বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শিশু ভোলানাথ’ কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও রূপকপ্রধান শিশুতোষ কবিতা হলো ‘দুই আমি’। মানুষের অন্তরে একই সাথে বিদ্যমান দুটি সত্তা—একটি পার্থিব ও লোকচক্ষুর সামনে পরিচিত রূপ, অন্যটি কল্পনার আকাশে ডানা মেলা স্বাধীন রূপ—এক শিশুর নির্মল উপলব্ধির মাধ্যমে এ কবিতায় চমৎকারভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
Table of Contents
দুই আমি কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | দুই আমি |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | শিশু ভোলানাথ |
| প্রকাশের বছর | ১৯২২ (১৩২৯ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | শিশুতোষ ও মনস্তাত্ত্বিক লিরিক কবিতা (Psychological Children’s Poetry) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৯২২ সালে প্রকাশিত ‘শিশু ভোলানাথ’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ শিশুর সহজাত বিস্ময়বোধ এবং তার ভেতরের অসীম ভাবনার রাজ্যকে রূপায়িত করেছেন। মেঘ যেমন কখনো আকাশে ভেসে বেড়ায় আবার কখনো বৃষ্টি হয়ে মাটিতে ঝরে পড়ে, তেমনি শিশুর ব্যক্তিত্বেও রয়েছে দ্বৈত রূপ। বাহ্যিক জীবনে সে বাধ্য ও চেনা এক সন্তান, কিন্তু তার অবচেতন বা কল্পনার জগতে সে সম্পূর্ণ স্বাধীন এক পরিব্রাজক। এই অভ্যন্তরীণ দ্বৈততাকে কবি শিশুর সহজ-সরল বয়ানে তুলে ধরেছেন।
দুই আমি সম্পূর্ণ কবিতা:
বৃষ্টি কোথায় নুকিয়ে বেড়ায়
উড়ো মেঘের দল হয়ে,
যেই দেখা দেয় আর-এক ধারায়
শ্রাবণ-ধারার জল হয়ে।
আমি ভাবি চুপটি করে
মোর দশা হয় ঐ যদি!
কেই বা জানে আমি আবার
আর-একজনও হই যদি!
একজনারেই তোমরা চেন
আর-এক আমি কারোই না।
কেমনতরো ভাবখানা তার
মনে আনতে পারই না।
হয়তো বা ঐ মেঘের মতোই
নতুন নতুন রূপ ধরে
কখন যে সে ডাক দিয়ে যায়,
কখন থাকে চুপ করে।
কখন বা সে পুবের কোণে
আলো-নদীর বাঁধ বাঁধে,
কখন বা সে আধেক রাতে
চাঁদকে ধরার ফাঁদ ফাঁদে।
শেষে তোমার ঘরের কথা
মনেতে তার যেই আসে,
আমার মতন হয়ে আবার
তোমার কাছে সেই আসে।
আমার ভিতর লুকিয়ে আছে
দুই রকমের দুই খেলা,
একটা সে ঐ আকাশ-ওড়া,
আরেকটা এই ভুঁই-খেলা।
দুই আমি সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
Brishti kothay nukiye beray
Uro megher dol hoye,
Jei dekha dey ar-ek dharay
Shrabon-dharar jol hoye.
Ami bhabi chupti kore
Mor dosha hoy oi jodi!
Kei ba jane ami abar
Ar-ekjono hoi jodi!
Ekjonarei tomra cheno
Ar-ek ami karoi na.
Kemontoro bhabkhana tar
Mone ante paroi na.
Hoyto ba oi megher motoi
Notun notun rup dhore
Kokhon je she dak diye jay,
Kokhon thake chup kore.
Kokhon ba she puber kone
Alo-nodir bandh bandhe,
Kokhon ba she adhek rate
Chandke dhorar phand phande.
Sheshe tomar ghorer kotha
Monete tar jei ashe,
Amar moton hoye abar
Tomar kachhe shei ashe.
Amar bhitor lukiye achhe
Dui rokomer dui khela,
Ekta she oi akash-ora,
Arekta ei bhui-khela.
দুই আমি কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- মেঘ ও বৃষ্টির দ্বৈত উপমা:“বৃষ্টি কোথায় নুকিয়ে বেড়ায় / উড়ো মেঘের দল হয়ে, / যেই দেখা দেয় আর-এক ধারায় / শ্রাবণ-ধারার জল হয়ে।”— আকাশে উড়ে বেড়ানো অদৃশ্য জলকণা এবং মাটিতে নেমে আসা বৃষ্টির রূপান্তরকে শিশুটি তার নিজের অস্তিত্বের রূপক হিসেবে গ্রহণ করে।
- অচেনা অন্তসত্তার সন্ধান:“একজনারেই তোমরা চেন / আর-এক আমি কারোই না। / কেমনতরো ভাবখানা তার / মনে আনতে পারই না।”— সমাজের মানুষ কেবল বাইরের চেনা সত্তাটিকে চেনে, কিন্তু অন্তরের যে কল্পনাপ্রবণ ও রহস্যময় সত্তা রয়েছে, তা পার্থিব মানুষের ধারণার সম্পূর্ণ বাইরে। সে কখনো চাঁদের ফাঁদ ফাঁদে, কখনো আলোর নদীতে বাঁধ দেয়।
- আকাশ ও মাটির মেলবন্ধন:“আমার ভিতর লুকিয়ে আছে / দুই রকমের দুই খেলা, / একটা সে ঐ আকাশ-ওড়া, / আরেকটা এই ভুঁই-খেলা।”— শেষ চরণে মানবজীবনের পরম সত্যটি উন্মোচিত হয়। মানুষের এক সত্তা অসীম কল্পনার আকাশে উড়তে চায় (‘আকাশ-ওড়া’), আর অন্য সত্তা স্নেহ-ভালোবাসা ও সংসারের মাটিতে বাঁধা থাকে (‘ভুঁই-খেলা’)। এই দুই সত্তার দ্বন্দ্ব ও সামঞ্জস্যেই মানবমনের পূর্ণতা।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।