আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থের বাদশার মুখখানা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অদ্ভুত ও শ্লেষাত্মক ছড়ার সংকলন ‘খাপছাড়া’-র একটি অত্যন্ত কৌতুকময়, অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ ও শাণিত রাজনৈতিক ব্যঙ্গ-কবিতা হলো ‘বাদশার মুখখানা’। ক্ষমতার অহংকার, প্রজাপীড়নকারী স্বৈরাচারী মানসিকতা এবং চূড়ান্ত আত্মসচেতনতাহীন শাসকের কৃত্রিম গাম্ভীর্য যে নিজেই এক বিরাট কৌতুকের বস্তু—বাদশা ও মহিষীর সরস কথোপকথনের মধ্য দিয়ে এ কবিতায় তা চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামবাদশার মুখখানা (খাপছাড়া ৪ সংখ্যক ছড়া)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থখাপছাড়া
প্রকাশের বছর১৯৩৭ (১৩৪৩ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনব্যঙ্গাত্মক ছড়া-কবিতা / রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক শ্লেষ (Satirical Limerick / Political Wit)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৩৭ সালে প্রকাশিত ‘খাপছাড়া’ কাব্যে রবীন্দ্রনাথ হাস্যকৌতুকের মোড়কে মানবচরিত্র ও ক্ষমতার নানা অসঙ্গতিকে নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। স্বৈরশাসকেরা প্রায়শই নিজেদের গুরুতর গম্ভীর ও অপ্রতিরোধ্য প্রতাপশালী হিসেবে জাহির করতে ভালোবাসে। তারা বলপ্রয়োগ করে চারপাশের সমস্ত প্রতিরোধ ও আত্মসম্মান (“দম্ভ”) চূর্ণ করে সবাইকে পদানত করতে চায়। কিন্তু রানি বা মহিষী সেই রাজকীয় আড়ম্বরের ফাঁপা দিকটি স্পষ্ট দেখতে পেয়ে অনায়াসে হাসতে পারেন। প্রজাদের দম্ভ নিঃশেষ হলেও হাসির খোরাক ফুরাবে কি না—মহিষীর এই প্রশ্নের উত্তরে বাদশা নিজেই স্বীকার করে বসেন যে সবকিছু মুছে গেলেও তিনি স্বয়ং হাস্যকর হয়ে বেঁচে থাকবেন। ক্ষমতার এই আত্মঘাতী মূর্খতাই কবিতার প্রধান আকর্ষণ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

দশার মুখখানা কবিতা (সম্পূর্ণ)

বাদশার-মুখখানা

     গুরুতর গম্ভীর,

       মহিষীর হাসি নাহি ঘুচে;

কহিলা বাদশা-বীর,–

     “যতগুলো দম্ভীর

       দম্ভ মুছিব চেঁচে-পুঁছে।’

উঁচু মাথা হল হেঁট,

খালি হল ভরা পেট,

     শপাশপ্‌ পিঠে পড়ে বেত।

কভু ফাঁসি কভু জেল,

কভু শূল কভু শেল,

     কভু ক্রোক দেয় ভরা খেত।

মহিষী বলেন তবে,–

“দম্ভ যদি না র’বে

     কী দেখে হাসিব তবে, প্রভু।’

বাদশা শুনিয়া কহে,–

“কিছুই যদি না রহে

     হসনীয় আমি র’ব তবু।’

দশার মুখখানা কবিতার Romanized Version:

Badshar-mukhkhana
Gurutoro gombhir,
Mohishir hashi nahi ghuche;
Kohila badsha-bir,–
“Jotogulo dombhir
Dombho muchhibo chenche-punchhe.’
Unchu matha holo hent,
Khali holo bhora pet,
Shopashop pithe pore bet.
Kobhu phansi kobhu jel,
Kobhu shul kobhu shel,
Kobhu krok dey bhora khet.
Mohishi bolen tobe,–
“Dombho jodi na ro’be
Ki dekhe hashibo tobe, probhu.’
Badsha shuniya kohe,–
“Kichhui jodi na rohe
Hoshoniyo ami ro’bo tobu.’

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • কৃত্রিম গাম্ভীর্য ও স্বৈরশাসন:
    “বাদশার-মুখখানা / গুরুতর গম্ভীর, / মহিষীর হাসি নাহি ঘুচে; / কহিলা বাদশা-বীর,– / ‘যতগুলো দম্ভীর / দম্ভ মুছিব চেঁচে-পুঁছে।'”
    — শাসকের আরোপিত গাম্ভীর্যের বিপরীতে মহিষীর অনিরুদ্ধ হাসি রাজকীয় ভীতিকে শুরুতেই নস্যাৎ করে দেয়। নিজের কর্তৃত্ব রক্ষায় বাদশা রাজ্যের যাবতীয় আত্মমর্যাদাবোধ বা ‘দম্ভ’ গুঁড়িয়ে দিতে উদ্যত হয়।
  • দমনপীড়নের নির্মম রূপকল্প:
    “উঁচু মাথা হল হেঁট, / খালি হল ভরা পেট, / শপাশপ্‌ পিঠে পড়ে বেত। / কভু ফাঁসি কভু জেল, / কভু শূল কভু শেল, / কভু ক্রোক দেয় ভরা খেত।”
    — প্রজার মাথা হেঁট করা, সম্পত্তি ক্রোক করা, বেত্রাঘাত এবং মৃত্যুদণ্ডের মতো চরম নির্যাতন নেমে আসে। স্বৈরতন্ত্রের চেনা রূপটিকে দ্রুতগামী মাত্রাবৃত্তের লঘু চালে প্রকাশ করে কবি এক তীব্র বিদ্রূপের আবহ তৈরি করেছেন।
  • ক্ষমতার চরম ব্যঙ্গ ও আত্মউপলব্ধি:
    “মহিষী বলেন তবে,– / ‘দম্ভ যদি না র’বে / কী দেখে হাসিব তবে, প্রভু।’ / বাদশা শুনিয়া কহে,– / ‘কিছুই যদি না রহে / হসনীয় আমি র’ব তবু।'”
    — মহিষীর শ্লেষাত্মক প্রশ্নের মুখে বাদশার অপ্রত্যাশিত উত্তরটি পুরো কবিতার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। প্রজাদের দম্ভ দমন করা সম্ভব হলেও, একজন অত্যাচারী শাসকের অহংকার ও ক্ষমতার উন্মাদনা নিজেই ইতিহাসের কাছে সবচেয়ে বড় উপহাস ও হাসির পাত্র হয়ে রয়ে যায়—এই শাশ্বত সত্যটিই এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, ছন্দবিন্যাস ও সংকলন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

Share

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ মে ১৮৬১ – ৭ আগস্ট ১৯৪১; ২৫ বৈশাখ ১২৬৮ – ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) ছিলেন বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার, সংগীতস্রষ্টা, প্রাবন্ধিক, চিত্রকর, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি ‘গুরুদেব’, ‘কবিগুরু’ ও ‘বিশ্বকবি’ অভিধায় পরিচিত।রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের পরিধি ছিল ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময়। তাঁর জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর অব্যবহিত পরে ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৪টি উপন্যাস এবং ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন প্রকাশিত হয়। তাঁর ৯৫টি ছোটগল্প *গল্পগুচ্ছ* এবং ১,৯১৫টি গান *গীতবিতান* সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাঁর প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনাবলি ৩২ খণ্ডে *রবীন্দ্র রচনাবলী* নামে সংকলিত হয়েছে। তাঁর পত্রসাহিত্যও *চিঠিপত্র* নামে ১৯ খণ্ডে এবং চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। সাহিত্য ও সংগীতের পাশাপাশি চিত্রকলাতেও তিনি বিশেষ অবদান রাখেন; তাঁর আঁকা ছবির সংখ্যা প্রায় দুই হাজার বলে উল্লেখ করা হয়।রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯১৩ সালে *গীতাঞ্জলি* কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি প্রথম অ-ইউরোপীয় এবং প্রথম এশীয় নোবেলজয়ী সাহিত্যিক হিসেবে বিশ্বসাহিত্যে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।

https://amarrabindranath.com/

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত