‘ভগ্নহৃদয়’ কাব্যগ্রন্থের ‘ত্রয়োবিংশ সর্গ’ — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ভগ্নহৃদয়’ কাব্যগ্রন্থের ত্রয়োবিংশ সর্গে কবির গভীর বিষাদ, শূন্যতা ও মুরলাকে হারানোর বেদনা প্রকাশ পেয়েছে। সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে কবির একাকিত্ব ও প্রিয়জনকে খুঁজে ফেরার আকুলতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। পরে চপলার প্রবেশে কবিতার আবেগ আরও করুণ রূপ নেয়।

কবিতার মৌলিক তথ্য

বিষয়তথ্য
কবিতার নামত্রয়োবিংশ সর্গ
কাব্যগ্রন্থভগ্নহৃদয়
কবিরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রকাশকাল১৮৮১
কাব্যের ধরনগীতি-কাব্য
অংশত্রয়োবিংশ সর্গ
মূল গ্রন্থের পৃষ্ঠা১৬৩–১৬৫
ভাষাবাংলা

কাব্যগ্রন্থ ও প্রকাশ-প্রেক্ষাপট

‘ভগ্নহৃদয়’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রারম্ভিক পর্যায়ের একটি গীতি-কাব্য। গ্রন্থটি ১৮৮১ সালে প্রকাশিত হয় এবং মোট ৩৪টি সর্গে বিভক্ত।

গ্রন্থটির ত্রয়োবিংশ সর্গটি মূল গ্রন্থের ১৬৩–১৬৫ পৃষ্ঠায় অবস্থান করছে।

এই সর্গে প্রধানত কবি ও চপলার সংলাপের মাধ্যমে মুরলার অনুপস্থিতি, বিচ্ছেদ এবং কবির মানসিক বিপর্যয় প্রকাশিত হয়েছে।

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি, লেখক, নাট্যকার, সংগীতস্রষ্টা ও চিন্তক। তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রেম, বিচ্ছেদ, প্রকৃতি, মানবসম্পর্ক, একাকিত্ব ও জীবনবোধের নানা রূপ তাঁর রচনায় প্রকাশ পেয়েছে।

‘ভগ্নহৃদয়’ তাঁর সাহিত্যজীবনের প্রারম্ভিক পর্যায়ের রচনা। এই পর্যায়ের রচনায় ব্যক্তিগত আবেগ, প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, বিচ্ছেদ ও নাটকীয়তার একটি বিশেষ উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

সম্পূর্ণ কবিতা

ত্রয়োবিংশ সর্গ

কবি

মুরলা কোথায়?

সে বালা কোথায় গেল? কোথায়? কোথায়?

সন্ধ্যা হয়ে এল ওই, কিন্তু রে মুরলা কই?

খুঁজে খুঁজে ভ্রমি তারে হেথায় হোথায়?

সে মোর সন্ধ্যার দীপ, কোথা গেল বল্!

একটি আঁধার ঘরে একাকী সে জ্বলিত রে

সন্ধ্যার দীপের মত বিষণ্ন উজ্জ্বল।

সন্ধ্যা হ’লে ধীরে ধীরে আসিতাম ঘরে ফিরে

শ্রান্ত পদক্ষেপে অতি মৃদু গান গেয়ে,

সুদূর প্রান্তর হয়ে দেখিতাম চেয়ে–

মোর সে বিজন ঘরে শূন্য বাতায়ন-‘ পরে

একটি সন্ধ্যার দীপ আলো করে আছে–

আমারি– আমারি তরে পথ চেয়ে আছে–

আমারেই স্নেহভরে ডাকিতেছে কাছে।

হা মুরলা, কোথা গেলি, মুরলা আমার?

ওই দেখ্ ক্রমশই বাড়িছে আঁধার!

সমস্ত দিনের পরে কবি তোর এল ঘরে–

প্রশান্ত মুখানি কেন দেখি না তোমার?

ওই ত দ্বারের কাছে দীপটি জ্বালানো আছে,

আসন আমার ওই রেখেছিল পেতে–

আমি ভালবাসি ব’লে যতনে আনিয়া তুলে

রজনীগন্ধার মালা দিয়েছিস গেঁথে!

কিন্তু রে দেখি না কেন তোর মুখখানি?

শত শত বার ক’রে ভ্রমিতেছি ঘরে ঘরে–

কোথাও বসিতে নারি, শান্তি নাহি মানি!

হুহু করি উঠিতেছে সন্ধ্যার বাতাস,

প্রতি ঘরে ভ্রমিতেছে করি হাহুতাশ!

কাঁপে দীপাশিখা তাহে, নিভিয়া যাইতে চাহে–

প্রাচীরে চমকি উঠে ছায়ার আঁধার!

সে মুখ দেখি নে কেন? সে স্বর শুনি নে কেন?

প্রাণের ভিতরে কেন করে হাহাকার?

জানি না হৃদয়খানা ফাটিয়া কেন রে

আঁখি হতে শতধারে অশ্রুবারি ঝরে?

কে যেন প্রাণের কাছে কি-জানি-কি বলিতেছে,

কি-জানি-কি ভাবিতেছি ভাবিয়া না পাই!

কোথা যাই– কোথা যাই–বল্ কোথা যাই!

মুরলা রে–মুরলা, কোথায়?

কোথায় গেলি রে বালা? কোথায়? কোথায়?

[চপলার প্রবেশ]

চপলা

কবি গো, কোথায় গেল মুরলা আমার?

দারুণ মনের জ্বালা আর সহিল না বালা–

বুঝি চ’লে গেল তাই, ফিরিবে না আর!

বুঝি সে মুরলা মোর, সমস্ত হৃদয়

তোমারে সঁপিয়াছিল– আর কারে নয়।

বুঝি বা সে ভাল ক’রে পেলে না আদর,

কাঁদিয়া চলিয়া গেল দুর দেশান্তর।

চল কবি, মুরলারে খুঁজিবারে যাই–

আরেকটি বার যদি তার দেখা পাই,

ভাল ক’রে তারে তুমি করিও যতন,

কবি গো কহিও তারে স্নেহের বচন।

করুণ মুখানি তার বুকে তুলে নিও,

অশ্রুজলধারা তার মুছাইয়া দিও!

Romanized Version

Trayobingsho Sargo

Kobi

Murla kothay?

Se bala kothay gelo? Kothay? Kothay?

Shondhya hoye elo oi, kintu re Murla koi?

Khunje khunje bhromi tare hethay hothay?

Se mor shondhyar dip, kotha gelo bol!

Ekti andhar ghore ekaki se jolito re

Shondhyar diper moto bishonno ujjwol.

Shondhya hole dhire dhire asitam ghore phire

Shranto podokkhepe oti mridu gaan geye,

Sudur prantor hoye dekhtam cheye–

Mor se bijon ghore shunyo batayon-‘ pore

Ekti shondhyar dip alo kore achhe–

Amari– amari tore poth cheye achhe–

Amarei sneho bhore daktitechhe kachhe.

Ha Murla, kotha geli, Murla amar?

Oi dekh kromoshoi barichhe andhar!

Shomosto diner pore kobi tor elo ghore–

Proshanto mukhani keno dekhi na tomar?

Oi to dware kachhe dipti jalano achhe,

Ason amar oi rekhechhili pete–

Ami bhalobashi bole jotone aniya tule

Rojonigondhar mala diyechhis genthe!

Kintu re dekhi na keno tor mukhkhani?

Shot shot bar kore bhromitechhi ghore ghore–

Kothao bosite nari, shanti nahi mani!

Hu hu kore uthitechhe shondhyar batas,

Proti ghore bhromitechhe kori hahutash!

Kape dipashikha tahe, nibhiya jaite chahe–

Prachire chomki othe chhayar andhar!

Se mukh dekhi ne keno? Se swor shuni ne keno?

Praner bhitore keno kore hahakar?

Jani na hridoykhana phatiya keno re

Ankhi hote shotodhare oshru-bari jhore?

Ke jeno praner kachhe ki-jani-ki bolitechhe,

Ki-jani-ki bhabitechhi bhabiya na pai!

Kotha jai– kotha jai–bol kotha jai!

Murlar e–Murla, kothay?

Kothay geli re bala? Kothay? Kothay?

[Choplar probesh]

Chopla

Kobi go, kothay gelo Murla amar?

Darun moner jwala ar sohil na bala–

Bujhi ch’le gelo tai, phiribe na ar!

Bujhi se Murla mor, shomosto hridoy

Tomare sompiyachhilo– ar kare noy.

Bujhi ba se bhalo kore pele na ador,

Kandia choliya gelo dur deshantor.

Chol kobi, Murlare khunjibare jai–

Arekti bar jodi tar dekha pai,

Bhalo kore tare tumi korio joton,

Kobi go kohio tare sneher bochon.

Korun mukhani tar buke tule nio,

Oshrujoldhara tar muchhaiya dio!

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

এই সর্গের কেন্দ্রীয় অনুভূতি হলো বিরহ, অনুপস্থিতি এবং প্রিয়জনকে হারানোর আশঙ্কা।

কবি মুরলাকে খুঁজছেন। কিন্তু মুরলার অনুপস্থিতি শুধু একজন মানুষের অনুপস্থিতি নয়; কবির কাছে তা যেন তাঁর ঘরের আলো নিভে যাওয়ার সমান।

“সে মোর সন্ধ্যার দীপ”—এই উপমার মধ্য দিয়ে মুরলার উপস্থিতির গুরুত্ব প্রকাশ পেয়েছে। সন্ধ্যার অন্ধকারে একটি প্রদীপ যেমন ঘরকে আলোকিত করে, মুরলাও তেমনি কবির একাকী জীবনে আলো ও সঙ্গের প্রতীক।

মুরলা নেই। কিন্তু তার রেখে যাওয়া দীপ, আসন ও রজনীগন্ধার মালা কবিকে তার উপস্থিতির স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। ফলে উপস্থিতির চিহ্নগুলোই অনুপস্থিতির বেদনাকে আরও গভীর করে তোলে।

কবিতার প্রধান প্রতীক ও চিত্রকল্প

সন্ধ্যার দীপ
মুরলার উপস্থিতি, স্নেহ ও আশ্রয়ের প্রতীক। একই সঙ্গে এটি একাকিত্বের অন্ধকারে মানবিক আলোর প্রতীক।

সন্ধ্যার অন্ধকার
বিচ্ছেদ ও মানসিক শূন্যতার প্রতীক।

রজনীগন্ধার মালা
মুরলার ভালোবাসা, যত্ন ও স্মৃতির দৃশ্যমান চিহ্ন।

সন্ধ্যার বাতাস
কবির অন্তরের অস্থিরতা ও হাহাকারকে প্রকৃতির মধ্যে প্রতিফলিত করে।

দীপাশিখার কাঁপন
কবির মানসিক অস্থিরতা এবং আশার ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসার চিত্রকল্প।

কবিতাটির দার্শনিক তাৎপর্য

এই সর্গে অনুপস্থিতি একটি গভীর অস্তিত্বগত অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে। প্রিয় মানুষটি উপস্থিত না থাকলেও তার স্মৃতি চারপাশের প্রতিটি বস্তুতে থেকে যায়।

দীপটি জ্বলছে, আসন পাতা আছে, রজনীগন্ধার মালা রয়েছে—কিন্তু যার জন্য এই সমস্ত আয়োজন, সেই মানুষটি নেই।

ফলে বস্তুগত উপস্থিতি এবং মানুষের অনুপস্থিতির মধ্যে একটি তীব্র বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত কবির প্রশ্ন—

“কোথা যাই– কোথা যাই–বল্ কোথা যাই!”

এ শুধু মুরলাকে খোঁজার প্রশ্ন নয়; প্রিয়জনকে হারিয়ে দিশাহীন হয়ে পড়া একটি হৃদয়ের প্রশ্ন।

সংক্ষেপে

  • ‘ভগ্নহৃদয়’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রারম্ভিক পর্যায়ের গীতি-কাব্য।
  • গ্রন্থটি ১৮৮১ সালে প্রকাশিত এবং ৩৪টি সর্গে বিভক্ত।
  • ত্রয়োবিংশ সর্গ মূল গ্রন্থের ১৬৩–১৬৫ পৃষ্ঠায় রয়েছে।
  • এই সর্গের প্রধান চরিত্র কবি, মুরলা ও চপলা।
  • কবির মুরলাকে খুঁজে ফেরার মধ্য দিয়ে বিরহ, একাকিত্ব ও শূন্যতার অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে।
  • সন্ধ্যার দীপ, অন্ধকার, বাতাস ও রজনীগন্ধার মালা কবিতাটির গুরুত্বপূর্ণ চিত্রকল্প।

উৎস

  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘ভগ্নহৃদয়’, ১৮৮১।
  • ভগ্নহৃদয়, ত্রয়োবিংশ সর্গ, মূল গ্রন্থের ১৬৩–১৬৫ পৃষ্ঠা।
  • Bichitra: Online Tagore Variorum — রবীন্দ্রনাথের পাণ্ডুলিপি ও পাঠ-তুলনা প্রকল্প।

মন্তব্য করুন