বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ (১৮৯৪) কাব্যগ্রন্থের অন্যতম শ্রেষ্ঠ, রোমান্টিক ও রূপকধর্মী সৃষ্টি হলো ‘নিদ্রিতা’। এই কবিতায় রাজপুত্রের দেশ-বিদেশ ঘুরে ঘুমের দেশের রাজবালাকে আবিষ্কার করার গল্প এবং গভীর রাতে সুপ্ত রাজবালার গলায় অজানা মালা পরিয়ে আসার এক অপূর্ব রোমাঞ্চকর ও মরমী রূপ অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | নিদ্রিতা |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | সোনার তরী |
| প্রকাশের বছর | ১৮৯৪ (১২০১ বঙ্গাব্দ) / মানসী-সোনার তরী পর্ব |
| কবিতার ধরন | রোমান্টিক, রূপকধর্মী ও গীতি-কবিতা (Romantic, Allegorical and Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৮৯৪ সালে প্রকাশিত ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থে মানবমনের স্বপ্ন ও রূপকথার আদলে প্রেমের এক অদ্ভুত প্রকাশ দেখা যায়। এর আগে ‘সুপ্তোত্থিতা’ কবিতায় আমরা রাজবালার দৃষ্টিকোণ থেকে ঘুম ভাঙার পরের বিস্ময় ও মালা পরার কথা দেখেছি; আর ‘নিদ্রিতা’ কবিতায় রাজপুত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে সেই ঘটনার পেছনের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। রাজপুত্র সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে দেশে দেশে ঘুরে অবশেষে ঘুমের দেশের সন্ধান পান, যেখানে সবাই অচল অচেতন। ঘুমন্ত রাজবালার রূপ দেখে মুগ্ধ হয়ে তিনি ভূর্জপাতে নাম-ধাম লিখে রতন-হার বা কনক-সুতে গাঁথা মালাটি তাঁর গলায় পরিয়ে দিয়ে আসেন।
নিদ্রিতা কবিতা (সম্পূর্ণ)
রাজার ছেলে ফিরেছি দেশে দেশে
সাত সমুদ্র তেরো নদীর পার।
যেখানে যত মধুর মুখ আছে
বাকি তো কিছু রাখি নি দেখিবার।
কেহ বা ডেকে কয়েছে দুটো কথা,
কেহ বা চেয়ে করেছে আঁখি নত,
কাহারো হাসি ছুরির মতো কাটে
কাহারো হাসি আঁখিজলেরই মতো।
গরবে কেহ গিয়েছে নিজ ঘর,
কাঁদিয়া কেহ চেয়েছে ফিরে ফিরে।
কেহ বা কারে কহে নি কোনো কথা,
কেহ বা গান গেয়েছে ধীরে ধীরে।
এমনি করে ফিরেছি দেশে দেশে।
অনেক দূরে তেপান্তর-শেষে
ঘুমের দেশে ঘুমায় রাজবালা,
তাহারি গলে এসেছি দিয়ে মালা।
একদা রাতে নবীন যৌবনে
স্বপ্ন হতে উঠিনু চমকিয়া,
বাহিরে এসে দাঁড়ানু একবার
ধরার পানে দেখিনু নিরখিয়া।
শীর্ণ হয়ে এসেছে শুকতারা,
পূর্বতটে হতেছে নিশি ভোর।
আকাশ-কোণে বিকাশে জাগরণ,
ধরণীতলে ভাঙে নি ঘুমঘোর।
সমুখে পড়ে দীর্ঘ রাজপথ,
দু-ধারে তারি দাঁড়ায়ে তরুসার,
নয়ন মেলি সুদূর-পানে চেয়ে
ধরার মাঝে নূতন কোন্ দেশে,
দুগ্ধফেনশয়ন করি আলা
স্বপ্ন দেখে ঘুমায়ে রাজবালা।
অশ্ব চড়ি তখনি বাহিরিনু,
কত যে দেশ-বিদেশ হনু পার।
একদা এক ধূসর সন্ধ্যায়
ঘুমের দেশে লভিনু পুরদ্বার।
সবাই সেথা অচল অচেতন,
কোথাও জেগে নাইকো জনপ্রাণী,
নদীর তীরে জলের কলতানে
ঘুমায়ে আছে বিপুল পুরীখানি।
ফেলিতে পদ সাহস নাহি মানি,
নিমেষে পাছে সকল দেশ জাগে।
প্রাসাদমাঝে পশিনু সাবধানে,
শঙ্কা মোর চলিল আগে আগে।
ঘুমায় রাজা, ঘুমায় রানীমাতা,
কুমার-साथে ঘুমায় রাজভ্রাতা;
একটি ঘরে রত্নদীপ জ্বালা,
ঘুমায়ে সেথা রয়েছে রাজবালা।
কমলফুলবিমল শেজখানি,
নিলীন তাহে কোমল তনুলতা।
মুখের পানে চাহিনু অনিমেষে,
বাজিল বুকে সুখের মতো ব্যথা।
মেঘের মতো গুচ্ছ কেশরাশি
শিথান ঢাকি পড়েছে ভারে ভারে;
একটি বাহু বক্ষ-’পরে পড়ি,
একটি বাহু লুটায় এক ধারে।
আঁচলখানি পড়েছে খসি পাশে,
কাঁচলখানি পড়িবে বুঝি টুটি;
পত্রপুটে রয়েছে যেন ঢাকা
আপন মনে ভাবিনু একবার—
আমারি মতো আজি এ নিশিশেষে
অনাঘ্রাত পূজার ফুল দুটি।
দেখিনু তারে, উপমা নাহি জানি—
ঘুমের দেশে স্বপন একখানি,
পালঙ্কেতে মগন রাজবালা
আপন ভরা-লাবণ্যে নিরালা।
ব্যাকুল বুকে চাপিনু দুই বাহু,
না মানে বাধা হৃদয়কম্পন।
ভূতলে বসি আনত করি শির
মুদিত আঁখি করিনু চুম্বন।
পাতার ফাঁকে আঁখির তারা দুটি,
তাহারি পানে চাহিনু একমনে,
দ্বারের ফাঁকে দেখিতে চাহি যেন
কী আছে কোথা নিভৃত নিকেতনে।
ভূর্জপাতে কাজলমসী দিয়া
লিখিয়া দিনু আপন নামধাম।
লিখিনু, “অয়ি নিদ্রানিমগনা,
আমার প্রাণ তোমারে সঁপিলাম।”
যতন করি কনক-সুতে গাঁথি
রতন-হারে বাঁধিয়া দিনু পাঁতি।
ঘুমের দেশে ঘুমায় রাজবালা,
তাহারি গলে পরায়ে দিনু মালা।
নিদ্রিতা কবিতার Romanized Version:
Rajar chhele phirechhi deshe deshe
Shāt shomudro tero nodir par.
Jekhane joto modhur mukh ache
Baki to kichhu rakhi ni dekhibar।
Keho ba deke koyeche du-to kotha,
Keho ba cheye koreche ankhi noto,
Kaharo hashi chhurir moto kate
Kaharo hashi ankhijoler-i moto.
Gorobe keho giyeche nij ghor,
Kandiya keho cheyeche fire fire।
Keho ba kare kohe ni kono kotha,
Keho ba gan geyeche dhire dhire।
Emni kore phirechhi deshe deshe।
Onek dure tepantor-sheshe
Ghumer deshe ghumay rajbala,
Tahari gole eshechhi diye mala।
Ekda rate nobin joubone
Shopno hote uthinu chomokiya,
Bahire eshe daranu ekbar
Dhoror pane dekhinu nirokhiya।
Shirno hoye esche shuktara,
Purbotote hoteche nishi vhor।
Akash-kone bikashe jagoron,
Dhoronitole bhange ni ghumghor।
Shumukhe pore dirgho rajpoth,
Du-dhare tari daraye torushar,
Noyon meli shudur-pane cheye
Dhoror majhe notun kon deshe,
Dugdhofenshoyon kori ala
Shopno dekhe ghumaye rajbala।
Oshwo chori tokhoni baharinu,
Koto je desh-bidesh honu par।
Ekda ek dhusor shondhyay
Ghumer deshe lovinu purdwar।
Shobai setha ochol ocheton,
Kothau jege naiko jonoprani,
Nodir tire joler koltane
Ghumaye ache bipul purikhani।
Felite pod shahosh nahi mani,
Nimeshe pache shokol desh jage।
Prashad-majhe poshinu shabdhane,
Shonka mor cholilo age age।
Ghumay raja, ghumay ranimata,
Kumar-shathe ghumay rajbhrata;
Ekti ghore rotondip jwala,
Ghumaye setha royeche rajbala।
Komolfulbimal shejkhani,
Nilin tahe komol tonulata।
Mukher pane chahinu onimeshe,
Bajil buke sukher moto byatha।
Megher moto guchho kesh-rashi
Shithan dhaki poreche bhare bhare;
Ekti bahu bokkho-‘pore pori,
Ekti bahu lutay ek dhare।
Ancholkhani poreche khosi pashe,
Kancholkhani poribe buji tuti;
Potropute royeche jeno dhaka
Apon mone vhabinu ekbar—
Amari moto aji e nishishe-she
Onaghrat pujar phul duti।
Dekhinu tare, upoma nahi jani—
Ghumer deshe shopon ekhani,
Palonkete mogon rajbala
Apon vhora-labonnye nirala।
Byakul buke chapinu dui bahu,
Na mane badha hridoy-kompon।
Bhutole bosi anot kori shiro
Mudrito ankhi korinu chumbon।
Patar fäke ankhir tara duti,
Tahari pane chahinu ekmone,
Dwarer fäke dekhte chahi jeno
Ki ache kotha nibhrito niketone।
Vurjopate kajolmosi diya
Likhiya dinu apon namdham।
Likhinu, “Oyi nidra-nimogona,
Amar pran tomare shonpilam।”
Joton kori konok-sute ganthi
Roton-hare bandhiya dinu panti।
Ghumer deshe ghumay rajbala,
Tahari gole poraye dinu mala।
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- প্রেমের অন্বেষণ ও দীর্ঘ যাত্রা: রাজপুত্র নানা দেশ ঘুরে এবং বহু নারীর সান্নিধ্য লাভ করেও প্রকৃত সুন্দরের সন্ধান পাননি, যতক্ষণ না তিনি ঘুমের দেশের রাজবালাকে আবিষ্কার করেন।
- রহস্য ও রোমাঞ্চ: সম্পূর্ণ অচেতন ও ঘুমন্ত এক নগরী এবং প্রাসাদে প্রবেশ করে ঘুমন্ত রাজবালার রূপ মাধুর্য উপভোগ করা এবং নিঃশব্দে নিজের নাম-ধাম লিখে গলায় মালা পরিয়ে দেওয়ার ঘটনাটি এক অদ্ভুত রূপকথার আবহ তৈরি করে।
- স্বপন ও বাস্তবের সংযোগ: সুপ্তোত্থিতা কবিতার পটভূমি এখানে এসে পূর্ণতা পায়—যেখানে রাজপুত্রের ফেলে যাওয়া সেই মালাটিই ঘুম ভাঙার পর রাজবালার সমস্ত দিনের ভাবনার খোরাক হয়ে ওঠে।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (সোনার তরী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।