ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলীর ‘বার বার, সখি, বারণ করনু’ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্রজবুলি ভাষায় রচিত বৈষ্ণব পদাবলীর ধাঁচের অনন্য সৃষ্টি হলো ‘বার বার, সখি, বারণ করনু’। শ্রীকৃষ্ণের মথুরাগমনের পর ব্রজের বিরহবিধুর রাধার তীব্র অভিমান, বেদনা এবং মথুরার নৃপতির সাথে বৃন্দাবনের রাখালিয়ার সম্পর্কের ব্যবধানবোধ এ পদে অপূর্ব মরমি সুরে ঝংকৃত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামবার বার, সখি, বারণ করনু
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (ভানুসিংহ ঠাকুর)
মূল কাব্যগ্রন্থভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী (অনলাইন কিছু প্রতিলিপিতে ভুলবশত ‘কড়ি ও কোমল’ হিসেবে উল্লেখিত হলেও এটি ব্রজবুলিতে রচিত এবং ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’র ১৮ সংখ্যক গান/পদ)
রচনাকাল/প্রকাশ১৮৭৮-১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দ (১২৮৫-১২৯১ বঙ্গাব্দ)
রাগ ও তালরাগ: ইমনকল্যাণ; পদাবলী কীর্তনাঙ্গ সুর
কবিতার ধরনব্রজবুলিতে রচিত বৈষ্ণব বিরহ-পদ ও ভাবসম্মিলনধর্মী গীতি (Vaishnava Padavali Lyric)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

কৈশোরে প্রাচীন মৈথিলী ও বৈষ্ণব কবিদের (বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস) কাব্যের ভক্ত হয়ে রবীন্দ্রনাথ ‘ভানুসিংহ’ ছদ্মনামে ব্রজবুলির মিষ্টি সুরে পদ রচনা শুরু করেন। কৃষ্ণ বৃন্দাবনের গোপিনী ও রাখালদের ফেলে মথুরার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে রাজভোগে মেতেছেন। রাধার সখী যখন মথুরায় গিয়ে শ্যামের কাছে রাধার বিরহসংবাদ পৌঁছে দিতে চায়, তখন রাধা তীব্র বেদনায় তাকে বাধা দেন। রাধার ক্ষোভ ও আক্ষেপ—যিনি এখন মথুরার অধিপতি ও বিপুল ধন-মানের অধিকারী, তিনি কি আর সেই আগের ‘হমারই শ্যাম’ (আমাদের শ্যাম) আছেন? তাঁর কাছে দীনহীন গোপিনীর প্রেমের কোনো মূল্য নেই। মথুরার নৃপতির রাজকীয় সভায় গেলে সখী যদি অবহেলার শিকার হয়, তবে ছিন্ন কুসুমের মতো সে মাটিতে ঝরে পড়বে। পদের শেষে ভণিতার মাধ্যমে ভানুসিংহ রাধাকে আশ্বস্ত করে বলেন যে শ্যামের প্রেমকে অবুঝ রাধা এখনো পুরোপুরি চিনতে পারেনি।

সম্পূর্ণ কবিতা:

বার বার, সখি, বারণ করনু   ন যাও মথুরাধাম
বিসরি প্রেমদুখ রাজভোগ যথি   করত হমারই শ্যাম।
ধিক্ তুঁহু দাম্ভিক, ধিক্ রসনা ধিক্,   লইলি কাহারই নাম।
বোল ত সজনি, মথুরা‐অধিপতি   সো কি হমারই শ্যাম।
ধনকো শ্যাম সো, মথুরাপুরকো,   রাজ্যমানকো হোয়।
নহ পীরিতিকো, ব্রজকামিনীকো,   নিচয় কহনু ময় তোয়।

যব তুঁহু ঠারবি সো নব নরপতি   জনি রে করে অবমান—
ছিন্নকুসুমসম ঝরব ধরা‐’পর,   পলকে খোয়ব প্রাণ।
বিসরল বিসরল সো সব বিসরল   বৃন্দাবনসুখসঙ্গ—
নব নগরে, সখি, নবীন নাগর—   উপজল নব নব রঙ্গ।
ভানু কহত, অয়ি বিরহকাতরা,   মনমে বাঁধহ থেহ—
মুগুধা বালা, বুঝই বুঝলি না   হমার শ্যামক লেহ॥

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Bar bar, sokhi, baron kornu na jao Mothuradham
Bisori premodukho rajbhog jothi koroto homaroi Shyam.
Dhik tuhu dambhiko, dhik roshona dhik, loili kaharoi nam.
Bolo to shojoni, Mothura-odhipoti so ki homaroi Shyam.
Dhonko Shyam so, Mothurapurko, rajyomanko hoy.
Naho piritiko, Brojokaminiko, nichoy kohnu moy toy.
Jobo tuhu tharobi so nobo noropoti joni re kore oboman—
Chhinnokusumosomo jhorobo dhora-‘por, poloke khoyobo pran.
Bishorolo bishorolo so shob bishorolo Brindabonoshukhosongo—
Nobo nogore, sokhi, nobin nagor— upojolo nobo nobo rongo.
Bhanu kohoto, oyi birohokatona, monome bandhoho theho—
Mugudha bala, bujhoi bujholi na homar Shyamoko leho.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • মথুরার অধিপতি বনাম ব্রজের রাখালিয়া:
    “বোল ত সজনি, মথুরা‐অধিপতি সো কি হমারই শ্যাম। / ধনকো শ্যাম সো, মথুরাপুরকো, রাজ্যমানকো হোয়। / নহ পীরিতিকো, ব্রজকামিনীকো, নিচয় কহনু ময় তোয়।”
    — প্রেমের কৃষ্ণ আর রাজদণ্ডের কৃষ্ণ এক নন। রাধার অভিমানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, মথুরার ঐশ্বর্য ও রাজসম্মান যার সঙ্গী, সে আর ব্রজের সরল প্রেমিকা গোপিনীদের আপনজন থাকতে পারে না।
  • অপমানের ভয় ও আত্মমর্যাদাবোধ:
    “যব তুঁহু ঠারবি সো নব নরপতি জনি রে করে অবমান— / ছিন্নকুসুমসম ঝরব ধরা‐’পর, পলকে খোয়ব প্রাণ।”
    — নতুন রাজার দরবারে ব্রজের দরিদ্র গোপবালার প্রেমের বার্তা নিয়ে গেলে যদি প্রত্যাখ্যাত ও অপমানিত হতে হয়, তবে সেই অবমাননা সহ্য করা অসম্ভব হবে; ছিন্ন ফুলের মতো মাটিতে আছড়ে পড়ে প্রাণ বিসর্জন দিতে হবে।
  • ভানুসিংহের ভণিতা ও শাশ্বত আশ্বাস:
    “ভানু কহত, অয়ি বিরহকাতরা, মনমে বাঁধহ থেহ— / মুগুধা বালা, বুঝই বুঝলি না হমার শ্যামক লেহ॥”
    — প্রাচীন পদাবলীর রীতি মেনে কবি ভানুসিংহ রাধার অভিমানকে স্নেহের চোখে দেখেছেন। তিনি বিরহকাতরা মুগ্ধা রাধাকে ধৈর্য ধরতে (‘মনমে বাঁধহ থেহ’) বলেন, কারণ কৃষ্ণের ভালোবাসার গভীরতা ও রহস্য রাধার মান-অভিমানের অতীত।

উৎস:

পদটির মূল ব্রজবুলি পাঠ, ছন্দ এবং ঐতিহাসিক সংকলন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী) থেকে সতর্কতার সাথে সংকলন ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন