আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

সোনার তরী কাব্যগ্রন্থের ‘দুই পাখী’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ (১৮৯৪) কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ, রূপকধর্মী ও মনস্তাত্ত্বিক সৃষ্টি হলো ‘দুই পাখী’। এই কবিতায় স্বাধীনতা ও পরাধীনতা, কিংবা দুটি ভিন্ন প্রকৃতির মানুষের চিরন্তন প্রেমের আকুলতা এবং মেলামেশার অক্ষমতার এক অপূর্ব ও মর্মস্পর্শী রূপ অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:
বিষয়বিবরণ
কবিতার নামদুই পাখী (Dui Pakhi)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থসোনার তরী
প্রকাশের বছর১৮৯৪ (১২০১ বঙ্গাব্দ) / মানসী-সোনার তরী পর্ব
কবিতার ধরনরূপকধর্মী, রোমান্টিক ও গীতি-কবিতা (Symbolic, Romantic and Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৮৯৪ সালে প্রকাশিত ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থে মানবমনের দ্বান্দ্বিক রূপ ও প্রেমের স্বরূপ অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয়েছে। ‘দুই পাখী’ কবিতায় একজন বনের স্বাধীন পাখি এবং অন্যজন সোনার খাঁচায় বন্দि পালিত পাখির প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে। দুটি পাখির মধ্যে গভীর ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও তাদের জীবনদর্শন, ভাষা ও পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা হওয়ার কারণে তারা একে অপরের কাছাকাছি আসতে পারে না। স্বাধীনতার আনন্দ বনের পাখির জগত, আর নিরাপত্তার গণ্ডি ও শিখানো বুলি খাঁচার পাখির পরিচিতি—এই দুইয়ের চিরন্তন ব্যবধান কবিতাটিকে এক অনন্য দার্শনিক উচ্চতা দিয়েছে।

দুই পাখী কবিতা (সম্পূর্ণ)

 খাঁচার পাখি ছিল     সোনার খাঁচাটিতে

                  বনের পাখি ছিল বনে।

একদা কী করিয়া     মিলন হল দোঁহে,

        কী ছিল বিধাতার মনে।

বনের পাখি বলে,  খাঁচার পাখি ভাই,

       বনেতে যাই দোঁহে মিলে।

খাঁচার পাখি বলে– বনের পাখি, আয়

        খাঁচায় থাকি নিরিবিলে।’

                   বনের পাখি বলে– “না,

আমি     শিকলে ধরা নাহি দিব।’

        খাঁচার পাখি বলে– “হায়,

আমি     কেমনে বনে বাহিরিব!’

বনের পাখি গাহে বাহিরে বসি বসি

                   বনের গান ছিল যত,

খাঁচার পাখি পড়ে শিখানো বুলি তার–

                 দোঁহার ভাষা দুইমতো।

বনের  পাখি বলে, খাঁচার পাখি ভাই,

        বনের গান গাও দিখি।

খাঁচার পাখি বলে, বনের পাখি ভাই,

খাঁচার গান লহো শিখি।

          বনের পাখি বলে– না,

আমি     শিখানো গান নাহি চাই।’

        খাঁচার পাখি বলে– “হায়,

আমি     কেমনে বন-গান গাই।’

         বনের পাখি বলে, “আকাশ ঘননীল,

        কোথাও বাধা নাহি তার।’

খাঁচার পাখি বলে, “খাঁচাটি পরিপাটি

        কেমন ঢাকা চারি ধার।’

বনের পাখি বলে, “আপনা ছাড়ি দাও

        মেঘের মাঝে একেবারে।’

খাঁচার পাখি বলে, নিরালা সুখকোণে

        বাঁধিয়া রাখো আপনারে!’

        বনের পাখি বলে– “না,

সেথা     কোথায় উড়িবারে পাই!’

        খাঁচার পাখি বলে– “হায়,

মেঘে     কোথায় বসিবার ঠাঁই!’

এমনি দুই পাখি দোঁহারে ভালোবাসে

        তবুও কাছে নাহি পায়।

খাঁচার ফাঁকে ফাঁকে পরশে মুখে মুখে,

        নীরবে চোখে চোখে চায়।

দুজনে কেহ কারে বুঝিতে নাহি পারে,

        বুঝাতে নারে আপনায়।

দুজনে একা একা ঝাপটি মরে পাখা,

        কাতরে কহে, “কাছে আয়!’

        বনের পাখি বলে–না,

কবে     খাঁচার রুধি দিবে দ্বার।

        খাঁচার পাখি বলে–হায়,

মোর     শকতি নাহি উড়িবার।

দুই পাখী কবিতার Romanized Version:

Khachar pakhi chhilo shonar khachhate
Boner pakhi chhilo bone।
Ekda ki koriya milon holo dohe,
Ki chhilo bidhatar mone।
Boner pakhi bole, khachar pakhi bhai,
Bonete jai dohe mile।
Khachar pakhi bole– boner pakhi, ay
Khachay thaki niribile।’
Boner pakhi bole– “na,
Ami shikle dhora nahi dibo।’
Khachar pakhi bole– “hay,
Ami kemene bone baharib!’
Boner pakhi gahe bahire bosi bosi
Boner gan chhilo joto,
Khachar pakhi pore shikhano buli tar–
Dohar bhasha duimto।
Boner pakhi bole, khachar pakhi bhai,
Boner gan gao dikhi।
Khachar pakhi bole, boner pakhi bhai,
Khachar gan loho shikhi।
Boner পাখি bole– na,
Ami shikhano gan nahi chai।’
Khachar pakhi bole– “hay,
Ami kemene bon-gan gai।’
Boner pakhi bole, “akash ghononil,
Kothau badha nahi tar।’
Khachar pakhi bole, “khachati poripati
Kemon dhaka chari dhar।’
Boner pakhi bole, “apona chhadi dao
Megher majhe ekbare।’
Khachar pakhi bole, niromla shukh-kone
Bandhiya rakho apnare!’
Boner pakhi bole– “na,
Setha kothay uribare pai!’
Khachar pakhi bole– “hay,
Meghe kothay bosibar thai!’
Emni dui pakhi dohare bhalobashe
Tobuu kache nahi pay।
Khachar phake phake porshe mukhe mukhe,
Nirobe chokhe chokhe chay।
Dujone keho kare bujhite nahi pare,
Bujhate nare apnay।
Dujone eka eka zhapti more pakha,
Katore kohe, “kache ay!’
Boner pakhi bole–na,
Kobe khachar rudhi dibe dwar।
Khachar pakhi bole–hay,
Mor shokoti nahi uribar।

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • স্বাধীন বনাঞ্চল বনাম বন্দি খাঁচা: বনের পাখি স্বাধীনতার প্রতীক, যার কাছে আকাশ সীমাহীন ও উন্মুক্ত; আর খাঁচার পাখি পরাধীনতার গণ্ডিতে অভ্যস্ত, যার কাছে খাঁচার চারপাশই নিরাপদ ও পরিপাটি।
  • দুজনের গভীর ভালোবাসা ও দূরত্ব: দুটি পাখি একে অপরকে ভালোবাসলেও তাদের জীবনযাত্রা ও পরিবেশ আলাদা হওয়ায় কেউ কাউকে সম্পূর্ণভাবে নিজের করে বা কাছে টানতে পারে না। একজনের কাছে খাঁচা ভয়ের, অন্যজনের কাছে উড়ে যাওয়ার শক্তি বা সাহস নেই।
  • মিলনহীন আকুলতা: খাঁচার ফাঁক দিয়ে মুখ ছুঁয়ে বা চোখে চোখে তাকিয়ে থেকেও তাদের মনের দূরত্ব ঘোচে না—স্বাধীন আত্মা ও বন্দি জীবনের এই চিরন্তন দ্বন্দ্বই এই কবিতার মূল বাণী।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (সোনার তরী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত