বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ (১৮৯৪) কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ, ঋতু-চেতনানির্ভর ও মননশীল গীতি-কবিতা হলো ‘বর্ষাযাপন’। এই কবিতায় কলকাতার এক ছোট্ট ছাদের ঘরের নির্জনতায় বসে আষাঢ়ের একটানা বৃষ্টি দেখার মধ্য দিয়ে কবিপ্রাণের উদাসী ভাব, দূর অতীতের মেঘদূত-কথার জগৎ এবং বিরহ-মিলনের শাশ্বত রূপ অত্যন্ত স্নিগ্ধ ও সুনিপুণ ভাষায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | বর্ষাযাপন |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | সোনার তরী |
| প্রকাশের বছর | ১৮৯৪ (১২০১ বঙ্গাব্দ) / রচনাকাল: ১৭ জ্যৈষ্ঠ, ১২৯৯ বঙ্গাব্দ |
| কবিতার ধরন | প্রকৃতি-নির্ভর, মননশীল ও গীতি-কবিতা (Nature-conscious, Contemplative and Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৮৯৪ সালে প্রকাশিত ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রসাহিত্যের এক মাইলফলক। এই কাব্যের প্রকৃতি ও মানবমনের মেলবন্ধন অত্যন্ত গভীর। ‘বর্ষাযাপন’ কবিতায় কলকাতার যান্ত্রিক ও জনবহুল পরিবেশের মাঝেও তেতলার ছাদের এক কোণের নির্জন কুঠুরিতে কবির আত্মমগ্নতার এক চমৎকার ছবি ফুটে উঠেছে। বাইরে যখন আষাঢ়ের কালো মেঘ, অবিরাম বৃষ্টি আর ঝোড়ো হাওয়া সমগ্র পৃথিবীকে যেন এক অদ্ভুত নির্বাসনে ঠেলে দেয়, তখন ঘরের কোণে বসে মেঘদূত পড়া এবং অতীত ভারতের নদী-নগরী পেরিয়ে বিরহী-বিরহিণীর মনস্তত্ত্বে ডুবে যাওয়ার এই আকুতি বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য সৃষ্টি।
বর্ষাযাপন কবিতা (সম্পূর্ণ)
রাজধানী কলিকাতা; তেতালার ছাতে
কাঠের কুঠরি এক ধারে;
আলো আসে পূর্ব দিকে প্রথম প্রভাতে,
বায়ু আসে দক্ষিণের দ্বারে।
মেঝেতে বিছানা পাতা, দুয়ারে রাখিয়া মাথা
বাহিরে আঁখিরে দিই ছুটি,
সৌধ-ছাদ শত শত ঢাকিয়া রহস্য কত
আকাশেরে করিছে ভ্রূকুটি।
নিকটে জানালা-গায় এক কোণে আলিসায়
একটুকু সবুজের খেলা,
শিশু অশথের গাছ আপন ছায়ার নাচ
সারা দিন দেখিছে একেলা।
দিগন্তের চারি পাশে আষাঢ় নামিয়া আসে,
বর্ষা আসে হইয়া ঘোরালো,
সমস্ত আকাশজোড়া গরজে ইন্দ্রের ঘোড়া
চিকমিকে বিদ্যুতের আলো।
চারি দিকে অবিরল ঝরঝর বৃষ্টিজল
এই ছোটো প্রান্ত-ঘরটিরে
দেয় নির্বাসিত করি দশ দিক অপহরি
সমুদয় বিশ্বের বাহিরে।
বসে বসে সঙ্গীহীন ভালো লাগে কিছুদিন
পড়িবারে মেঘদূতকথা—
বাহিরে দিবস রাতি বায়ু করে মাতামাতি
বহিয়া বিফল ব্যাকুলতা;
বহুপূর্ব আষাঢ়ের মেঘাচ্ছন্ন ভারতের
নগ-নদী-নগরী বাহিয়া
কত শ্রুতিমধু নাম কত দেশ কত গ্রাম
দেখে যাই চাহিয়া চাহিয়া।
ভালো করে দোঁহে চিনি, বিরহী ও বিরহিণী
– ১৭ জ্যৈষ্ঠ, ১২৯৯
বর্ষাযাপন কবিতার Romanized Version:
Rajdhani kolikata; tetalar chhate
Kather kuthari ek dhare;
Alo ashe purbo dike prothom provate,
Vayu ashe dokkhiner dware.
Mezhete bichhana pata, duare rakhiya matha
Bahire akhire dii chhuti,
Soudh-chhoad shoto shoto dhakiya rohosyo koto
Akashere koriche bhrikuti.
Nikete janala-gay ek kone alisay
Ektuku sobujer khela,
Shishu oshethor gachh apon chhayar nachh
Sara din dekhiye ekela.
Digonter chari pashe ashari namiya ashe,
Borsha ashe hoiya ghoralo,
Shomosto akashjora gorje indrer ghora
Chikmike bidhuter alo.
Chari dike obirol jhorjhor brishtijol
Ei chhoto pranto-ghortire
Dey nirbashito kori dosh dik opohori
Shomudoy bisher bahire.
Bose bose shonghihin bhalo lage kichhudin
Poribare meghdut-kotha—
Bahire dibosh rati vayu kore matamati
Bohiya bivol byakulota;
Bohupurbo asharter meghachhonno bharoter
Nog-nodi-nogori vahiya
Koto shrutimudhu nam koto desh koto gram
Dekhe jai chahiya chahiya.
Bhalo kore dohe chini, birohi o birohini
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
শহরের মাঝে নির্জন কুঠুরি:
“রাজধানী কলিকাতা; তেতালার ছাতে / কাঠের কুঠরি এক ধারে; / আলো আসে পূর্ব দিকে প্রথম প্রভাতে, / বায়ু আসে দক্ষিণের দ্বারে।”
— ব্যস্ত ও জনবহুল রাজধানী কলকাতার একটি বাড়ির তেতলার ছাদের এককোণে কাঠের ছোট্ট কুঠুরি—যেখানে সকালে পূর্বের আলো আর দক্ষিণের বাতাস অনায়াসে এসে পৌঁছায়।
ছাদের ওপর থেকে আকাশ দেখা ও সবুজের খেলা:
“মেঝেতে বিছানা পাতা, দুয়ারে রাখিয়া মাথা / বাইরে আঁখিরে দিই ছুটি, /… নিকটে জানালা-গায় এক কোণে আলিসায় / একটুকু সবুজের খেলা, / শিশু অশথের গাছ আপন ছায়ার নাচ / সারা দিন দেখিছে একেলা।”
— ঘরের মেঝেতে বিছানা পেতে দরজায় মাথা রেখে কবি বাইরের দুনিয়া থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন। জানালার পাশে আলিসার এক কোণে একটি ছোট শিশু অশ্বত্থ গাছ নিজের ছায়ার নাচ একা একা দেখে—এই ছোট প্রকৃতির টুকরো দৃশ্য কবির মনে প্রশান্তি আনে।
আষাঢ়ের আগমন ও বৃষ্টির নির্জনতা:
“দিগন্তের চারি পাশে আষাঢ় নামিয়া আসে, / বর্ষা আসে হইয়া ঘোরালো, /… চারি দিকে অবিরল ঝরঝর বৃষ্টিজল / এই ছোটো প্রান্ত-ঘরটিরে / দেয় নির্বাসিত করি দশ দিক অপহরি / সমুদয় বিশ্বের বাহিরে।”
— দিগন্ত জুড়ে আষাঢ়ের কালো মেঘ নেমে আসে। অবিরল ঝরঝর বৃষ্টির শব্দে এই ছোট্ট প্রান্ত-ঘরটি যেন বাইরের সমস্ত পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক অপূর্ব নির্বাসনের রূপ নেয়।
মেঘদূত ও অতীতের ভারত ভ্রমণ:
“বসে বসে সঙ্গীহীন ভালো লাগে কিছুদিন / পড়িবারে মেঘদূতকথা— /… বহুপূর্ব আষাঢ়ের মেঘাচ্ছন্ন ভারতের / নগ-নদী-নগরী বাহিয়া / কত শ্রুতিমধু নাম কত দেশ কত গ্রাম / দেখে যাই চাহিয়া চাহিয়া। / ভালো করে দোঁহে চিনি, বিরহী ও বিরহিণী”
— সঙ্গীহীন এই বর্ষার দিনে কালিদাসের ‘মেঘদূত’ কাব্য পড়ার মধ্য দিয়ে কবি প্রাচীন ভারতের মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, নদী, নগর ও গ্রামগুলো কল্পনায় ঘুরে বেড়ান। বিরহী ও বিরহিণীর চিরন্তন বেদনার সাথে নিজের মনকে মিলিয়ে দিয়ে কবি বর্ষার দিনগুলোকে এক অন্যমাত্রার মরমী সুষমায় অতিবাহিত করেন।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (সোনার তরী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।