আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

বীথিকা কাব্যগ্রন্থের কৈশোরিকা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বীথিকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর আত্মজৈবনিক, স্মৃতিকাতর ও চিরন্তন নারীচেতনার কবিতা হলো ‘কৈশোরিকা’। জীবনের প্রারম্ভে আধো-ঘুম আধো-জাগা ভোরে যে কৈশোরের সঙ্গিনী প্রথম হৃদস্পন্দন ও কাব্যপ্রেরণা জাগিয়েছিল, সমগ্র জীবননৌকার নানা জোয়ার-ভাঁটা ও বয়সের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে সেই নারীসত্তা কীভাবে অনাদি যুগের চিরমানবী ও অসীমের দূতীতে উত্তীর্ণ হয়েছে—এ কবিতায় তারই এক অপার্থিব রূপরেখা অঙ্কিত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামকৈশোরিকা
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থবীথিকা
প্রকাশের বছর১৯৩৫ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ)
কবিতার আঙ্গিক ও ধরনস্মৃতিতর্পণমূলক রোমান্টিক লিরিক ও চিরমানবীর বন্দনা (Reflective Romantic Lyric)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৩৫ সালে প্রকাশিত ‘বীথিকা’ কাব্যগ্রন্থে কবি জীবনের অপরাহ্ণে দাঁড়িয়ে ফেলে আসা দিনগুলোর অনুভূতির পুনর্মূল্যায়ন করেছেন। কৈশোরের প্রথম প্রণয়িনী বা মানসীর স্মৃতি (যাঁর মধ্যে নতুনবৌঠান কাদম্বরী দেবীর প্রভাবও অনুধাবনযোগ্য) কবির কাব্যজীবনের এক চিরন্তন উৎস। ভোরের আলো-আঁধারের বনপথে তাঁর যে চকিত পদধ্বনি শোনা গিয়েছিল, সেই অনুভূতিই কবির জীবনতরীতে সুখ-দুখের স্মৃতিভার হয়ে সঞ্চিত হয়েছে। মর্ত্যজীবনের প্রাত্যহিকতায় আবদ্ধ থেকেও সেই নারী মূলত দেশের ও কালের অতীত। তাঁর বিরহবেদনা ও অনুপ্রেরণাই মানব-ইতিহাসে পুরুষকে সৃষ্টিশীল কীর্তির স্তূপ গড়ে তোলার প্রেরণা জুগিয়েছে।

হে কৈশোরের প্রিয়া সম্পূর্ণ কবিতা:

                             হে কৈশোরের প্রিয়া,

ভোরবেলাকার আলোক-আঁধার-লাগা

চলেছিলে তুমি আধ্‌ঘুমো-আধ্‌জাগা

          মোর জীবনের ঘন বনপথ দিয়া।

ছায়ায় ছায়ায় আমি ফিরিতাম একা,

দেখি দেখি করি শুধু হয়েছিল দেখা

          চকিত পায়ের চলার ইশারাখানি।

          চুলের গন্ধে ফুলের গন্ধে মিলে

পিছে পিছে তব বাতাসে চিহ্ন দিলে

                   বাসনার রেখা টানি।

                   প্রভাত উঠিল ফুটি।

অরুণরাঙিমা দিগন্তে গেল ঘুচে,

শিশিরের কণা কুঁড়ি হতে গেল মুছে,

          গাহিল কুঞ্জে কপোতকপোতী দুটি।

ছায়াবীথি হতে বাহিরে আসিলে ধীরে

ভরা জোয়ারের উচ্ছল নদীতীরে–

          প্রাণকল্লোলে মুখর পল্লিবাটে।

আমি কহিলাম, “তোমাতে আমাতে চলো,

তরুণ রৌদ্র জলে করে ঝলোমলো–

                   নৌকা রয়েছে ঘাটে।”

                   স্রোতে চলে তরী ভাসি।

জীবনের-স্মৃতি-সঞ্চয়-করা তরী

দিনরজনীর সুখে দুখে গেছে ভরি,

          আছে গানে-গাঁথা কত কান্না ও হাসি।

পেলব প্রাণের প্রথম পসরা নিয়ে

সে তরণী-‘পরে পা ফেলেছ তুমি প্রিয়ে,

          পাশাপাশি সেথা খেয়েছি ঢেউয়ের দোলা।

কখনো বা কথা কয়েছিলে কানে কানে,

কখনো বা মুখে ছলোছলো দুনয়ানে

                   চেয়েছিলে ভাষা-ভোলা।

                   বাতাস লাগিল পালে।

ভাঁটার বেলায় তরী যবে যায় থেমে

অচেনা পুলিনে কবে গিয়েছিলে নেমে

          মলিন ছায়ার ধূসর গোধূলিকালে।

          আবার রচিলে নব কুহকের পালা,

সাজালে ডালিতে নূতন বরণমালা,

          নয়নে আনিলে নূতন চেনার হাসি।

কোন্‌ সাগরের অধীর জোয়ার লেগে

আবার নদীর নাড়ী নেচে ওঠে বেগে,

                   আবার চলিনু ভাসি।

                   তুমি ভেসে চল সাথে।

চিররূপখানি নবরূপে আসে প্রাণে;

নানা পরশের মাধুরীর মাঝখানে

          তোমারই সে হাত মিলেছে আমার হাতে।

গোপন গভীর রহস্যে অবিরত

ঋতুতে ঋতুতে সুরের ফসল যত

          ফলায়ে তুলেছে বিস্মিত মোর গীতে।

শুকতারা তব কয়েছিল যে কথারে

সন্ধ্যার আলো সোনার গলায় তারে

                   সকরুণ পূরবীতে।

                   চিনি, নাহি চিনি তবু।

প্রতি দিবসের সংসারমাঝে তুমি

স্পর্শ করিয়া আছ যে-মর্তভূমি

          তার আবরণ খসে পড়ে যদি কভু,

তখন তোমার মূরতি দীপ্তিমতী

প্রকাশ করিবে আপন অমরাবতী

          সকল কাজের বিরহের মহাকাশে।

তাহারই বেদনা কত কীর্তির স্তূপে

উচ্ছ্রিত হয়ে ওঠে অসংখ্য রূপে

                   পুরুষের ইতিহাসে।

হে কৈশোরের প্রিয়া,

          এ জনমে তুমি নব জীবনের দ্বারে

          কোন্‌ পার হতে এনে দিলে মোর পায়ে

                   অনাদি যুগের চিরমানবীর হিয়া।

দেশের কালের অতীত যে মহাদূর,

তোমার কণ্ঠে শুনেছি তাহারই সুর–

          বাক্য সেথায় নত হয় পরাভবে।

অসীমের দূতী, ভরে এনেছিলে ডালা

পরাতে আমারে নন্দনফুলমালা

                   অপূর্ব গৌরবে।

 

Amar Rabindranath Logo

He koishorer priya kobita Romanized Version:

He koishorer priya,

Bhorbelakar alok-andhar-laga
Cholechhile tumi adh-ghumo-adh-jaga
Mor jiboner ghono bonpoth diya.
Chhayay chhayay ami phiritam eka,
Dekhi dekhi kori shudhu hoyechhilo dekha
Chokito payer cholar isharakhani.
Chuler gondhe phuler gondhe mile
Pichhe pichhe tobo batase chihnô dile
Basonar rekha tani.
Probhat uthhilo phuti.
Orunrangima digonte gelo ghuche,
Shishirer kona kunri hote gelo muchhe,
Gahilo kunje kopot-kopoti duti.
Chhayabithi hote bahire ashile dhire
Bhora jowarer uchchhol noditire–
Prankol胜ole mukhor pollibate.
Ami kohilam, “Tomate amate cholo,
Torun roudro jole kore jholomolo–
Nouka royechhe ghate.”
Srote chole tori bhashi.
Jiboner-smriti-shonchoy-kora tori
Dinrojonir sukhe dukhe gechhe bhori,
Achhe gane-gantha koto kanna o hashi.
Pelob praner prothom poshora niye
She toroni-‘pore pa phelechho tumi priye,
Pashapashi setha kheyechhi dheuer dola.
Kokhono ba kotha koyechhile kane kane,
Kokhono ba mukhe chholochholo dunoyane
Cheyechhile bhasha-bhola.
Batash lagilo pale.
Bhantar belay tori jobe jay theme
Ochena puline kobe giyechhile neme
Molin chhayar dhushor godhulikale.
Abar rochile nobo kuhoker pala,
Sajale dalite nuton boronmala,
Noyone anile nuton chenar hashi.
Kon shagorer odhir jowar lege
Abar nodir nari neche othe bege,
Abar cholinu bhashi.
Tumi bheshe cholo shathe.
Chirorupkhani noborupe ashe prane;
Nana porosher madhurir majhkhane
Tomari she hat milechhe amar hate.
Gopon gobhir rohosse obiroto
Ritute ritute shurer phoshol joto
Pholaye tulechhe bissmito mor gite.
Shuktara tobo koyechhilo je kothare
Shondhyar alo shonar golay tare
Shokorun purobite.
Chini, nahi chini tobu.
Proti dibosher shongsharmajhe tumi
Sporsho koriya achho je-morttobhumi
Tar aboron khoshe pore jodi kobhu,
Tokhon tomar murati diptimoti
Prokash koribe apon omoraboti
Shokol kajer biroher mohakashe.
Tahari bedona koto kirtir stupe
Uchchhrito hoye othe oshongkho rupe
Purusher itihashe.
He koishorer priya,
E jonome tumi nobo jiboner dware
Kon par hote ene dile mor paye
Onadi juger chiromanobir hiya.
Desher kaler otito je mohadur,
Tomar konthe shunechhi tahari shur–
Bakko sethay noto hoy porabhobe.
Oshimer duti, bhore enechhile dala
Porate amare nondonphulmala
Opurbo gowrobe.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • ভোরের আলো-আঁধারের প্রথম জাগরণ:
    “হে কৈশোরের প্রিয়া, / ভোরবেলাকার আলোক-আঁধার-লাগা / চলেছিলে তুমি আধ্‌ঘুমো-আধ্‌জাগা / মোর জীবনের ঘন বনপথ দিয়া।”
    — শৈশব পেরিয়ে কৈশোরের সন্ধিক্ষণে প্রেমের প্রথম অনুভূতি স্পষ্ট রূপ নিয়ে আসে না; তা আসে স্বপ্ন ও বাস্তবতার আলো-আঁধারিতে। সেই রহস্যময় পায়ের ইশারা এবং সৌরভের স্মৃতি কবির সমগ্র জীবনের কল্পনার ভিত্তি রচনা করে।
  • জীবনতরীর যৌথ পরিক্রমা ও রূপান্তর:
    “জীবনের-স্মৃতি-সঞ্চয়-করা তরী / দিনরজনীর সুখে দুখে গেছে ভরি, / … চিররূপখানি নবরূপে আসে প্রাণে; / নানা পরশের মাধুরীর মাঝখানে / তোমারই সে হাত মিলেছে আমার হাতে।”
    — সুখ-দুঃখ ও কান্না-হাসিতে ভরা জীবননৌকা যখন নানা ঘাটে ভিড়েছে বা স্রোতে ভেসেছে, তখন সেই প্রিয়া বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন রূপ ধারণ করে কবির পাশে থেকেছে। নারীর এই পরিবর্তনশীল অথচ শাশ্বত সান্নিধ্য কবির সৃষ্টির প্রতি ঋতুতে ‘সুরের ফসল’ ফলিয়ে তুলেছে।
  • ইতিহাসের কীর্তি ও অসীমের দূতী:
    “তাহারই বেদনা কত কীর্তির স্তূপে / উচ্ছ্রিত হয়ে ওঠে অসংখ্য রূপে / পুরুষের ইতিহাসে। / … অসীমের দূতী, ভরে এনেছিলে ডালা / পরাতে আমারে নন্দনফুলমালা / অপূর্ব গৌরবে।”
    — নারীর অভাববোধ ও বিরহই পুরুষকে শিল্প, সৌধ ও ইতিহাসের মহৎ কীর্তি নির্মাণে চালিত করে। দৈনন্দিন সংসারের আবরণ সরে গেলে সে কোনো একক ব্যক্তি থাকে না; সে অনাদি কালের ‘চিরমানবী’—যে অসীম থেকে নন্দনকাননের মালা নিয়ে মর্ত্যের মানুষকে অমরতার গৌরব এনে দেয়।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, ছন্দবিন্যাস ও সংকলন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (বীথিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত