কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | ঘাটের পথে |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | খেয়া |
| প্রকাশের বছর | ১৯০৬ (১৩১৩ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | রোমান্টিক ও নিসর্গ-সংলগ্ন লিরিক কবিতা (Romantic Nature Lyric) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৯০৬ সালে প্রকাশিত ‘খেয়া’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিজীবনের এক গভীর আধ্যাত্মিক ও মানবিক উপলব্ধির যুগকে নির্দেশ করে। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতে গ্রামীণ জীবনযাত্রা, সাধারণ মানুষের নাড়ির টান এবং প্রকৃতির সাথে মনের সংযোগ অত্যন্ত সুচারুভাবে প্রকাশিত হয়েছে। ‘ঘাটের পথে’ কবিতায় কবি এক গ্রামীণ নারীর আত্মকথন ফুটিয়ে তুলেছেন, যিনি অন্যরা যখন কঙ্কণঝংকারে দিঘির ঘাটের দিকে চলেছে, তখন দ্বারে দাঁড়িয়ে ভাবছেন—কোন ছলে তিনি ঘাটে যাবেন। জল বয়ে আনা কেবল দৈনন্দিন কাজ নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে কত হাসি, কত কাঁদা আর দিনের নানা মুহূর্তের স্মৃতির আনাগোনা। ঝড়-জল বা অন্ধকার সাঁঝের ভয় উপেক্ষা করে ঘরের ভিতরকার অকারণ আকুলতা ও বাইরের পথ ডাক দিয়ে যাওয়ার সেই দ্বন্দ্বময় অনুভূতি অত্যন্ত সুন্দরভাবে এই কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে।
ঘাটের পথে কবিতা (সম্পূর্ণ)
ওরা চলেছে দিঘির ধারে।
ওই শোনা যায় বেণুবনছায়
কঙ্কণঝংকারে।
আমার চুকেছে দিবসের কাজ,
শেষ হয়ে গেছে জল ভরা আজ,
দাঁড়ায়ে রয়েছি দ্বারে।
ওরা চলেছে দিঘির ধারে।
আমি কোন্ ছলে যাব ঘাটে–
শাখা-থরথর পাতা-মরমর
ছায়া সুশীতল বাটে?
বেলা বেশি নাই, দিন হল শোধ–
ছায়া বেড়ে যায়, পড়ে আসে রোদ–
এ বেলা কেমনে কাটে।
আমি কোন্ ছলে যাব ঘাটে।
ওগো, কী আমি কহিব আর।
ভাবিস নে কেহ ভয় করি আমি
ভরা-কলসের ভার।
যা হোক তা হোক এই ভালোবাসি–
বহে নিয়ে যাই, ভরে নিয়ে আসি,
কতদিন কতবার।
ওগো, আমি কী কহিব আর।
এ কি শুধু জল নিয়ে আসা।
এই আনাগোনা কিসের লাগি যে
কী কব, কী আছে ভাষা!
কত-না দিনের আঁধারে আলোতে
বহিয়া এনেছি এই বাঁকা পথে
কত কাঁদা কত হাসা।
এ কি শুধু জল নিয়ে আসা।
আমি ডরি নাই ঝড়জল,
উড়েছে আকাশে উতলা বাতাসে
উদ্দাম অঞ্চল।
বেণুশাখা’পরে বারি ঝরঝরে,
এ কূলে ও কূলে কালো ছায়া পড়ে,
পথঘাট পিচ্ছল।
আমি ডরি নাই ঝড়জল।
আমি গিয়েছি আঁধার সাঁজে।
শিহরি শিহরি উঠে পল্লব
নির্জন বনমাঝে।
বাতাস থমকে, জোনাকি চমকে
ঝিল্লির সাথে ঝমকে ঝমকে
চরণে ভূষণ বাজে।
আমি গিয়েছি আঁধার সাঁজে।
যবে বুকে ভরি উঠে ব্যথা,
ঘরের ভিতরে না দেয় থাকিতে
অকারণ আকুলতা।
আপনার মনে একা পথে চলি,
কাঁখের কলসী বলে ছলছলি
জলভরা কলকথা–
যবে বুকে ভরি উঠে ব্যথা।
ওগো দিনে কতবার করে
ঘর-বাহিরের মাঝখানে রহি
ওই পথ ডাকে মোরে।
কুসুমের বাস ধেয়ে ধেয়ে আসে,
কপোতকূজন-করুণ আকাশে
উদাসীন মেঘ ঘোরে–
ওগো, দিনে কতবার করে।
আমি বাহির হইব বলে
যেন সারাদিন কে বসিয়া থাকে
নীল আকাশের কোলে!
তাই কানাকানি পাতায় পাতায়,
কালো লহরীর মাথায় মাথায়
চঞ্চল আলো দোলে–
আমি বাহির হইব বলে।
আজ ভরা হয়ে গেছে বারি।
আঙিনার দ্বারে চাহি পথপানে
ঘর ছেড়ে যেতে নারি।
দিনের আলোক ম্লান হয়ে আসে,
বধূগণ ঘাটে যায় কলহাসে
কক্ষে লইয়া ঝারি–
মোর ভরা হয়ে গেছে বারি।
ঘাটের পথে কবিতার Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- ঘর ও বাইরের টান: প্রতিদিনের সাধারণ কাজের ফাঁকেও ঘরের ভেতরের জীবন এবং বাইরের মেঠো পথের অকারণ আহ্বান এক নারীর মনে যে সুক্ষ্ম আকুলতা তৈরি করে, তা এই কবিতার মূল প্রতিপাদ্য।
- জল বয়ে আনার মায়াবী রূপ: ঘাটে জল আনতে যাওয়ার এই সহজ রোজনামচার আড়ালে লুকিয়ে আছে আনন্দ, বেদনা, প্রকৃতি ও মনের এক অপরূপ মিতালি।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (খেয়া কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।



![খেয়া কাব্যগ্রন্থের 'ঘাটের পথে' কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1 ঘাটের পথে ghater pothe [ কবিতা ] -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/ঘাটের-পথে-ghater-pothe-কবিতা--1024x576.gif)


![বাহির হইতে দেখো না এমন করে baahir hoite dekho naa eman kore [ কবিতা ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 3 বাহির হইতে দেখো না এমন করে baahir hoite dekho naa eman kore [ কবিতা ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/বাহির-হইতে-দেখো-না-এমন-করে-baahir-hoite-dekho-naa-eman-kore-কবিতা--1024x536.gif)


![সোনার তরী কাব্যগ্রন্থের ‘বিম্ববতী’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিম্ববতী কবিতা (রূপকথা) [ সোনার তরী ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/03/বিম্ববতী-কবিতা-রূপকথা-1024x536.gif)