বান জানায়।
বিচিত্রতা–র একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কবির আত্মসংলাপ। এই সময় রবীন্দ্রনাথ জীবনের পরিণত পর্যায়ে—যেখানে অভিজ্ঞতা গভীর, কিন্তু নিশ্চিত উত্তর কম। তাই এই গ্রন্থে বারবার উঠে আসে প্রশ্ন: মানুষের অবস্থান কোথায়, জীবনের অর্থ কী, সৃষ্টির সঙ্গে স্রষ্টার সম্পর্ক কেমন। কবি এখানে উপদেশ দেন না; তিনি ভাবেন, সংশয় করেন, কখনো দ্বিধাগ্রস্ত হন। এই সংশয়ই গ্রন্থটিকে আধুনিক করে তোলে।
ভাষা ও ছন্দের ক্ষেত্রেও বিচিত্রতা লক্ষণীয়। কিছু কবিতায় সহজ, প্রায় কথ্য ভঙ্গি; আবার কিছু কবিতায় ঘনীভূত প্রতীক ও রূপকের ব্যবহার। রবীন্দ্রনাথ এখানে ছন্দের বাঁধন ঢিলা করেছেন, যাতে ভাবের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত না হয়। ফলে কবিতাগুলি কখনো মুক্তছন্দের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যা তৎকালীন বাংলা কবিতার ধারায় এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
এই গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ নতুন মাত্রা পায়। মানুষ এখানে কোনো আদর্শ প্রতিমা নয়; সে ত্রুটিপূর্ণ, প্রশ্নবিদ্ধ, তবু সম্ভাবনাময়। কবি বিশ্বাস করেন—বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়েই মানুষের সত্য প্রকাশ পায়। একরূপতা নয়, বরং বহুত্বই জীবনের আসল সৌন্দর্য।
সব মিলিয়ে, বিচিত্রতা কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথের কাব্যজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এটি দেখায় কীভাবে এক পরিণত কবি নিজের সৃষ্টিকে নতুন করে প্রশ্ন করেন, নতুন পথে হাঁটেন এবং বৈচিত্র্যকেই সত্যের একটি রূপ হিসেবে গ্রহণ করেন। এই গ্রন্থ পাঠ মানে শুধু কবিতা পড়া নয়—একজন কবির অন্তর্লোকের বহুরঙা মানচিত্রে প্রবেশ করা।
বিচিত্রতা কাব্যগ্রন্থ কবিতা সূচিঃ
- আশীর্বাদ
- পুষ্প
- বধূ
- অচেনা
- পসারিনী
- গোয়ালিনী
- কুমার
- আরশি
- দান
- হার
- মরীচিকা
- শ্যামলা
- একাকিনী
- সাজ
- প্রকাশিতা
- বরবধূ
- ছায়াসঙ্গিনী
- প্রভেদ
- পুষ্পচয়িনী
- ভীরু
- যুগল
- বেসুর
- স্যাকরা
- নীহারিকা
- কালো ঘোড়া
- অনাগতা
- ঝাঁকড়াচুল
- দ্বিধা
- যাত্রা
- দ্বারে
- কন্যাবিদায়
- বিদায়

