আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থের ‘বাসা’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামবাসা
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থপুনশ্চ
প্রকাশের বছর১৯৩২ (১৩৩৯ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনআধুনিক গদ্যছন্দের নিসর্গ ও কল্পনাধর্মী কবিতা (Modern Prose Poem / Nature Lyric)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৩২ সালে প্রকাশিত ‘পুনশ্চ’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গদ্যছন্দে লেখা কবিতার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পরিণত সংগ্রহ। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতে কবি জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, কল্পনার আশ্রয় এবং চারপাশের নিসর্গকে অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায় রূপ দিয়েছেন। ‘বাসা’ কবিতায় কবি ময়ূরাক্ষী নদীর তীরে এক মনোহর কল্পিত বাসস্থানের ছবি এঁকেছেন—যেখানে শালবন, মহুয়া, তালগাছ, কুরুচি ও বাতাবি লেবুর গন্ধভরা বাতাস, লাল পাথরে বাঁধানো ঘাট, রাজহংস এবং গাই গোরু ও বাছুর শান্ত পরিবেশ তৈরি করে। ঘরের বারান্দায় বসে সূর্যোদয় দেখা, পাশের কুটিরের গান গাওয়া প্রতিবেশিনী এবং লাল টাট্টু ঘোড়ায় চড়ে খেতের কাজ দেখতে যাওয়া মানুষের জীবনযাত্রা কবিকে মুগ্ধ করে। কবিতার শেষে কবি নিজেই প্রকাশ করেছেন যে এই বাসা তাঁর বাস্তববদ্ধ নয়, ময়ূরাক্ষী নদীটিকে তিনি কখনো চোখে দেখেননি—নামটি কেবল চোখের পাতায় ঘননীল মায়ার অঞ্জনের মতো লেগে থাকে এবং কবির উদাস প্রাণ সবকিছু ছেড়ে সেই নদীর ধারে চলে যেতে চায়।

বাসা কবিতা (সম্পূর্ণ)

ময়ূরাক্ষী নদীর ধারে

         আমার পোষা হরিণে বাছুরে যেমন ভাব

             তেমনি ভাব শালবনে আর মহুয়ায়।

         ওদের পাতা ঝরছে গাছের তলায়,

             উড়ে পড়ছে আমার জানলাতে।

         তালগাছটা খাড়া দাঁড়িয়ে পুবের দিকে,

             সকালবেলাকার বাঁকা রোদ্‌দুর

তারি চোরাই ছায়া ফেলে আমার দেয়ালে।

      নদীর ধারে ধারে পায়ে-চলা পথ

             রাঙা মাটির উপর দিয়ে,

         কুড়চির ফুল ঝরে তার ধুলোয়;

      বাতাবি-লেবু-ফুলের গন্ধ

         ঘনিয়ে ধরে বাতাসকে;

      জারুল পলাশ মাদারে চলেছে রেষারেষি;

         শজনে ফুলের ঝুরি দুলছে হাওয়ায়;

      চামেলি লতিয়ে গেছে বেড়ার গায়ে গায়ে

             ময়ূরাক্ষী নদীর ধারে।

      নদীতে নেমেছে ছোটো একটি ঘাট

             লাল পাথরে বাঁধানো।

      তারি এক পাশে অনেক কালের চাঁপাগাছ,

             মোটা তার গুঁড়ি।

      নদীর উপরে বেঁধেছি একটি সাঁকো,

         তার দুই পাশে কাঁচের টবে

             জুঁই বেল রজনীগন্ধা শ্বেতকরবী।

                 গভীর জল মাঝে মাঝে,

             নীচে দেখা যায় নুড়িগুলি।

         সেইখানে ভাসে রাজহংস

             আর ঢালুতটে চরে বেড়ায়

আমার পাটল রঙের গাই গোরুটি

      আর মিশোল রঙের বাছুর

             ময়ূরাক্ষী নদীর ধারে।

ঘরের মেঝেতে ফিকে নীল রঙের জাজিম পাতা

             খয়েরিরঙের-ফুল-কাটা।

      দেয়াল বাসন্তী রঙের,

             তাতে ঘন কালো রেখার পাড়।

      একটুখানি বারান্দা পুবের দিকে,

             সেইখানে বসি সূর্যোদয়ের আগেই।

      একটি মানুষ পেয়েছি

তার গলায় সুর ওঠে ঝলক দিয়ে,

         নটীর কঙ্কণে আলোর মতো।

             পাশের কুটিরে সে থাকে,

তার চালে উঠেছে ঝুম্‌কোলতা।

        আপন মনে সে গায় যখন

           তখনি পাই শুনতে–

               গাইতে বলি নে তাকে।

স্বামীটি তার লোক ভালো–

           আমার লেখা ভালোবাসে, ঠাট্টা করলে

        যথাস্থানে যথোচিত হাসতে জানে,

খুব সাধারণ কথা সহজেই পারে কইতে,

    আবার হঠাৎ কোনো-একদিন আলাপ করে

        –লোকে যাকে চোখ টিপে বলে কবিত্ব–

           রাত্রি এগারোটার সময় শালবনে

               ময়ূরাক্ষী নদীর ধারে।

বাড়ির পিছন দিকটাতে

         শাক-সবজির খেত।

বিঘে-দুয়েক জমিতে হয় ধান।

      আর আছে আম-কাঁঠালের বাগিচা

         আস্‌শেওড়ার-বেড়া-দেওয়া।

      সকালবেলায় আমার প্রতিবেশিনী

         গুন্‌ গুন্‌ গাইতে গাইতে মাখন তোলে দই থেকে,

      তার স্বামী যায় দেখতে খেতের কাজ

             লাল টাট্টু ঘোড়ায় চ’ড়ে।

      নদীর ও পারে রাস্তা,

             রাস্তা ছাড়িয়ে ঘন বন–

সে দিক থেকে শোনা যায় সাঁওতালের বাঁশি

      আর শীতকালে সেখানে বেদেরা করে বাসা

             ময়ূরাক্ষী নদীর ধারে।

      এই পর্যন্ত।

এ বাসা আমার হয় নি বাঁধা, হবেও না।

         ময়ূরাক্ষী নদী দেখিও নি কোনো দিন।

             ওর নামটা শুনি নে কান দিয়ে,

                 নামটা দেখি চোখের উপরে–

             মনে হয় যেন ঘননীল মায়ার অঞ্জন

                     লাগে চোখের পাতায়।

আর মনে হয়

      আমার মন বসবে না আর কোথাও,

         সব কিছু থেকে ছুটি নিয়ে

             চলে যেতে চায় উদাস প্রাণ

                 ময়ূরাক্ষী নদীর ধারে।

বাসা কবিতার Romanized Version:

Moyurakshi nodir dhare
Amar posha horine bachhure jemon vhab
Temni vhab shalboney ar mohuyay.
Oder pata jhorche gacher tolay,
Ure porche amar janlate.
Tal-gachhta khara dariye puber dike,
Shokalbelakar baka rod-dur
Tari chorai chhaya phele amar deyale.
Nodir dhare dhare paye-chola poth
Ranga matir upor diye,
Kurchir phul jhore tar dhuloy;
Batabi-lebu-fuler gondho
Ghoniye dhore batashe;
Jarul polash madare choleche resha-reshi;
Shojone fuler jhuri dulche haway;
Chameli lotiye geche berar gaye gaye
Moyurakshi nodir dhare.
Nodite nemeche chhoto ekti ghat
Lal pathore badhano.
Tari ek pashe onek kaler chapagachh,
Mota tar guri.
Nodir upore bedhechhi ekti shanko,
Tar dui pashe kancher tobe
Jui bel rojonigondha shwetkorobi.
Gobhir jol majhe majhe,
Niche deka jay nuriguli.
Sheikhane vhase rajhongsh
Ar dhalutete chore beray
Amar patol ronger gai goruti
Ar mishol ronger bachhur
Moyurakshi nodir dhare.
Ghorer mejhete phike nil ronger jajim pata
Khoyeri-ronger-ful-kata.
Deyal bashanti ronger,
Tate ghono kalo rekhar par.
Ektu-khani baranda puber dike,
Sheikhane bosi shurjodoyer aghei.
Ekti manush peyechhi
Tar galay shur othe jholok diye,
Notir konkone alor moto.
Pasher kutire se thake,
Tar chale utheche jhumko-lota.
Apon mone se gay jokhon
Tokhoni pai shunte–
Gaite boli ne take.
Swami-ti tar lok bhalo–
Amar lekha bhalobase, thatta korle
jothasthane jothochito hashte jane,
Khub shadharon kotha shohoje pare koite,
Abar hothat kono-ekdin alap kore
–loke jake chokh tipe bole kobitwo–
Ratri egaro-tar shomoy shalbone
Moyurakshi nodir dhare.
Barir pichhon diktate
Shak-shobjir khet.
Bighe-duek jomite hoy dhan.
Ar ache am-kathaler bagicha
Ash-sheowarar-bera-dewaa.
Shokalbelay amar protiroshini
Gun gun gaite gaite makhon tole doi theke,
Tar swami jay dekhte kheter kaj
Lal tattu ghoray ch’re.
Nodir o pare rasta,
Rasta chhariye ghono bon–
Se dik theke shona jay shantoler bashi
Ar sheetkale sekhane bedera kore basha
Moyurakshi nodir dhare.
  Ei porjonto.
E basha amar hoy ni bandha, hobe-o na.
Moyurakshi nodi dekhi-o ni kono din.
Or namta shuni ne kan diye,
Namta dekhi chokher upore–
Mone hoy jeno ghononil mayar onjon
Lage chokher patay.
Ar mone hoy
Amar mon bosbe na ar kothao,
Shob kichhu theke chhuti niye
Chole jete chay udash pran
Moyurakshi nodir dhare.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • কল্পিত নিসর্গ ও গৃহসুখ: ময়ূরাক্ষী নদীর তীরের এক স্নিগ্ধ ও শান্ত কুটিরের পারিপার্শ্বিকতা, গাছপালা, গবাদি পশু এবং সাধারণ মানুষের সুখের সংসার নিয়ে এক অপূর্ব কল্পিত ছবির রূপায়ন ঘটেছে এই কবিতায়।
  • মায়ার টান ও উদাস প্রাণ: এই বাসা বাস্তবে বাঁধা না হলেও এবং ময়ূরাক্ষী নদী দেখা না থাকলেও, তার প্রতি এক সুগভীর মায়া ও অদম্য টানের কারণে কবির উদাস প্রাণ সবকিছু ছেড়ে সেই নদীর ধারেই চলে যেতে চায়।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত