আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

মানসী কাব্যগ্রন্থের ‘বিদায়’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মানসী’ (১৮৯০) কাব্যগ্রন্থের অন্যতম বিখ্যাত ও উদ্দীপনামূলক কবিতা হলো ‘বিদায়’। এই কবিতায় ব্যক্তিগত প্রেম ও গার্হস্থ্য সুখের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর মানবকল্যাণ বা দেশপ্রেমের ডাকে সাড়া দিয়ে এক সংগ্রামীর সংসার ত্যাগের মর্মস্পর্শী অথচ তেজোদৃপ্ত চিত্র ফুটে উঠেছে।

কবিতার মূল তথ্য
বিষয়বিবরণ
কবিতার নামবিদায়
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থমানসী
প্রকাশের বছর১৮৯০ (১২৯৭ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনদেশপ্রেম, কর্তব্যবোধ ও বিরহের কবিতা (Patriotic, Duty-bound and Farewell Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৮৯০ সালে প্রকাশিত ‘মানসী’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের কাব্যে প্রথমবারের মতো স্বদেশপ্রেম, সমাজচেতনা ও বৃহত্তর জগতের প্রতি দায়িত্ববোধের এক জোরালো প্রকাশ দেখা যায়। ‘বিদায়’ কবিতায় নায়ক তার ঘুমন্ত ও প্রেমময়ী স্ত্রীকে পেছনে ফেলে এক বৃহত্তর সংগ্রামের ডাকে সাড়া দিয়ে ঘর ছাড়ছে। সে বুঝতে পেরেছে, ব্যক্তিগত প্রেমের সুখ অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। বিশ্বজগতের ডাকে যখন আত্মনিয়োগ করতে হয়, তখন নির্মম ও কঠোর হয়েই মায়ার বাঁধন ছিন্ন করতে হয়।

বিদায় – সম্পূর্ণ কবিতা

বিভাস

      ​​ এবার চলিনু তবে।

সময় হয়েছে নিকট, এখন

      ​​ বাঁধন ছিঁড়িতে হবে।

উচ্ছল জল করে ছলছল,

জাগিয়া উঠেছে কলকোলাহল,

তরণীপতাকা চলচঞ্চল

      ​​ কাঁপিছে অধীর রবে।

সময় হয়েছে নিকট, এখন

      ​​ বাঁধন ছিঁড়িতে হবে।

 

আমি নিষ্ঠুর কঠিন কঠোর

      ​​ নির্মম আমি আজি

আর নাহি দেরি, ভৈরবভেরী

      ​​ বাহিরে উঠছে বাজি!

তুমি ঘুমাইছ নিমীলনয়নে,

কাঁপিয়া উঠিছ বিরহস্বপনে,

প্রভাতে জাগিয়া শূন্য শয়নে

      ​​ কাঁদিয়া চাহিয়া রবে।

সময় হয়েছে নিকট, এখন

      ​​ বাঁধন ছিঁড়িতে হবে।

 

অরুণ তোমার তরুণ অধর,

      ​​ করুণ তোমার আঁখি,

অমিয়বচন সোহাগবচন

      ​​ অনেক রয়েছে বাকি।

পাখি উড়ে যাবে সাগরের পার,

সুখময় নীড় পড়ে রবে তার–

মহাকাশ হতে ওই বারে বারে

      ​​ আমারে ডাকিছে সবে।

সময় হয়েছে নিকট, এখন

      ​​ বাঁধন ছিঁড়িতে হবে।

 

বিশ্বজগৎ আমারে মাগিলে

      ​​ কে মোর আত্মপর!

আমার বিধাতা আমাতে জাগিলে

      ​​ কোথায় আমার ঘর!

কিসেরি বা সুখ, ক’দিনের প্রাণ?

ওই উঠিয়াছে সংগ্রাম গান,

অমর মরণ রক্তচরণ

      ​​ নাচিছে সগৌরবে।

সময় হয়েছে নিকট, এখন

      ​​ বাঁধন ছিঁড়িতে হবে।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Romanized Version
Ebar cholinu tobe.
Shomoy hoyechhe nikot, ekhon
Bnnadhon chhnirite hobe.
Uchchhol jol kore chholchhol,
Jagiya uthechhe kolokolahol,
Toronipotaka cholochonchol
Knapichhe odhir robe.
Shomoy hoyechhe nikot, ekhon
Bnnadhon chhnirite hobe.
Ami nishthur kothin kothor
Nirmom ami aji
Ar nahi deri, bhoirobbheri
Bahire uthchhe baji!
Tumi ghumaichho nimilonoyone,
Knapiya uthichho birohoshwopone,
Probhate jagiya shunnyo shoyone
Knadiya chahiya robe.
Shomoy hoyechhe nikot, ekhon
Bnnadhon chhnirite hobe.
Orun tomar torun odhor,
Korun tomar nnkhi,
Omiyobochon shohagbochon
Onek royechhe baki.
Pakhi ure jabe shagorer par,
Shukhomoy nir pore robe tar–
Mohakash hote oi bare bare
Amare dakichhe shobe.
Shomoy hoyechhe nikot, ekhon
Bnnadhon chhnirite hobe.
Bishwojogot amare magile
Ke mor atmopor!
Amar bidhata amate jagile
Kothay amar ghor!
Kisheri ba shukh, k’diner pran?
Oi uthiyachhe shonggram gan,
Omor moron roktochoron
Nachichhe shogourobe.
Shomoy hoyechhe nikot, ekhon
Bnnadhon chhnirite hobe.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
  • বৃহত্তর আহ্বানে ঘর-ত্যাগ:
    “উচ্ছল জল করে ছলছল, / জাগিয়া উঠেছে কলকোলাহল… সময় হয়েছে নিকট, এখন / বাঁধন ছিঁড়িতে হবে।”
    — বাইরের পৃথিবী আজ কর্মচঞ্চল। তরণীর পতাকা উড়ছে, জলের ছলছল শব্দে যেন বিশ্বজগতের ডাক শোনা যাচ্ছে। তাই গার্হস্থ্য জীবনের আরাম ও মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে বৃহত্তর জীবনের পথে বেরিয়ে পড়ার সময় এখন উপস্থিত।
  • প্রেম বনাম কর্তব্যের দ্বন্দ্ব:
    “আমি নিষ্ঠুর কঠিন কঠোর / নির্মম আমি আজি… প্রভাতে জাগিয়া শূন্য শয়নে / কাঁদিয়া চাহিয়া রবে।”
    — নায়ক জানে তার এই চলে যাওয়াটা তার ঘুমন্ত স্ত্রীর জন্য কতটা বেদনার হবে। সকালে উঠে শূন্য বিছানা দেখে স্ত্রী কাঁদবে, তাদের অনেক প্রেমের কথা (অমিয়বচন) বাকি রয়ে যাবে। তবুও বৃহত্তর কর্তব্যের খাতিরে (বাহিরে ভৈরবভেরী বাজছে) তাকে আজ নির্মম ও পাষাণ হতে হচ্ছে।
  • সংগ্রাম ও আত্মোৎসর্গের মহিমা:
    “বিশ্বজগৎ আমারে মাগিলে / কে মোর আত্মপর!… ওই উঠিয়াছে সংগ্রাম গান, / অমর মরণ রক্তচরণ / নাচিছে সগৌরবে।”
    — কবিতাটির সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ হলো এটি। বিশ্বজগৎ যখন ডাকে, তখন কে আপন আর কে পর, তার কোনো ভেদাভেদ থাকে না। জীবন অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী, তাই ব্যক্তিগত সুখের কোনো মূল্য নেই। সেখানে বেজে উঠেছে সংগ্রামের গান। এই সংগ্রামে জীবন দিলে তা হবে এক ‘অমর মরণ’ বা গৌরবের মৃত্যু। আত্মোৎসর্গের এই রক্তিম ও মহান আদর্শের কাছেই কবি নিজেকে সঁপে দিয়েছেন।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (মানসী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও আপনার দেওয়া পূর্বনির্ধারিত বিন্যাস অনুযায়ী কোনো অংশ বাদ না দিয়ে সম্পূর্ণভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। (বি.দ্র. আপনার প্রদত্ত তথ্যের অপ্রয়োজনীয় অংশ পরিহার করে আর্কাইভের জন্য একটি পরিচ্ছন্ন ও প্রামাণ্য রূপ তৈরি করা হয়েছে)।

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত